রমজান মাসে সারা দিন না খেয়ে থেকে ইফতারের পর আমাদের অনেকেরই নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তার মধ্যে একটা হচ্ছে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। এটা রমজান মাস ছাড়াও যেকোন সময় হয়ে থাকে। একে পেপটিক আলসারও বলা হয়ে থাকে।

পেটের ওপরের দিকে সারাদিন অল্প অল্প ব্যথা থেকে শুরু, হঠাৎ তীব্র ব্যথা আর বদহজম বা খাওয়ার পরে ব্যথা- সবই পেপটিক আলসারের ব্যথা হিসেবে পরিচিত। সাধারণত লোকজন গ্যাস্ট্রিক বা আলসার বলতে যা বুঝিয়ে থাকেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে পেপটিক আলসার।
যারা খাবার গ্রহণে অনিয়ম করে থাকে কিংবা অনেকটা সময় উপোস করে থাকেন- তাদের পেপটিক আলসার দেখা দেয় বেশি। এই পেপটিক আলসার শুধু পাকস্থলীতেই হয়ে থাকে তা নয় বরং এটি পৌষ্টিকতন্ত্রের যেকোন অংশেই হতে পারে।
কেন হয়?

প্রধানত পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত এসিড পাকস্থলীর মিউকোসার পর্দা নষ্ট করে পাকস্থলীর সংস্পর্শে আসে এবং প্রদাহ তৈরি করতে পারে। হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়াও মিকোসাল পর্দা নষ্ট করে দেয়। ফলে অ্যাসিড পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে প্রদাহ সৃষ্টি করে।

এছাড়া কারও পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে যদি বেশি পরিমাণে অ্যাসিড এবং প্রোটিন পরিপাককারী এক ধরনের অ্যানজাইম যা পেপসিন নামে পরিচিত বের হতে থাকে, তবে এটি হতে পারে। আবার জন্মগতভাবে কারও পৌষ্টিকতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলেও পেপটিক আলসার হতে পারে।
কী কারণে পাকস্থলীতে বেশি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে?

সাধারণত আমরা যদি বেশি বেশি ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করি, তাহলে বেশি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে। আবার অনিদ্রা, অতিরিক্ত টেনশন, বেশি ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণ, ধূমপানজনিত কারণেও বাড়তি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে।
কীভাবে বুঝা যায়?

 

এই ধরনের ব্যথা হলে সাধারণত পেটের উপরিভাগে ব্যথা হয় এবং জ্বালাপোড়া হওয়া, গ্যাস্ট্রিক আলসারের ক্ষেত্রে খাওয়ার ঠিক পরপর ব্যথা বাড়ে। আবার ডিওডেনাল আলসারের ক্ষেত্রে খালি পেটে ব্যথা বাড়ে। তাছাড়াও খাবারের পরে অতিরিক্ত ঢেঁকুর উঠলে কিংবা বদহজম হলেও বুঝা যায় যে গ্যাস্ট্রিকের ব্যাথা হচ্ছে।

প্রতিরোধ

এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে, খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। সবার আগে নিয়মিত খাবার গ্রহণ করতে হবে। অনেকক্ষণ সময় পর্যন্ত না খেয়ে থাকা যাবে না। আর যাদের এই সমস্যা তারা অবশ্যই ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করে চলবেন। দুশ্চিন্তা পরিহার করে ঘুম ঠিক রাখতে হবে আর ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ মানে এসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে।

চিকিৎসা

এই ধরনের রোগীরা সাধারণত এন্টাসিড বা এই জাতীয় ওষুধ খেয়ে থাকেন এবং উপকৃত হন। সেই সাথে ওমিওপ্রাজল কিংবা রেনিটিডিন জাতীয় ওষুধ নেয়া যেতে পারে। আর যদি এই রোগ জীবাণুজনিত কারণে হয়ে থাকে, তবে বিভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

 

ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ নিতে হবে। নয়তো ব্যথানাশক ওষুধের প্রয়োগে এই রোগ বেড়ে যায়। তবে অনেকদিন যাবত ওষুধ সেবনের পরও যদি এই রোগী ভালো না হন, কিছু খেলে যদি বমি হয়ে যায় মানে পৌষ্টিক নালির কোন অংশ যদি সরু হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে রোগী উপকার পেতে পারেন।
এই রোগের চিকিৎসা সময়মত না করলে বিপদ। অনেকসময় এতে পাকস্থলী ফুটো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারও কারও রক্তবমি কিংবা কালো পায়খানা হতে পারে, সেই সাথে হতে পারে রক্তশূন্যতাও। আর এক ধরনের সমস্যা খুব কম দেখা যায় তা হচ্ছে ক্যান্সার। এই ক্ষেত্রে পৌষ্টিক নালির কোন অংশ সরু হয়ে যায় তাই রোগী বারবার বমি করে।
এই রোগ বেশি ঝাল খেলে হয় কি না তার কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে পাওয়া যায়নি। আবার বেশি বেশি পানি পান করলে এই রোগ হবে না বা ভাল হয়ে যায় এমন কোন কথাও নেই। বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। পানি পরিমিত পান করাই ভাল।

যারা এই ধরনের সমস্যাতে ভুগছেন তাদের উচিত ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা। এই জটিলতা আগে থেকে শনাক্ত করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়া দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here