বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল নয়। সংক্রমণ কিংবা মৃত্যুহার কোনটিই নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রতিদান বেড়ে চলছে আক্রান্ত-মৃত্যুর সংখ্যা। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের মানুষ। যাদের শরীরে নানা রোগের বসবাস, নানা জটিলতায় যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কম; তারাই বেশিরভাগ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।

এসব মানুষদের মধ্যে বেশিরভাগই কিডনিজনিত সমস্যা, রক্তচাপ,শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা বা ডায়েবেটিসে আক্রান্ত। এদের শরীরে রোগের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা আগে থেকেই কম থাকে বিধায় নতুন করে আর ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। এর মধ্যে যারা ডায়েবেটিসে আক্রান্ত তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক।

গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যারা বেশি মারা যাচ্ছে বা মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ডায়েবেটিস। তবে এর মধ্যে যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেশি মাত্রায় ঝুঁকিতে আছেন যারা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

ডায়াবেটিস একই সঙ্গে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় আবার সংক্রমিত হবার পর বাঁচার সম্ভাবনাও কমিয়ে দিতে পারে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত হলে করোনাভাইরাস সংক্রমণে দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সবশেষ জরিপে যুক্তরাজ্যের ২৬০টি হাসপাতালে প্রায় ৩৫ হাজার কোভিড-১৯ রোগীর উপাত্ত পরীক্ষা করে বলা হয়, করোনাভাইরাসে মৃত্যুঝুঁকির পেছনে একটা কারণ হচ্ছে ডায়াবেটিস।

আমাদের দেশে ডায়াবেটিস রোগীদের একটি বিরাট অংশের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে তাদের মধ্যে যেকোন জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা হ্রাস পায়। আবার ডায়াবেটিসের রোগীদের একইসঙ্গে কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ ইত্যাদি থাকে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডায়াবেটিসের রোগীদের একটু বেশি সচেতন হওয়া জরুরি। যার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ যত খারাপ (এইচবিএওয়ানসি যত বেশি), তাঁর ঝুঁকি তত বেশি। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। রক্তে এইচবিএওয়ানসির মাত্রা ৭ শতাংশের বেশি হওয়া মানে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। তাই এসব দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

সম্প্রতি করোনাভাইরাস মহামারিতে দেখা গেছে, সাধারণ রোগীদের তুলনায় টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীরা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি সাড়ে তিনগুণ বেশি। আবার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অনেকের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আমাদের শরীরের অগ্নাশয়ের বিশেষ কিছু বিটা-কোষ ইনসুলিন উৎপাদন করে। এই ইনসুলিন রক্তে শর্করা বা চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর শরীরে ইনসুলিন উৎপাদনকারী এই কোষগুলো ধ্বংস করে দেয় করোনা। তখন রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ইনসুলিন শরীরে প্রবেশ করাতে হয়।

কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে, একইভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। কারণ আমাদের শরীরে যে অঙ্গগুলো রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে, সেসব কোষে এসিই-২ নামের প্রোটিন থাকে। সার্স ভাইরাসগুলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো ধ্বংস করতে এই প্রোটিন ব্যবহার করে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের মাঝে মৃত্যুঝুঁকি দ্বিগুণ। প্রতি ১০ জন ডায়াবেটিস রোগীর মাঝে ৯ জনের টাইপ-২ রয়েছে। বয়স অবশ্য ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। যেকোন টাইপের রোগী হন না কেন, ৪০ বছরের বেশি বয়সের ডায়াবেটিস রোগীরা কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত হলে ৪০ বছরের কম বয়সীদের তুলনায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি রয়েছে।

ডায়াবেটিস রোগীদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সাতদিনের মধ্যেই ১০ শতাংশের মৃত্যু হয়। যেসব রোগীর বয়স ৭৫’র বেশি তাদের মৃত্যু ঝুঁকি ৫৫ বা এর কমবয়সীদের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি। ডায়াবেটিস রোগীদের বেলায় কোভিড-১৯-এর ছোবল অন্যদের তুলনায় বেশি মারাত্মক বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

তাই বাঁচতে হলে খাবার-দাবারের নিয়ম মানতে হবে। হয়তো হার্ট থেকে শুরু করে কিডনি, চোখ, ত্বক, শিরা-ধমনীসহ সব কিছুই খারাপের দিকে যাবে। বেড়ে যাবে অন্যান্য রোগের সংক্রমণের আশঙ্কাও।

ডায়াবেটিস রোগী করোনায় আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে হলে, সবাই যা যা করার কথা, আপনিও তাই করবেন। তবে একটু বেশি সতর্কতার সঙ্গে। যেমন: দিনে ৫-৬ বার হাত ধুতে হবে। কোনো কারণে বাইরে যেতে হলে বা বাইরের কিছু ধরলে ঘরে এসে সাবান ও পানি দিয়ে কম করে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ভালোমতো ধুয়ে নেবেন। স্যানিটাইজারের চেয়ে সাবান কোনো অংশে কম নয়। একান্তই বাইরে বের হলে, উপায় না থাকলে তখন একমাত্র স্যানিটাইজারের প্রশ্ন এবং তাতে যেন ৭০ শতাংশের বেশি অ্যালকোহল থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রান্না পরিবেশন ও খাওয়ার আগে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। নিজের থালা, বাটি, গ্লাস আলাদা করে নিন। কারও শ্লেশ্মাজনিত অসুখ হলে দরকারে জামা-কাপড়, তোয়ালেও আলাদা করতে হবে। নিতান্ত অপারগ না হলে বাইরে যাবেন না।

অন্যরা একটু অনিয়মের ধকল সামলাতে পারলেও, আপনি হয়তো নাও পারতে পারেন। কাজেই কিছু জিনিস বেশি করে কিনে রাখুন। যেমন: পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর খাবার, শাকসবজি, ফল, মুরগি, মাছ, ডিম, ব্রাউন রাইস, হোল গ্রেন বা মাল্টি গ্রেন আটা ইত্যাদি।

বাজারে সবই পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই এক সপ্তাহের মতো কিনলেই হবে। হাতের কাছে চিনি-বাতাসা, মধু, ফলের রস, চকলেট জাতীয় মিষ্টিও কিছু রাখবেন। যদি হঠাৎ ডায়াবেটিস খুব কমে যায়, তখন কাজে আসবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনসুলিন কিনে রাখুন। মেশিনে সুগার মাপার স্ট্রিপ কিনে রাখুন।

সিফাত হাছান সুমাইয়া
ফার্মাসিস্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here