Oh Damn, ১১ টা বেজে গেলো ঘুম থেকে উঠতে উঠতে। না জানি কতকিছু মিস করে গেলাম অনলাইন ক্লাসের। আগে শুধু বলতাম গতানুগতিক শিক্ষায় কোনো আনন্দ উদ্দীপনা নেই। কিন্তু এখন এই লকডাউনে অনলাইন ক্লাস শুরু হওয়ার পর বুঝতে পারলাম, পড়ালেখাতে যতই টেকনোলোজির ফিউশন ঘটানো হোক না কেনো, পড়ালেখা বোরিংই থেকে যাবে যদি না শিক্ষকদের পড়ানোর স্টাইল ভালো হয়। সেজন্যই তো এতদিনের মধ্যে মাত্র ৩ দিন অনলাইনে ক্লাস করেছি।
গতকাল রাতে মেসেঞ্জারে গ্রুপের আড্ডায় সিদ্ধান্ত হয়েছিলো সবাই এখন থেকে ক্লাস করবো রেগুলার। কিন্তু, আমি বোধহয় প্রথম দিনেই সব কেচে গন্ডুস করে দিলাম। শুয়ে শুয়ে এসব উচ্চমার্গের চিন্তাভাবনা করতে করতে কোনদিক দিয়ে যে আরো ১০ মিনিট চলে গেছে খেয়ালই করিনি। হুশ ফিরলো দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ শুনে। নির্ঘাত মা দরজা ধাক্কাছে। মায়ের এই এক স্বভাব। ১০ টার পর থেকেই দরজায় নক দেওয়া শুরু করবে। শুরুর দিকে ব্যাপারটা হাল্কা টোকার মতো হয় পরে আস্তে আস্তে চক্রবৃদ্ধি হারে টোকার  force বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে সেটা ধুমধাম ধাক্কার পর্যায়ে চলে যায়। অধিকাংশ সময়ে এই ধাক্কার আওয়াজেই আমার ঘুম ভাঙে। ফেসবুকে কোনো এক গ্রুপে ঠিকই এরকম একটা পোস্ট করেছিলো,”Mother’s are the best alarm clock in the world”। এখন সেটার সত্যতা প্রতিদিনই টের পাই।

যাক, কোনোরকমে বিছানায় উঠে বসে ফ্যান বন্ধ করলাম। যা গরম পড়েছে এবার। প্রথম প্রথম কয়দিন ফেসবুকে অনেকে পোস্ট করতো যে গরম এলে করোনাভাইরাস এর প্রকোপ কমে যাবে।  আজকাল আর সেরকম পোস্ট চোখে পরে না। বিছানা থেকে নামার পর  আমার ডেইলি রুটিন অনুযায়ী আমি কয়েকটা কাজ করলাম। প্রথমে ফোনটা চার্জ থেকে খুললাম। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে সবকিছু সেরে আগে থেকে সাজানো নাস্তার প্লেট নিয়ে রুমে ফিরে এলাম। ফিরে এসে ডানহাতে নাস্তা খাওয়া আর বামহাতে মোবাইল নিয়ে ফেসবুক স্ক্রল করা শুরু করলাম।

সাধারনত ফেসবুকে ঢুকেই আমার প্রথম কাজ হয় notifications গুলো চেক করা। গতকাল রাতে বেশ কয়েকটা meme বিভিন্ন গ্রুপ থেকে ডাউনলোড করে স্টোরি তে দিয়েছিলাম। সেগুলোতে কতগুলো ভিউ আসলো সেটাও একটা চেক করার ব্যাপার। সব কাজ করার পর গেলাম মেসেঞ্জারে। বকবকপ্রিয় বাঙালির জন্য মেসেঞ্জার এক আশীর্বাদ এর নাম। এর মাধ্যমে সারাদিনই পরিচিতি অপরিচিত সবার সাথে বকবক করা যায়। যদিও যোগাযোগ টা অধিকাংশ text message নির্ভর। তাও সেটাকেই আমরা দেশের তরুণ সমাজ এক্কেবারে লুফে নিয়েছি।মেসেঞ্জার ওপেন করতেই দেখা গেলো ৬ টা নতুন মেসেজ। সেই ৬ টার মধ্যে ২ টা আবার গ্রুপ মেসেজ। একনজর দেখে নিলাম কাকে আগে উত্তর দেবো। এদিকে আমার নাস্তা ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেছে তাই গিলতে বেশ ঝামেলা হচ্ছিলো। এর মধ্যেই রিপ্লাই দিতে শুরু করলাম। আমার বেস্টফ্রেন্ড রাফী মেসেজ দিয়ে রেখেছে, ” অনি তুই কই? অনলাইন ক্লাস তো ২ টা শেষ হয়ে যাচ্ছে”। আধা ঘন্টা আগের মেসেজ। রিপ্লাই পরে দিলেও চলবে  কারন ও আপাতত একটিভ নেই। আমি যেই মেসেজটির রিপ্লাই দিতে আগ্রহবোধ করছিলাম সেটি তেমন গুরুতপূর্ন না দেখালে মেসেজকারী মানুষটার আলাদা গুরুত্ব আছে। মেয়েটির নাম শ্রেয়সী। আমাদের ক্লাসে নতুন এসেছিলো। মেয়েটিকে বেশ লাগে আমার। যদিও খুব ভালো বন্ধুত্ব নেই আমার সাথে, তাও মাঝে মাঝে ফেসবুকে মেসেজ দিয়ে ভাব জমানোর চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে সেও প্রয়োজন হলে টুকটাক মেসেজ দেয়। আজও নিশ্চয়ই সেরকম কোনো দরকারে নক করেছে। ঠিক, যা ভেবেছিলাম তাই, মেসেজে কোনো সৌজন্যতা না দেখিয়ে সরাসরি বলছে, ইফতেখার স্যারের ফিন্যান্স প্রথম পত্র নোটগুলো আমার কাছে আছে কিনা। আমি মনে করার চেষ্টা করলাম আমার কাছে নোট আছে কিনা, হয়তো নেই। তাও রিপ্লাই করে দিলাম, “আছে সব নোট, আমি খুজে বের করে তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”। সে কিছুক্ষন পর রিপ্লাই দিলো, “Thank you so much Vaiya🙂”, এই উত্তর দেখে মেজাজটা  খারাপ হয়ে গেলো। কথায় কথায় ভাইয়া ডাকাটা আজকাল একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে। যাইহোক, রাগ দেখিয়ে তো কোনো লাভ নাই। তাই আমি আমার ব্রিলিয়ান্ট বন্ধু সাঈদকে নক দিলাম আর জিজ্ঞেস করলাম তার কাছে ইফতেখার স্যারের নোটগুলা আছে কিনা, থাকলে আমাকে ছবি তুলে দিয়ে দিতে। সাঈদ ছেলেটা একটু ভাব নিলেও মোটামূটি ভালোই। আমি নিশ্চিত ও প্রথম উত্তর দিতে দেরি করবে কিন্তু পরে ঠিকই নোট পাঠিয়ে দেবে। মেসেঞ্জারের কাজকর্ম সব আপাতত সমাধান করে আমি গেলাম নিউজফিডে। আজকাল আমার মতো হাজারো বাঙালি মধ্যবিত্ত তরুন যারা Netflix, Amazon Prime এর মত সার্ভিস কিনতে পারে না বা ইউটিউব চালানোর মতো এমবি কিনতে পারে না তাদের একমাত্র বিনোদনের ভরসা হলো এই নিউজফিড।  সস্তায়  টেকসই বিনোদনের ভালো ব্যাবস্থা। ডেটা প্যাক না থাকলে ফ্রিতেও ব্যাবহার করা যায়। সস্তা হলেও ফেসবুকের নিউজফিডে ভালোই বিনোদন বিদ্যমান।  বিশেষ করে বিভিন্ন ট্রোল গ্রুপ, meme গ্রুপ ইত্যাদি গ্রুপে দারুন বিনোদন পাওয়া যায়। অনেক মজাদার পোস্ট করা হয় সেসবে। এছাড়াও কোনো সেলিব্রিটি যেকোনো জায়গায় একটু পান থেকে চুন খসালেই ঘটনার পরবর্তী কয়েকদিন এমনকি বেশ কয় সপ্তাহ ধরে সেটা নিয়ে ট্রল চলতেই থাকে। এই অঘোষিত লকডাউন অর্থাৎ স্কুল কলেজ বন্ধ হওয়ার পর থেকে এরকম অনেক ঘটনা নিয়ে বহুত ট্রোল হয়ে গেছে। ইদানীংকালে চলছে Youtube vs Tiktok নামের কাহিনী যেটার মূল আকর্ষন হলো Carrymintai নামে এক ভারতীয় ইউটিউবার যার এক ভিডিওর দাপটে টিকটক নামের এক সুপ্রতিষ্ঠিত মোবাইল এপ্লিকেশন এর বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলো। আরেক কাহিনী চলছে বাংলাদেশের এক গায়ক আর এক ইউটিউবার এর মধ্যকার বাক্যযুদ্ধ নিয়ে। সেই মাথামোটা গায়ক গানের প্রোমোশন এর নামে উল্টাপাল্টা পোস্ট দিয়ে যাচ্ছে পেজ থেকে আর অই ইউটিউবার ও তাকে শাসিয়ে যাচ্ছে। তারা একে অপরকে মেনশন করে পোস্ট করেই যাচ্ছে আর এদিকে তাদের কারবার নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে দুনিয়ার পোস্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার বিভিন্ন পেজে মোটিভেশনাল বিভিন্ন বড়বড় লেখাও পাওয়া যায় যদিও সেগুলো পড়ার ৫ মিনিট পরেই মোটিভেশন হাওয়া হয়ে যায় মিমস দেখে। আমি সেসব গ্রুপের আর পেইজের পোস্ট পড়তে লাগলাম আর রিয়েক্ট দিতে লাগলাম। এখনকার ফেসবুকের অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো পোস্টে লাইক দেওয়া যাবে না। লাইক যে দিবে সেই ক্ষেত, গেরাইম্ম্যা আরো বহুত উপমা আছে যেগুলার কথা না বললেও চলে। এসব রিয়েক্ট দিতে দিতে আর ফাকে ফাকে মেসেজের রিপ্লাই দিতে দিতে ২ টা বেজে গেলো। এদিকে স্নান করাও হয় নি। দুপুরের খাওয়ার সময়ও হয়ে আসছে। লক্ষ করলাম ফোনের চার্জও বেশ কমে এসেছে, তাই ফোন চার্জে লাগিয়ে স্মান করতে গেলাম। স্নান করে এসে আবার মোবাইলটা হাতে নিতেই বাবা সামনে পড়ে গেলো। ইদানীং বাবার সামনে পড়াটা খুবই অস্বস্তিকর একটা ঘটনা। লকডাউনে বাবার ব্যাবসার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আয়- রোজগার ও প্রায় বন্ধ। তাই অন্যসব মধ্যবিত্ত বাবাদের মতো আমার বাবারও মেজাজ আজকাল বেশ খারাপ থাকে। যদিও বাবা সেরকমভাবে কিছু প্রকাশ করে না। তাও আমি পারতপক্ষে বাবাকে এড়িয়ে চলি।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কিরে পড়ালেখা তো সব মাথায় তুলেছিস। সারাদিনই তো দেখি এই শয়তানের বাক্সটা হাতে(আমার বাবা মোবাইলকে শয়তানের বাক্স বলেন)
আমি উত্তর দিলাম, না না বাবা। এই দিনেই একটু যা মোবাইল ব্যাবহার করি, রাতে তো প্রতিদিন ৬ ঘন্টা পড়ি।

মিথ্যাটা বলে নিজের কাছেই বেশ খারাপ লাগলো। আমি কোনোরকমে বাবাকে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম।

চলে আসার সময় পেছন থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম বাবার গলার আওয়াজ, ” দেখিস বাবা, তোর নিজের জীবনের সেরা সময় এটাই। এটাকে নষ্ট করিস না”। বাবা হয়তো আরো কিছু বলছিলো কিন্তু সেগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিলো না।

বাবার খাওয়া শেষে আমি দুপুরের খাওয়া সারলাম। তারপর আবার নিজের রুমে এসে নিউজফিড স্ক্রল করা শুরু করলাম। বেশ কয়েকটা পোস্টে হাসি না আসলেও হাহা রিয়েক্ট দিলাম। অন্যসময় হলে  হয়তো বা এগুলো দেখেই হাসতে হাসতে পেটব্যথা হয়ে যেতো, কিন্তু অইসময় আমার বাবার কথাগুলো মাথায় ঘুরছিলো। কেমন জানি একটা খচখচানি হচ্ছিলো মনে।

আমি চিন্তা করছিলাম, সত্যিই কি আমি আমার জীবনটা নষ্ট করছি। সত্যি বলতে এ ধরনের কথা মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, কলেজের শিক্ষকরা অনেক বলেন তাই এগুলা শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু আজকে বাবার কথা বলার কন্ঠে এমন কিছু ছিলো যা বার বার কানে বাজছিলো সত্যি বলতে বুকের মাঝে একটা অজানা শুন্যতা জন্ম দিচ্ছিলো। হঠাৎ বাবার জন্য আমার বেশ মন খারাপ লাগতে লাগলো। সত্যিই, পৃথিবীতে সব বাবারাই বোধহয় সবচেয়ে অসহায় প্রানী। তাদের উপর পরিবারের সবাই নির্ভর করে থাকে তাই তাদের নির্ভর করাএ মতো কেউ থাকেনা। হয়তো বা আমার মায়ের সাথে বাবা কিছু কষ্ট শেয়ার করেন কিন্তু আমাদের এসব নিয়ে কোনো চিন্তা করাএ অবকাশ দেন না। দিনশেষে বাবা-মা ই সেরা যোদ্ধা। একজন ঘরের যোদ্ধা আরেকজন বাইরের যোদ্ধা। আমাদের পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষায় তাদের এই সংগ্রাম। অথচ আমি এই ১৮ বছর বয়সেও দিন পার করে দিচ্ছি নিউজফিড ঘেটে। একবার ঝংকার মাহবুব স্যারের এক আত্মউন্নয়নমূলক বইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। তার ভাষ্যমতে আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়, Living, Draining আর Driving। living বলতে আমাদের প্রাত্যাহিক আবশ্যিক কাজ যেমন খাওয়াদাওয়া, ঘুমানো ইত্যাদিকে বুঝায় যেগুলো আমাদের জন্য অপরিহার্য। Draining বলতে বুঝায় এমন কাজ যা আমাদের সময় Drain বা ক্ষরন করে অর্থাৎ এমন কাজ যা আমাদের সময় নষ্ট করে কিন্তু আমাদের কোনো উপকারে আসে না। উদাহরন: নিউজফিডে ফানি পোস্ট দেখা, মজার ভিডিও দেখা ইত্যাদি। আর সর্বশেষ কাজ হলো Driving অর্থাৎ এমন কাজ যা আমাদের কোনোকিছু অর্জনে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে নতুন কিছু শেখা, কোনো নতুন ভাষা শেখা বা পড়ালেখা করা। তিনি তার বইয়ে এও বলেছিলেন যে, আমাদের জীবনে যেনো Draining এর চেয়ে Driving জাতীয় কাজের পরিমান বেশি হয়। আমি এবার বুঝতে পারছিলাম যে আমার দৈনন্দিন জীবনে   Driving এর চেয়ে Draining এর পরিমান অনেক বেড়ে গেছে। সেটা নিশ্চয়ই আমার বাবা-মা লক্ষ করছেন। তাই বাবা আজকে অমনভাবে বললেন। আমার মাও মাঝে মাঝে আমাকে বলে এ ধরনের কথা কিন্তু আমি কখনো খুব একটা পাত্তা দেই না। আমি তাদের খুব আদরের ছেলে হওয়ায় তারা কোনোদিন খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করেনা আমার উপর। কিন্তু আজ আমি নিজেই নিজের উপর বেশ ভালোভাবেই চাপটা অনুভব করছিলাম।  আমার পরবর্তী বোর্ড পরীক্ষার সিলেবার ৬৫% এরও বেশি বাকি তাও আমি নিশ্চিন্তে আছি। কিভাবে আমি এমন হয়ে গেলাম। এসবই কি বয়সের প্রভাব? নাকি আমার নিজের স্বভাবের দোষও আছে। আসলে আমি একটু বড় হওয়ার পর থেকেই নিজেকে নিজের বাবা মায়ের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান ভেবে নিয়েছি। ভেবেছি নিজেই নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার মত যোগ্যতা হয়ে গেছে আমার। কিন্তু  আসলে বাবা মায়ের চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত আমি কোনোদিন নিতে পারিনি কোথাও। এখনো একা কোথাও গেলে মায়ের কনুইয়ের ভাজে হাত দিয়ে হাটার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। আসলেই আমি এখনো অনেক ছোটো।

শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। আমি বাবার সাথে কথা বলবো আমার দৈনন্দিন জীবনের ব্যাপারে। এখন ৪ টা বাজে। বাবা হয়তো বা টিভি দেখছেন।  একবার ভাবলাম আজ কথা বলবো না। পরে বুঝলাম আজ কথা না বললে আর কোনোদিন আমি সাহস করে এ ব্যাপারে কথা বলতে পারবো না। তাই আমি বাবাকে রুমের বাইরে থেকে ডাক দিলাম। তিনি বললেন, কি ব্যাপার? এই সময় আবার কি দরকার? আমি বললাম একটু কথা আছে। তিনি আমাকে তার কাছে ডাকলেন। তারপর আমাদের মধ্যে নিম্নলিখিত কথোপকথন হলো:

বাবা: বল কি ব্যাপার?

আমি: তুমি আজ দুপুরে আমার জীবন নষ্টের ব্যাপারে কি বলছিলে?

বাবা: আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম যে তুই ঠিকমতো পড়ালেখা করছিস কিনা, তোর সারাদিন কিভাবে কাটে? কিন্তু তুইই তো আমাকে পাশ কাটিয়ে গেলি। এখন বল কেনো এসেছিস?

আমি: আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে এসেছি….

বাবা: তাহলে দে উত্তর।

আমি: বাবা আমি…… সারাদিন আমি…….

বাবা: তোতলাচ্ছিস কেন?

আমি: আসলে আমার পড়ালেখা তেমন ভালোমতো চলছে না। সারাদিনই আমার ফেসবুক ও অন্যান্য সোশাল মিডিয়াতে কেটে যায়।

বাবা: সারাদিন ফেসবুকে কি করিস তুই?

আমি: এইতো নিউজফিড ঘাটি।

বাবা: আর কিছুই করিস না?

আমি: মাঝে মাঝে মেসেঞ্জার গ্রুপে আড্ডা দেই বন্ধুদের সাথে।

বাবা: এইযে তুই বললি তুই সারাদিন নিউজফিড ঘাটিস। এই Newsfeed শব্দটা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এখানে এমন সব নিউজ পাওয়া যায় যা তোর সময় খেয়ে নিচ্ছে , মাথা খেয়ে নিচ্ছে। তাও তুই এটাতে সময় দিচ্ছিস কেনো?

আমি: এটার সাথে আমি একদম জড়িয়ে গেছি বাবা। ছাড়তে চেষ্টা করলেও পারবো না। এখন আমি কি করবো বাবা?

বাবা: তোর কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে তুই এটার ব্যাবহার ছাড়তে পারবি না। তাহলে এখন তোকে এটার ব্যাবহার নিয়ন্ত্রন করতে হবে এবং এটাকে আরো ভালো কাজে ব্যাবহার করতে হবে।

আমি: যেমন??

বাবা: প্রথমত তোর দিনের কোনো পরিকল্পনা থাকে না তাই তুই ফেসবুকে অতিরিক্ত সময় দিয়ে ফেলিস। তাই প্রথমে সারাদিন কিছু গুরুত্বপূর্ন কাজের পরিকল্পনা করে ফেলবি। তারপর ফেসবুকের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় রাখবি। আর ফেসবুকে শুনেছি আজকাল অনেক শিক্ষামুলক কনটেন্ট আছে। সেগুলো ফলো করবি।
(আরো অনেক কথা হলো আমাদের মধ্যে যেগুলো বাবার সাথে কোনোদিন বলবো সেকথা আমি কোনোদিন  ভাবতেই পারিনি)

আমি: চেষ্টা করবো বাবা। (একথা বলে আমি উঠে যাচ্ছিলাম এমন সময় বাবা ডাক দিলেন)

বাবা: কোথায় যাস?

আমি: রুমে। কেনো?

বাবা: কয়টা বাজে দেখ?

আমি: ৬:২৫ মিনিট

বাবা: শেষ কবে সূর্যাস্ত দেখেছিস মনে আছে?

আমি:……..(চুপ)

বাবা: তোর বয়সে আমি প্রতিদিন বিকালে মাঠে খেলতাম আর খেলাশেষে সবাই সূর্যাস্ত দেখতাম নদীর পাড়ে গিয়ে। আজ যদি আমাদের বাড়িতে ছাদ থাকতো তাহলে ছাদে বসে হলেও আমি তোদের সূর্যাস্ত দেখতাম কারন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত জগতের সেরা দৃশ্যগুলোর কাতারে পড়ে। কিন্তু আমিতো পাকা বাড়ি বানাতে পারলাম না…….

আমি: লাগবে না বাবা। আমি আমাদের পুকুরপাড়ে বসেই যতদূর দেখা যায় সূর্যাস্ত দেখবো। (একথা বলে আমি ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম)

তখন ঘর থেকে বেরিয়ে আমার মাথায় একটা কথাই ঘুরছিলো, যেভাবেই হোক বাবার ইচ্ছা পূরন করতে হবে আমাকে। কাল থেকেই সবকিছু নতুন করে গুছিয়ে শুরু করবো। সূর্য প্রায় অস্তমান।  হঠাৎ করে চোখের দৃষ্টিতে হাল্কা ঝাপসা ভাব অনুভব করল, নিজের অজান্তেই যে কখন চোখে জল এসে গেছিলো বুঝতেই পারিনি। সেই জলে ভেজা ঝাপসা চোখেই আমি সূর্যাস্ত দেখলাম। সত্যিই সূর্যাস্ত অনেক সুন্দর……

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here