বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় রাষ্ট্র নায়কদের একজন দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন মেন্ডেলা। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে বহু বর্ণভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, প্রখর রসবোধ, তিক্ততা ভুলে বৈরি প্রতিপক্ষের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মত উদারতা এবং তাঁর বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় জীবন কাহিনী- এসব মিলিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

বর্ণবাদের অবসানের পর ১৯৯৪ সালের ১০ মে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন নেলসন মেন্ডেলা। এর এক দশক আগেও সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক এ পটপরিবর্তন ছিল অকল্পনীয় ঘটনা। এ পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নেলসন মেন্ডেলা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৩ সালে তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।

কিন্তু তার জীবনে এত সব কাজ খুব সহজে হয়নি। দেশের ৪০০ বছরের ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে অনেক কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল তাকে, জীবনের ২৭ বছর তিনি ছিলেন জেলখানায়।

কেমন ছিল তার সেই জেল বন্দী জীবন?

মোট ২৭ বছর কারাভোগের মধ্যে ১৮ বছরেরও বেশি সময় রবেন আইল্যান্ডের নির্জন ঘরে বন্দী ছিলেন মেন্ডেলা। সেখানে তার সেলটি ছিল ৮ ফুট লম্বা এবং ৭ ফুট চওড়া একটি ছোট্ট ঘর। সামনে লোহার শিকযুক্ত দরজা। উল্টো দিকে দেয়ালের অনেক ওপরে ছোট একটি জানালা। অন্য দুইদকে বদ্ধ দেয়াল। মেঝের একপাশে কম্বল বিছানো শয্যা। মাথার কাছে আরও দুইটি কম্বল পেঁচিয়ে রাখা। একটি বালিশ হিসেবে ব্যবহার করার এবং অন্যটি গায়ে জড়ানোর। একটা টুলের আকারের টেবিলের ওপর রাখা ধাতুর তৈরি থালা ও বাটি।

জেলখানায় রাজবন্দীদের মনোবল ভেঙে দেয়া, সাহস ও লড়াই করার উদ্যোগকে দমন করার প্রচেষ্টা সব সময় চলত। ছয় মাসে একটি চিঠি এবং একজন নিকট আত্মীয়কে বন্দীদের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হতো। বন্দীদের দিয়ে চুনা পাথরের পাহাড় কাটানো হতো।

এই পাহাড় কাটার কাজটা খুবই কষ্টকর ও পরিশ্রমের ছিল। তবে বন্দীরা মনে করতেন এই পাথর কাটার কাজটা শারীরিকভাবে তাদের সবল রাখছে। পাহাড়ের উপর বন্দীদের নিয়ে যাওয়া হতো। তারপর সেখান থেকে চুনা পাথর কাটতে কাটতে নিচের দিকে নামতেন তারা। এভাবে পাহাড়ের উচ্চতা কমিয়ে চুনা পাথর সংগ্রহ করা হতো।

রাজবন্দীদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন। তারা শাবল-গাইতি চালাতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ফলে সারাদিন খননের পর দিন শেষে হাত দিয়ে রক্ত ঝরতো। চুনের গুড়া ও ঝাঁজ চোখের জন্য খুবই ক্ষতিকর। রাজবন্দীদের বলা হতো ছ’মাস চুনা পাথরের পাহাড় কাটার পর তাদের একটু হালকা কাজ দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যেত, বার-তের বছর পর্যন্ত তাদের এই কাজ করতে দেয়া হয়েছে।

এই কাজ করতে করতে অনেকে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। চুনা পাথর সংগ্রহের সময় রোদ-ধুলাবালি থেকে চোখকে রক্ষা করার জন্য বন্দীরা সানগ্লাস ব্যবহারের দাবি জানায়। কিন্তু তাদের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়। এমনকি পড়াশোনার জন্য চশমা চেয়েও পাওয়া যেত না। চশমা থাকলেও পড়াশোনার সময় তা ব্যবহার করতে দেয়া হতো না।

সানগ্লাস পাওয়ার জন্য মেন্ডেলাদের অনেক দিন অনুনয় বিনয়, কখনওবা প্রতিবাদ করতে হয়েছে। সানগ্লাস পেতে তাদের তিন বছর সময় লেগেছিল আর তা পাওয়া গিয়েছিল ডাক্তার চোখ পরীক্ষা করে সানগ্লাস ব্যবহারের সুপারিশের প্রেক্ষিতে। আর সে সানগ্লাস বন্দীরা নিজ খরচে কিনেছিল।

কারাগারের মধ্যে অনেক দিন সংগ্রাম ও প্রতিবাদ করে বন্দীরা লম্বা ট্রাউজার, পড়াশুনার সুযোগ, কিছুটা ভাল খাবার ইত্যাদি দাবি আদায় করতে পেরেছিল। তবে কোন পরিদর্শক টিম অথবা আন্তর্জাতিক রেডক্রস থেকে কোন প্রতিনিধি আসলে তাদের সামনে কারাগারের লোকেরা নরম ব্যবহার করতেন। নতুবা পরিষ্কার কাপড় সরবরাহ করা হতো, খাবারের মান উন্নত করা হতো- পরিদর্শনের সময়।

মুক্ত হওয়ার পর মেন্ডেলার চোখে অস্ত্রোপাচার করতে হয়েছিল। তারপরও চোখের পীড়ার কারণে পড়াশোনার কষ্ট তাঁর সবসময়ের জন্য রয়ে গেছে। বন্দীদের ওপর অহেতুক শারীরিক নির্যাতন করা হতো। হয়তো দেখা যেত নেভিল আলেকজান্ডার এবং এমবেকি নামের দুইজন বন্দী সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু দিনশেষে ওয়ার্ডার বলল, তোমাদেরকে জেলের বড় কর্তার কাছে যেতে হবে। অপরাধ, তোমরা কাজ না করার দুঃসাহস দেখিয়েছ। দেয়া হতো তাদের কঠোর শাস্তি। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৮০ সালে মেন্ডেলা যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নেলসন মেন্ডেলা কাটিয়েছেন রবেন আইল্যান্ডের নির্জন সেলে। এখানেই তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখা “Long walk to freedom”র পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গোপনে পান্ডুলিপি দ্বীপের বাইরে পাঠিয়ে দেন। তাকে দেশের খবরাখবর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সকল প্রচেষ্টাই তখন করা হয়েছিল। তিনি বন্দী থাকা অবস্থায় স্ত্রী উইনি মেন্ডেলা বাইরে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন। কিন্তু খবরের কাগজে প্রকাশিত সেসব খবরের অংশ কেটে বাদ দিয়ে তাকে দেয়া হতো।

কারাবন্দী অবস্থায় কেবল শারীরিক অত্যাচারই নয়, মানসিকভাবে উনার প্রতি যে অমানবিক অবিচার করা হয়েছে তা বর্ণনাতীত। ১৯৬৮ সালে মায়ের শেষকৃত্যেও তাঁকে যোগদান করতে দেয়া হয়নি। পরের বছর ১৯৬৯ সালে যখন তার বড় ছেলে থেমবেকিলে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন এবং মেন্ডেলা তাকে দেখার অনুমতি প্রার্থনা করেন, তখন তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এমনকি বিশ্বের বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন তাঁকে জানতে দেয়া হতো না।

দীর্ঘ কারাবাসের সময় নেলসন মেন্ডেলার জীবনযাপন, অন্যায়-অবিচারের প্রতি অনড় অবস্থান, সকল বন্দীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব, লক্ষ্য অর্জনের জন্য তীব্র মনোবল ও সবার মধ্যে তা সঞ্চালন এবং একই সাথে জেলখানার নিয়ম-কানুনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সকলের সাথে ভাল আচরণ করা, জেলরীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে দূরে থাকা- এমন সব বিরল গুণাবলী শ্বেতাঙ্গ সরকারকে বিস্মিত করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here