মা

“মায়ের মত এত আদর সোহাগ সে তো, আর কোথাও পাইবে না ভাই‍‍”
কবির কবিতার এই লাইন কি শুধুই কবিতা লেখার জন্য? এর বাস্তবিক প্রয়োগ ঠিক কতখানি? এই প্রশ্নের উত্তর আছে আমাদের সবার নিজের মধ্যে। সত্যিই কি মায়ের চেয়ে আপন আমাদের জীবনে আর কেউ আছে? আমাদের প্রতেকের জীবনে এ পরম নির্ভরতার জায়গা হচ্ছে আমাদের মা।

বছরের ৩৬৫ দিনই পৃথিবীর মানুষ কোন না কোন দিবস পালন করে থাকে। ভালোবাসার দিবস, বন্ধুত্বের দিবস, প্রতিজ্ঞা দিবস, আরও কত কী? তবে মানুষকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতে হয় বা বন্ধুত্ব করতে হয়- এসব শিক্ষা মানুষ তার মায়ের থেকেই পেয়ে থাকে।

তাহলে সেই মায়ের জন্য ও থাকুক একটি বিশেষ দিন, “মা দিবস”। একটা দিন সবাই ভাবুক তাদের জীবনে মা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মা, আম্মু, আম্মা, মামণি, মাম্মি কিংবা মম- যেই নামেই ডাকি না কেন, মানুষ একজনই, আমাদের জন্মদাত্রী। যিনি আমাদের দুনিয়াতে নিয়ে এসেছেন। আমরা দুনিয়া দেখেছি, মানুষ দেখেছি। তাই একজন মানুষের জীবনে মায়ের কোন বিকল্প থাকতে পারে না।

এই যে বছরের একটা দিন আমরা মা দিবস পালন করে থাকি সেই মা দিবস সর্বপ্রথম প্রচলিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। যে দিবসের ধারণা প্রথম মানুষের সামনে আনেন ‘দ্য ব্যাটল হিম অব দ্য রিপাবলিক’ গানের জন্য পরিচিত মার্কিন কবি ও লেখক জুলিয়া ওয়ার্ড হাও (১৮১৯-১৯১০)। তিনি ১৮৭২ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর বোস্টনে বার্ষিক মা দিবস সভার আয়োজন করেন।

তবে দিবসটি আন্তর্জাতিক রূপ পায় আনা মারিয়া রিভস জার্ভিসের (১৮৬৪-১৯৪৮) প্রচেষ্টায়। তাঁর মা অ্যান মারিয়া রিভস জার্ভিস ছিলেন ‘মাদারস ডে ওয়ার্ক ক্লাব’- এর প্রতিষ্ঠাতা। একজন শান্তিবাদী সমাজকর্মী হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন পশ্চিম ভার্জিনিয়ার স্থানীয় নারীদের সন্তানের সঠিক যত্ন নেওয়ার বিষয়টি ক্লাবের মাধ্যমে শেখাতে। ১৯০৫ সালে মারা যান অ্যান। তাঁর মৃত্যুর পর মেয়ে আনা মায়ের স্বপ্নপূরণে কাজ শুরু করেন।

মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকে আনা চেয়েছিলেন সব মাকে শ্রদ্ধা জানাতে। তাই একটি দিবস প্রচলনে সচেষ্ট হন। ১৯০৮ সালে জাতীয়ভাবে দিনটি পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে প্রচারণা শুরু করেন। কংগ্রেসে মা দিবসকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি ছুটি ঘোষণার জন্য দাবি তোলেন সরকারের কাছে। কিন্তু একই বছর মার্কিন কংগ্রেস প্রস্তাবটি নাকচ করে।

তবে আনা তাঁর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। পরের বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মা দিবস পালিত হতে থাকে। ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন (১৮৫৬-১৯২৪) মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবসের স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। আনার সেই প্রচেষ্টা দিন দিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

সেই হিসেবে আজ ১০ মে,২০২০, মে মাসের দ্বিতীয় রোববার। আন্তর্জাতিক মা দিবস। পৃথিবীর সকল মায়েদের জানাই আন্তরিক ভালবাসা, অনেক বেশি ভালবাসা।

মা এমন একজন মানুষ যাকে বাদ দিয়ে জীবনের কোন কিছুই ভাবা যায় না। এই যে আমাদের প্রত্যেকের মাঝে অনেক গুণ, স্বভাব, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, সহ্য শক্তি এই সব কিছুই কোন না কোনভাবে মানুষ নিজের মায়ের থেকেই পেয়ে থাকে।

মায়ের মর্যাদা ঠিক কতখানি তা মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম মা’কে দিয়েছে বর্ণনাতীত মর্যাদা ও সম্মান। ইসলামের দৃষ্টিতে বাবার চেয়ে মায়ের মর্যাদা তিন গুণ বেশি।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! মানুষের মাঝে আমার নিকট থেকে সর্বোত্তম সেবা লাভের অধিকার কার? নবী (সা.) বলেন, তোমার মায়ের। লোকটি পুনরায় জানতে চাইলেন, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি পুনরায় জানতে চাইলেন, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবারও জানতে চাইলেন, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার পিতার।’ (বোখারি ও মুসলিম)
হাদিস থেকে আরও জানা যায় যে, নামাজ চালিয়ে যাওয়া থেকে মায়ের ডাকে সাড়া দেয়া উত্তম কাজ। ইসলামে মা হিসেবে নারীকে যে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে দুনিয়ার অপর কোন সম্মান বা মর্যাদার সাথে তার তুলনা চলে না।

মায়ের সেবা-যত্ন না করলে, মাকে কষ্ট ও দুঃখ দিলে সন্তান যতই ইবাদত-বন্দেগি আর নেক কাজ করুক না কেন, তার পক্ষে বেহেশত লাভ করা সম্ভব নয়। একজন সন্তানের জীবনে তার মায়ের গুরুত্ব এতই বেশি যে, সেই মায়ের পায়ের তলে তার বেহেশত। তার মানে একজন সন্তান তার মায়ের মধ্যেই তার বেহেশতের দেখা পেয়ে যেতে পারে।

নিজের মা বেঁচে থাকতে কতদিন, কতবার তাঁকে আদর করেছি আমরা? কতবার বলেছি, ‘মা, তোমায় ভালোবাসি’? জীবনচক্রের ঘূর্ণন শুরু হয় সেই জন্মলগ্ন থেকে৷ এরপর ছোটবেলা কাটিয়ে উঠে কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য আর সবশেষে অনিবার্য মৃত্যু৷ এই ধ্রুব সত্য শুধু আপনার-আমার নয়, সবার জন্য৷ তাই দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিন৷ যতদিন ‘মা’ বেঁচে আছেন, ততদিন, প্রতিটি দিন পালন করুন ‘মা দিবস’ হিসেবে৷ মাকে বলুন, মা আমি তোমায় ভালবাসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here