প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার

বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তান মিলে তখন ছিল ভারত উপমহাদেশ। ধনসম্পদে ফুলে ফেঁপে ছিল এই উপমহাদেশ। তখনকার সময় এই উপমহাদেশের দিকে নজর ছিল ইউরোপের অনেক দেশের। এর মধ্যে এক জাতি হচ্ছে ইংরেজ জাতি।

১৭৫৭ সালে ঘৃণ্য কৌশল করে কিংবা পাতানো যুদ্ধ করে ইংরেজরা আমাদের এই উপমহাদেশ দখল করে নিয়েছিল। তারপর শুরু হয়েছিল তাদের শোষণের ইতিহাস। এই দেশ থেকে ইংরেজ হটাতে তখন উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল স্বদেশী আন্দোলন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখা এক সাহসী আর সংগ্রামী নারী ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

সেই সময়ে, সাহেব দেশের লোকেরা যখন আমাদের দেশকে শোষণ করে, তখন আমাদের উপমহাদেশ মেয়েদের অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। মেয়েরা ঘর থেকে বের হতেন না, পড়ালেখা শেখার অধিকার ছিল না, বিয়ে করে ছেলে সন্তান জন্ম দেয়া প্রধান লক্ষ ছিল। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হলেও মেয়েরা বন্দী ছিল সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায়। ঠিক সেই সময়ের মেয়ে হলে প্রীতি অংশ নিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, আর নিজেকে করে রেখেছেন চির স্মরণীয়।

প্রীতিলতা ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, তার বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার আর মায়ের নাম প্রতিভা দেবী। মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জালিয়ানওয়ালাবাগ- এর নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিতে আক্রমণ করেছিলেন চট্টগ্রাম শহরের ইউরোপিয়ান ক্লাব।
চট্টগ্রাম শহরের বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করে ঢাকায় ইডেন কলেজ-এ ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম এবং ছাত্রীছাত্রদের মধ্যে ৪র্থ স্থান দখল করেন। তারপর তিনি কলিকাতায় গিয়ে বেথুন কলেজে বিএ-তে ভর্তি হন।

সেই সময়ে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে কলিকাতার আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসির প্রতিক্ষায় ছিলেন। প্রীতিলতা রামকৃষ্ণের ভগ্নি পরিচয় দিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাঁর কথায় বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হন। প্রীতিলতা বিএ পাস করে চট্টগ্রামে ফিরে শহরের নন্দনকানন বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষয়িত্রীর পদ গ্রহণ করেন এবং মাস্টারদার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন।

ভারতের মুক্তিসংগ্রামে প্রীতিলতা অগ্নিযুগের প্রথম মহিলা শহীদ। তিনি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে সফলভাবে সে দায়িত্ব পালনের পর রাত ১২টা অতিক্রম হয়ে ঘড়ির কাঁটা ২৪ সেপ্টেম্বরে প্রবেশ করার অল্প কিছুক্ষণ পরেই প্রীতিলতা আত্মাহুতি দিয়ে অমরত্ব লাভ করেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে।

পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের জন্য প্রথমে বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একদল বিপ্লবীর ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়। নানাকারণে এই তরুণ বিপ্লবী পর পর দুবার পাহাড়তলী ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হন। ব্যর্থতার বেদনা সহ্য করতে না পেরে শৈলেশ্বর চক্রবর্তী এক রাতে কাট্টলীর সমুদ্রতীরে গিয়ে নিজের রিভলবার দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এরপর স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীরাও যে নেতৃত্ব দিতে পারে, তা প্রমাণ করার জন্য মহানায়ক সূর্য সেন ওই ইউরোপীয়ান ক্লাবটি আক্রমণ করার দায়িত্ব প্রীতিলতার ওপর ন্যস্ত করেন। তিনি বলেছিলেন- ‘বাংলায় বীর যুবকের আজ অভাব নাই। বালেশ্বর থেকে জালালাবাদ, কালারপুল পর্যন্ত এদের দৃপ্ত অভিযানে দেশের মাটি বারে বারে বীর যুবকের রক্তে সিক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলার ঘরে ঘরে মায়ের জাতিও যে শক্তির খেলায় মেতেছে, ইতিহাসে সে অধ্যায় আজো অলিখিত রয়ে গেল। মেয়েদের আত্মদানে সে অধ্যায় রচিত হোক এই-ই আমি চাই। ইংরেজ জানুক, বিশ্বজগৎ জানুক, এদেশের মেয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে পিছিয়ে নেই।’

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ শেষে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে দেন। কালীকিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে, কালীকিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন। ময়না তদন্তের পর জানা যায় গুলির আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না এবং পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ।

প্রীতিলতা আহত হয়েছিলেন এবং সেই আঘাত থেকে রক্তক্ষরণে তাঁর গায়ের পোশাক ভিজে যাচ্ছিল, তা থেকে প্রীতিলতা হয়তো মনে করেছিলেন, তাঁর আঘাত বেশ গুরুতর। আর ওই অবস্থায় শত্রুর হাতে যাওয়া অপেক্ষা নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া ভালো মনে করেই প্রীতিলতা সায়ানাইড খেয়েছিলেন। মাত্র একুশ বছর বয়সে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে প্রীতিলতা বীর নারীর অমরত্ব লাভ করেন।

মৃত্যুর পর প্রীতিলতার আত্মলিপিতে তাঁর আত্মাহুতির পটভূমির যে বিবরণ পাওয়া যায়, সে এক নারী জাগরণের মহান দৃষ্টান্ত। নিজের হাতের লেখা বিবৃতিতে প্রীতিলতা জানিয়েছিলেন- “আমি বিধিপূর্বক ঘোষণা করিতেছি, যেই প্রতিষ্ঠানের উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া অত্যাচারীর স্বার্থ সাধনে প্রয়োগকারী সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ সাধন করিয়া আমরা মাতৃভূমি ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করিতে ইচ্ছুক। আমি সেই ভারতীয় রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখার একজন সদস্যা।”

সেই বীর, সংগ্রামী নারী প্রিতীলতা ওয়েদ্দারের আজ ১১০তম জন্মবার্ষিকী। শুভ জন্মদিন বীর কন্যা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here