সূরা ইখলাস

সূরা ইখলাস

কুরআন শরীফে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে। প্রতিটি সূরা নাজিল হয়েছে বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে। এর মধ্যে কোন কোন সূরা বিশেষ ফজিলতের। কুরআন শরীফের এমনি এক বরকতময় সূরা হচ্ছে “সূরা ইখলাস”।
পবিত্র কুরআন শরীফের ১১২ নাম্বার সূরা হচ্ছে সূরা ইখলাস, আয়াত সংখ্যা ৪ আর রুকু ১। আয়াতের দিক থেকে ছোট হলেও এ সূরার ফজিলত অনেক বেশি। এটি সূরা নাসের পর হিজরতের আগে মক্কার প্রথম যুগে অবতীর্ণ হয়।

এ সূরার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ তাআলা নিজের পরিচয় তাঁর হাবিবকে দিতে বলেছেন। বন্ধুর পরিচয় বন্ধু দেওয়ার মাধ্যমে বন্ধুর শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণিত হয়েছে। এ সূরার শানে নুজুল প্রসঙ্গে হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, খাইবারের কয়েকজন ইহুদি একদা মহানবী (সা.) এর দরবারে এসে বলে, হে আবুল কাশেম! আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের নূর থেকে, আদমকে মাটি থেকে এবং পৃথিবীকে পানির ফেনা থেকে সৃষ্টি করেছেন। এখন আপনার রব সম্পর্কে আমাদের জানান, তিনি কোন বস্তুর থেকে সৃষ্ট? রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো জবাব দেননি। অতঃপর হজরত জিবরাঈল (আ.) সূরা ইখলাস নিয়ে আসেন।

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে রাতে বারবার সূরা আল ইখলাস পড়তে শুনেছেন। অতঃপর সকালে মহানবী (সা.)কে এ বিষয়টি অবহিত করা হলো। মহানবী (সা.) তখন বলেন, ঐ স্বত্বার শপথ, যার কুদরতের হাতে আমার জীবন, অবশ্যই এ সূরা কুরআন মাজিদের এক-তৃতীয়াংশের সমান। (সহিহ বুখারি : ৫০১৩, আবু দাউদ : ১৪৬১, নাসায়ি : ২/১৭১, মুআত্তা মালেক : ১/২০৮)

মহানবী (সা.) একদা সাহাবিদের বলেন, তোমরা কি এক রাতে কুরআন মাজিদের এক-তৃতীয়াংশ পড়তে পারবে? সাহাবিরা এ প্রস্তাবকে খুবই কঠিন মনে করলেন। ফলে তারা বলল, আমাদের মধ্যে এ কাজ কে করতে পারবে? মহানবী (সা.) তখন বললেন, সূরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০১৫, নাসায়ি, হাদিস : ৯৯৫)

হাদিসে আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে, তাকে বালা-মসিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়। (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ি)
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তিনটি কাজ ইমানের সঙ্গে করতে পারবে জান্নাতের যেকোন দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করতে পারবে।

(১) যে হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে।
(২) যে ব্যক্তি গোপন ঋণ পরিশোধ করবে।
(৩) এবং যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে (তাফসিরে কাসির)।

সূরা ইখলাসের ফজিলত অনেক। সূরা ইখলাস যিনি ভালোবাসবেন, তিনি জান্নাতে যাবেন। হাদিসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে আরজ করলেন, আমি এই সূরাকে ভালোবাসি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সূরা ইখলাসের প্রতি ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। (মুসনাদে আহমদ ৩/১৪১)

সূরা ইখলাসের অর্থ
বলুন, তিনি (আল্লাহ) এক এবং অদ্বিতীয়, আল্লাহ কারও ওপর মুখাপেক্ষী নন এবং সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁর কোনো সন্তান নেই এবং তিনি কারও সন্তানও নন এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
ইসলামের মূল জিনিসটাই হচ্ছে তাওহিদ। এ সূরায় শেখানো হয়, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তিনি কারও থেকে জন্ম নেননি, কোন কিছুর সমতুল্য নন তিনি। কুরআন শরীফ আমাদের তিনটি মৌলিক জিনিস শেখায়- তাওহিদ, আখিরাত ও রিসালাত। অর্থাৎ আল্লাহ, পরকাল ও ওহী।
অন্য যেকোনো বিশ্বাস এই তিনের মধ্যে পড়ে যায়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের বিশ্বাস, আল্লাহর প্রেরিত ওহীর প্রতি বিশ্বাস। যখন আমরা বলি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, এর মধ্যে আল্লাহর সব নাম, সব গুণ, কাজকে বোঝায়। যখন বলি, আখিরাতে বিশ্বাস, তার মধ্যে কবরের জীবন, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নাম- সব এসে যায়।

এভাবে যদি চিন্তা করি, তাহলে বোঝা যায়, বিশ্বাসের এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কথাই বর্ণিত হয়েছে এই সূরাতে। আপনি যদি শুধু বোঝেন যে এই সূরাতে কী বলা হয়েছে, তাহলে দ্বীনের পথচলা শুরু করার মূলটা আপনি ধরতে পেরেছেন। সহীহ হাদিসে আছে, সূরা ইখলাস তিনবার পাঠ করলে এক খতম কুরআন তিলাওয়াতের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here