ফিলিস্তিনের কন্যা

শাওন আহমেদ

নিত্যদিনকার মতো আজও স্কুলের ঘন্টা দেওয়ার সাথে আনিকা তার বান্ধবীদের সাথে মায়াবী মুখে সহাস্যে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছিল।তার সেই মুখের মৃদু হাসির নেই কোনো তুলনা।সেই হাসি যে চাঁদকেও হার মানায়। কৃত্রিমতা বিবর্জিত সেই হাসির দিকে যে তাকিয়েই জীবন পার করে দেওয়া সম্ভব!কিন্ত এই কৃত্রিমতাহীন হাসি তো আর শয়তান ইহুদী হানাদের ভুলিয়ে রাখতে পারে না!
শয়তান ইহুদী হানাদের মধ্যে তো নেই কোনো দয়া-মায়া, স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা।তাইতো ওরা পারল চাঁদের মতো হাসিময় সেই মেয়েটির মুখ থেকে সেই কৃত্রিমতাবর্জিত সেই হাসিকে কেড়ে নিতে! এতে ওদের মনের মধ্যে বাধলো না কোনো দ্বিধা।পারবেই বা কেমন করে? এই রকম হাজারো অন্যায়-অনৈতিক কাজ যে ওদের রোজকার চিরাচরিত অভ্যাস।আজকে কোনো মায়াববিনী মেয়েকে তুলে নেওয়া, কালকে কোনো যুবককে বুলেটের আঘাতে ঝাঝরা করে দেওয়া,কোনো বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে গুলির আঘাতে শেষ করে দেওয়া! এসবই যে এই হানাদের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা!

তাই আজকেও আনিকাকে তার বান্ধবীদের মাঝে থেকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ওদের সাথে নিয়ে নিলো অনায়াসেই। চারদিকে যেন নিরবতা নেমে এলো। তার বান্ধবীরাও যে আজ মুখ থাকতেও পারল না কোনো প্রতিবাদ করতে, হাত থাকলেও যে পারল না যে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে! পারবেই বা কেমন করে! সবার মাঝেই যে একরাশ ভয় কাজ করে হায়েনাদের দেখলে! কেউ যদি কোনো প্রতিবাদ করে তাহলেই যে তাকেও আনিকার মতো একইরকম বাস্তবতার সাক্ষী হতে হবে! তাই কেউই এগিয়ে এলো না প্রতিবাদে! সবাই যেন নিশ্চুপ দর্শকের ভূমিকায় অভিনয় করছে!

কিন্ত এই ফিলিস্তিনের মাটিতেই যে সালাহুদ্দীনের উত্তরসূরিরা রয়েছে। তারা থাকতে তাদের চোখের সামনে কোনো অন্যায় কাজ হয়ে যাবে,তা যে তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। তাদের চোখের সামনে থেকেই তাদের মা-বোনদের তুলে নিয়ে যাবে নরপিশাচেরা তা যে তারা কিছুতেই বরদাশত করতে পারবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের হাত যে রাইফেলের কাজ করবেই!
ঠিক সালাহুদ্দীন আইয়ুবীদেরই উত্তরসূরি এক যুবক এগিয়ে আসছে নির্ভয়ে হায়ানাদের দিকেই!বাকি সব ফিলিস্তিনারা শুধু হা করে তাকিয়ে আছে সেই যুবকের চোখের দিকে! তার চোখ দিয়ে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে শুধু আগুনের লাভা! ধীরপায়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে সেই নরপিশাচদের দিকে। সেই যুবক যে আর কেউই না। এ যে আহমাদ! আহমাদ আল সাবা!ফিলিস্তিনের সেই বীর যুবক! সে যে ভয় পায় না কোনো ইহুদীদের দেখেই!

ইহুদীদের কাছে তো রয়েছে ভারী ভারী কত অস্ত্রশস্ত্র!অন্যদিকে আহমাদের যে নেই কোনো সামান্যতম রাইফেলটাও!কিন্ত এত এত অস্ত্রশস্ত্র দেখেও যে তার মাঝে বিরাজ করছিলো না কোনো ভয়! করবেই বা কেমন করে! সে যে এক আল্লাহকে বিশ্বাস করে। সে মনে করে আল্লাহ তো তার সাথেই রয়েছে!তো ভয় আবার কীসে!

সে নিঃসংকোচে এগিয়ে সোজাসুজি সামনে দাড়ায় হায়েনাদের! হায়েনারা তাকে দেখে তাচ্ছিল্যের সাথেই বলে, “কীরে ছোকরা তুই কি পাগল নাকিরে!মরার শখ হয়েছে বুঝি!” আহমাদের মুখে নেই কোনো কথা!সে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে পাশেই তার বোন অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে! তার সেই অশ্রু যে তার কাছে অনেক দামি! তার সেই অশ্রু যেন আহমাদকে বলছে, “ভাইয়া, আমাকে এই নরপিশাচদের হাত থেকে মুক্ত করুন প্লিজ! ওরা যে আমাকে মেরে ফেলবে!

আহমাদ যেন আর একমুহূর্তও দেরি করতে চাইলো না! তাইতো সে একটা হ্যাঁচকা টানে হায়েনাদের কাছে থেকে ছুটিয়ে আনল! আর এর সাথে সাথেই হায়েনাদের রাইফেল থেকে পাঁচটা বুলেট এসে বিঁধল আহমাদের বুকে!সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আহমাদ! তার মাটিতে লুটিয়ে পড়া দেখে এতক্ষণে যেন নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বাকি ফিলিস্তিনিদের হুশ ফিরলো!তারা যেন সংবিৎ ফিরে পেল! এখন তারা একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই হায়েনাদের দিকে! হায়েনারাও যেন অবস্থা বেগতিক দেখে পালাতে চেষ্টা করল!কিন্ত এতগুলো ফিলিস্তিনদেরর সাথে তারা আর পেরে উঠলো না! সেইখানেই ফিলিস্তিনিরা হায়েনাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দিল!

আর অন্যদিকে আনিকা আহমাদের পড়ে থাকা নিথর দেহের একপাশে বসে নিরবে অশ্রু ফেলেই যাচ্ছিল!তার সেই অশ্রু যেন একটু অভিমানের সুরেই আহমাদকে বলেই যাচ্ছিল,”কেন ভাইয়া,কেন! তুমি শুধুই আমার জন্য তোমার জীবনটা বিলিয়ে দিলে!কেন ভাইয়া,বল প্লিজ!”
আনিকা হয়ত জানে না তার সেই মায়াবী মুখের এক ফালি চাঁদের মতো হাসিটুকু ফিরিয়ে আনার জন্যই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করল!

আজও ফিলিস্তিনিরা আহমাদকে তাঁর বীরত্বের জন্য স্মরণ করে।তাঁর জন্য দোয়া করে। তারা আহমাদকে তাদের বীরপুরুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করে!কিন্ত ফিলিস্তিনারা কি জানে আনিকাও যে আহমাদের কথা মনে পড়লে নীরবে নিভৃতে আজও অশ্রু ফেলে যায়!তার সেই অশ্রুর সাথে থাকে আহমাদের প্রতি এক টুকরো অভিমানও!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here