বাইপোলার রোগ

 

আমাদের আশেপাশে আমরা অনেক ক্রিয়েটিভ মানুষ দেখতে পাই, যাদের দেখলেই মনে হয়ে থাকে তারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, তাদের তারা সব কিছু করে ফেলা সম্ভব। অনেক সময় সেই সব আত্মবিশ্বাসী মানুষদের আমরা অনেক অসাধ্য সাধন করতে ও দেখি কিন্তু পরক্ষনেই সেই মানুষকেই দেখি যে হঠাৎ করে তার আত্মবিশ্বাসের কমতি হয়ে যায়, ছোট ছোট জিনিসে অনেক বেশি রাগ হয়, মেজাজ খিটখিটে থাকে কিংবা আশেপাশের কাউকেই সহ্য হয়না। এই ধরনের অদ্ভুদ চরিত্রের মানুষদের আমরা আমাদের আশেপাশে অনেক দেখতে পাই, এমনকি নিজেদের পরিবারের অনেকের মধ্যেই আমরা এই দুই রকমের চরিত্রের মানুষ দেখতে পাই। তাদের এই হুট করে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া চরিত্রের কারন আমাদের ও অনেক বেশি অবাক করে। আবার অনেক সময় আমি কিংবা আপনি নিজেও এই ধরনের সমস্যায় ভুগি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছি কি যে এর সমস্যার নাম কি ? কারন কি? বা এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি??
আমাদের সবার মেজাজ পরিবর্তন ব্যাপারটা খুবই সহজাত প্রভৃতি বলে মনে হয় কিন্তু নিতান্ত কোনো কারণ ছাড়াই এই কি স্বাভাবিক? অবশ্যই না। এটি শুধুমাত্র অস্বাভাবিক নয়, রোগও বটে। আর এই রোগের নাম বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার। বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার’ বা দ্বিমুখী আচরণ বৈকল্য একটি গুরুতর আবেগঘটিত মানসিক রোগ।

বাই পোলার নাম থেকেই বুঝা যাচ্ছে এই রোগের দুইটি দিক বা মেরু। অর্থাৎ এই রোগে আক্রান্ত রোগী দুই ধরনের চরিত্র প্রদর্শন করেন। তার আচরনের একদিকে থাকে ‘ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা’, অপরদিকে থাকে ‘ম্যানিক কন্ডিশন’ বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস।এই যে হটাত করে দেখা যায় অনেক বেশি হাসি খুশি কিংবা আত্মবিশ্বাসী, ছোট খাটো যে কোন বিষয়ে দেখা যায় অনেক বেশি উত্তেজিত কিংবা খুব ক্রিয়েটিভ কোন কাজ করতে তখন আসলে ব্যাক্তি ম্যানিক কন্ডিশনে থাকে । আর যখন হুট করে চরম বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন থাকতে দেখা যায়, কাজে অনীহা হারিয়ে ফেলে এমনকি অনেক সময় নিজের মৃত্যুর কথাও চিন্তা করে তখন বুঝতে হবে ওই ব্যক্তি এখন ডিপ্রেশনে আছেন।

কি আজব এক সমস্যা তাই না? জানতেও ইচ্ছে হয় কেন হয় এই ধরনের সমস্যা বা কি করেই বুঝবো যে আমি এই রোগে আক্রান্ত। আসলে এই রোগের সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে সাধারণত পরিবেশগত ও জিনগত কারণগুলি এক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে। আর অনুমান করা হয় যে জেনেটিক সমস্যা, হরমোনের ঘাটতি, চূড়ান্ত মানসিক ধাক্কা, মাদকাসক্তি, অবহেলা, একাকীত্ব,শৈশবের কোনো মানসিক আঘাত ইত্যাদির কারণে এই রোগ হতে পারে। বাইপোলারের পাশাপাশি সিজোফ্রেনিয়ার মত অসুখও হবার সম্ভাবনা থাকে।
বাইপোলার বা বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার বা ম্যানিক ডিপ্রেসন হলো এক ধরণের কঠিন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।যে কোনো বয়সের, যে কোনো সামাজিক বা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের নারী-পুরুষেরই এটি হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মস্থলে, পরিবারে, খুব কাছের বন্ধুদের কাছে তার সমস্যাগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। বেশির ভাগ বাইপোলার রোগীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি তাদের কৈশোর বা শৈশব থেকেই শুরু হয়; কিন্তু সনাক্ত হতে অনেক দেরি হয়ে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে মা হওয়ার পরপর কিংবা ম্যানোপজের সময়ও এ ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবেই, সাধারণত এধরণের সমস্যাক্রান্ত ব্যক্তির আচরণকে শুরুতে মানসিক সমস্যার লক্ষণ মনে করেন না তার আত্নীয়-পরিজনরা। ফলে সমস্যাটি খুব তীব্র অবস্থায় না পৌঁছুলে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হননা কেউ। প্রারম্ভিক অবস্থায় সনাক্ত করতে পারলে বাইপোলার নিয়ন্ত্রণ, বা নির্মূল যতোটা সহজ, দীর্ঘদিন ধরে আনডায়াগনোস্‌ড থাকলে এটিকে বাগে আনা তারও চেয়ে বেশি কঠিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ভেতর এ রোগের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না; বরং কেউ তাকে এ ব্যাপারে বলতে গেলে রেগে যান। এ কথা ঠিক যে, সুনির্দিষ্ট কোনো টেস্ট না থাকায় বাইপোলার ডিসওর্ডার সনাক্ত করা চট করে সম্ভব নয়। সেকারণেই আচরণগত এসব সমস্যা আসলে বাইপোলারের কারণেই হচ্ছে তা নিশ্চিত করার পূর্বে চিকিৎসকদেরকে সতর্কতার সাথে, সময় নিয়ে রোগীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

যা হোক, এবার বাইপোলার রোগীর রোগলক্ষণ প্রসঙ্গে আসা যাক। আক্রান্ত ব্যক্তির যে দু’রকম আচরণগত/আবেগীয় বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তার একটিকে বলা হয় ‘ম্যানিয়া’। এই অবস্থায় রোগী অস্বাভাবিক আনন্দ অনুভব করেন। তখন তার মধ্যে খুব আত্মবিশ্বাসী ভাব কাজ করে। দ্রুত এবং অতিরিক্ত কথা বলেন। নিজের আনন্দকে প্রকাশ করতে গিয়ে অতিরঞ্জন করেন, কখনও কখনও মিথ্যা বলেন। আক্রান্ত ব্যক্তি ফেইসবুক ব্যবহারকারী হলে, নিজে কতো আনন্দে আছেন সেটির খুব জোরালো প্রকাশে মনযোগি হয়ে থাকেন প্রায়শ, এমনকি মিথ্যা তথ্য দিয়ে হলেও। তিনি ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না তেমন। নিজেকে অনেক শক্তিশালী মনে করেন, অস্থির থাকেন। হুট করে কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেন। কারও কারও যৌন চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কেউ কেউ অতি অবাস্তব পরিকল্পনায় বুঁদ হয়ে থাকেন, কিংবা অতিরিক্ত টাকা-পয়সা খরচ করে থাকেন, বিশেষ করে কেনাকাটায়। টাকা না থাকলেও প্রচণ্ড ইচ্ছে জাগে অনেক খরচ করার। সমাজের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন পরিবর্তনে নিজেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত মনে করেন তিনি। বিচারবোধ তার ঠিকমতো কাজ করে না। কাজের ফলাফল কী হবে তা না ভেবেই বিভিন্ন কাজ শুরু করতে দেখা যায় তাকে। এই আচরণগুলোর একটু লঘু মাত্রাকে ‘হাইপো ম্যানিয়া’ বলে।

বাইপোলারের দ্বিতীয় প্রান্তের নাম ডিপ্রেশন তথা বিষন্নতা। বিষণ্ণতার লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায় অনেক দিন ধরে মন খারাপ থাকা, কোনো কাজে আগ্রহ না পাওয়া, আনন্দের অনুভূতি কমে যাওয়া, ঘুম কমে যাওয়া বা বেশি ঘুমানো, ঘুম ভেঙে এমন মনে হওয়া যে ‘আরেকটি খারাপ দিন শুরু হলো’, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, কাজে মনোযোগের অভাব, অহেতুক কোনো কাজের জন্য অনুতপ্ত বোধ করা, ভালোবাসা বা যৌনতার অনুভূতি কমে যাওয়া বা হঠাৎ খুব বেড়ে যাওয়া, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হওয়া, খাবার ইচ্ছা কমে যাওয়া বা খুব বেশি খেতে ইচ্ছে করা, শারীরিক কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে মাথাব্যথা থাকা ইত্যাদি।
প্রায় ক্ষেত্রেই ম্যানিয়া’র চেয়ে ডিপ্রেশনের স্থায়িত্ব বেশি হয়ে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি মা হলে অনেক সময় সন্তানকে সহ্য করতে পারেন না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানের বাবাকেও না। অবস্থা খুব চরমে গেলে আত্মহত্যার ইচ্ছে জাগে; প্রথম দিকে আত্মহত্যা কীভাবে করা হবে—এ বিষয়ে বিস্তর পরিকল্পনায় সময় কাটে। এর বেশি এগোয় না। কিন্তু কেউ কেউ এক পর্যায়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী তা করে ফেলেন। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে এরকম বহু বিখ্যাত ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় যারা বাইপোলারে আক্রান্ত হয়ে শেষে আত্মহত্যা করেছেন।

তবে আমাদের অনেকের একটি সমস্যা হলো, কোনো বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি জানবার পর সেগুলোর আলোকে পণ্ডিতি ফলানোর চেষ্টা করা, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অকার্যকর, কখনও উলটো ফল বয়ে আনে। ঠিক তেমনি বাইপোলার সম্পর্কে তথ্য জানার পর অনুরূপ কুফলের সম্ভাবনাও অমূলক নয়। কারও মধ্যে ডিপ্রেসন দেখে বা কাউকে অনেক আনন্দ করতে দেখে তার বাইপোলার হয়েছে ধরে নেয়া মোটেও উচিত হবে না। এ কাজটি কেবল একজন প্রশিক্ষিত, দক্ষ সাইকোলজিস্টের পক্ষেই সম্ভব। তবে উপর্যুক্ত লক্ষণগুলোর পুনঃপুন প্রকাশ কারও মধ্যে দেখতে পেলে সঠিক করণীয় হবে তাকে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া।
একই সাথে আসুন, সবাই নিজেদের পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি আরও যত্নশীল হই, যাদেরকেে প্রিয় ভাবি, তাদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হই, তাদেরকে সময় দিই, তাদের চোখের দিকে তাকাই, আর শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর রাখি—আসুন সবাই সবাইকে আরও ভালোবাসি, ভালো থাকার চেষ্টা করি। একবার যাদেরকে ভালোবেসেছি তাদেরকে দূরে না সরাই। ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী?

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here