মায়াবতী সন্ধ্যা তার মায়াবী আধো অন্ধকারের চাদর অনেকটা ফেলে দিয়েছে। গোল গোল হ্যালোজেন লাইট গুলো প্রাণপণ চেষ্টা করছে চাঁদের কথা ভুলিয়ে দিতে। কিন্তু পারছে না তারা।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে রাস্তার একপাশে হ্যালোজেন এবং আরেক পাশে সোডিয়াম বাতি।

এই দুইয়ের এক অভূতপূর্ব আদুরে সংমিশ্রণ ঘটেছে।

সোডিয়াম তার হলুদাভ আলো দিয়ে এক ধরনের মায়াযুক্ত নেশা লাগাচ্ছে। আর অপরদিকে হ্যালোজেন এর ঝলসানো তীব্র সাদা আলো বাস্তবে ফিরিয়ে আনছে। আর সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এই অদ্ভুত পরিস্থিতিকে পূর্ণতা দিয়েছে।

অবশ্য আমি রেইনকোট পরে আছি। তাই ভিজে যাচ্ছি না। এই রাস্তাটা আমার খুব প্রিয়। মাঝে মাঝেই আমি এই রাস্তাটা ধরে হাটি। সবাই এই রাস্তাটাকে ডাকে ‘ইংলিশ রোড’ বলে। কিন্তু আমি এর নাম দিয়েছি ‘আবৃত মায়া’।

আমাদের ভালোবাসার অনেক স্মৃতি আছে এই রাস্তায়। অসংখ্য বার মায়াবতীর হাতের চুড়িতে আমার আঙুল আটকিয়ে বাচ্চাদের মত তার সাথে হাটতাম। আর সে বলে উঠে ”তুমি পা থেকে মাথা পুরোটাই একটা বাচ্চা।”আমি এটা শুনে আরো বাচ্চাদের মত হেসে উঠতাম। আবার কখনো কখনো একটা বাড়ির সামনে বসে পড়তাম। বাড়িটার নাম ছিল ”দিনশেষে”।

আমরা দিনশেষেই এই বাড়িটার সামনে এসে বসতাম। স্বপ্ন আঁকতাম দুইজনে একদিন এই বাড়িটা কিনে নিব আমরা । আর নাম পাল্টিয়ে রেখে দিব ”দুই বাচ্চা”। এটা শুনে সে কপট রাগ দেখিয়ে বলে উঠত ”আমি বাচ্চা? আমি বলতাম ”তাহলে কি বাচ্চার মা হতে চাও?” আর তখনি সে ভয়ানক ধরনের লজ্জা পেত।আর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলত।

এতকিছু ভাবতে ভাবতে ফোনটা হাতে নিলাম তাকে ফোন দেওয়ার জন্য।

ওহ !! মনে পড়ল এই সময় না তার প্রাইভেট এর স্যার পড়াতে আসেন। আচ্ছা থাক পরেই ফোন দিব নে। তবে তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।

এই রাস্তার তিন গলি পরেই তাদের বাসা। চাইলে অবশ্য তাকে দেখে আসা যেতে পারে। হাটা দিলাম আমার প্রেয়সীকে দেখার জন্য। একদিনের কথা মনে পড়লো। আমি তাকে রাস্তায় সবার সামনে বউ বলে ডেকে উঠেছিলাম।

ওমা! সে কি লজ্জা। অনেকক্ষণ তাকায়ই না সে আমার দিকে।

পরে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠান্ডা করার পর আমার দিকে তাকায় সে।

তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম ”বউ বলেছি দেখে লজ্জা পাও কেন এত? আমাদের সম্পর্কের ৪ বছর হয়ে গেল তাও এত লজ্জা তোমার?” সে বলে উঠত ”লজ্জা হচ্ছে নারীর ভূষণ।তাই ঘন ঘন লজ্জা পেতে হয়।” আমি বলতাম ”তাই বলে তোমার হবু বরের কাছে কিসের লজ্জা?” এটা শুনে সে আবার লজ্জা পেয়ে যেত।

আর আমি তার লজ্জামাখা মুখখানা দেখে ভাবতাম সারা দুনিয়া আমার পায়ের সামনে এনে দিলেও এই মুখখানা ছেড়ে দিব না। পূর্ণিমার চাঁদ কিছুই না তার এই মুখখানার সামনে।

একদিন তার ভীষণ মন খারাপ। কিছুতেই বলবে না কি হয়েছে তার। পরে শুনি সে একটা ফড়িং ধরেছিল। ছোট্ট খাঁচায় রাখতে যেয়ে ফড়িংটা উড়ে চলে যায়।

আমি শুনে হাহা করে হেসে দিয়েছিলাম।এতে তার সে কি রাগ। তখন আমি বললাম “আচ্ছা শুনো! প্লিজ মন খারাপ করো না ফড়িং এর মা। ” এটা শুনে তার রাগ আরও বেড়ে গিয়েছিল। কথাই বলবে না সে আমার সাথে।

পরে তাকে একটা প্রজাপতি ধরে দিয়েছিলাম। আমার কপালটাও ভালো। নয়ত ওই সময়ে ওইখান দিয়ে প্রজাপতি যাবে কেন? অবশেষে চলে এসেছি তার বাসার সামনে। বাহ! আমার মায়াবতীর  বাসাটা ঝলমল করছে তার মুখখানার মতই। সারা বাড়িতে মরিচবাতি লাগানো হয়েছে। সাদা,নীল,হলুদ রঙের লাগানো হয়েছে।

আচ্ছা মরিচবাতি কালো রঙের হয় না কেন? আমার খুব ইচ্ছে আমার বিয়েতে কালো রঙের মরিচবাতি লাগাবো। কিন্তু কার বিয়ে হচ্ছে? বুঝতে পারছি না।

ওহ !! মনে পড়েছে। আজ তো আমার মায়াবতীর বিয়ে তার স্যারের সাথে।

আজ থেকে আরও ১ মাস আগে এক ভুল বোঝাবুঝিতে তার সাথে আমার সম্পর্ক এর অবসান ঘটে। এরপর থেকে তার সাথে কত যোগাযোগ এর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে পাত্তাই দেয় নি আমায়।

কিছুদিন পর দেখি স্যারের হাত ধরে ঘুরছে সে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল সেদিন। কয়েকদিন স্তব্ধ ছিলাম আমি।

তার কিছুদিন পর শুনি স্যারের সাথে তার বিয়ে। আমি কিছুই বলিনি তাকে এরপর থেকে। একটা বারের জন্যও বিরক্ত করিনি তাকে। হাটতে হাটতে চলে এলাম সোডিয়াম বাতি আর হ্যালোজেন বাতির মাঝে।

এই বাতিগুলার নিচে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একদিন প্রপোজ করেছিলাম তাকে। ঠিক সেই জায়গাটায় চলে এলাম। রেইনকোটটা বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম সেখানে। গাড়ি হয়ত এইখান দিয়ে আসতে পারে।

আচ্ছা! সমস্যা নেই আসুক।

তাও আজ রাতটা এখানেই কাটাব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here