গল্প: বাস্তবতার আড়ালে
লেখক: আজফার মুস্তাফিজ

কোনোদিন শুনেছেন? প্রেমিক নিতান্তই কাপুরষ। সত্যিকারের প্রেমিক পারে না প্রকাশ্যে দেখা করতে। সাহস হয় না হঠাৎ চুম্বনের।

একটা ছেলে কবিতা লেখে। বলা যায় সে কবি। নিজেকে নিজেই কবি দাবি করে৷ ঐ তো দুই লাইন কবিতা লিখেছি, আমি কবি। উপহাস আসে, সাথে কবিতাও আসে। তবে আজকাল আর সে কিছুই লিখতে পারছে না। মাথায় কোনো লাইন আসে না। লিখবে কী? হঠাৎ আবেগের বশে কবিতা আসে। তারপর সে সব মন থেকে ছিড়ে ফেলে দেয়। তার সস্তা আবেগের কবিতা পড়ে সমাজের কী লাভ হবে?
আবার ভাবে, ভাবতে থাকে। বিদ্রোহী কিছু লেখা যায়, কিন্তু তাতে আজকাল কোনো লাভ হবে না। যেমন আছে তেমনই চলবে এই সমাজ।
কবি ভাবতে থাকে। অনেকদিন সে কিছুই লেখে না। তার যে গুটি কয়েক বন্ধু পাঠক রয়েছে। তাদের মজলিসে দেখা হলেই নতুন কবিতার খোঁজ নেয়। সে তো কিছুই লিখতে পারছে না। তাই তাকে সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে হয়।
এ তো মহা মুশকিল। খাতা কলম নিয়ে বসে আছে। কিছুই লেখা হচ্ছে না। আনমনে বসে থাকে। তার শূন্য দৃষ্টি খোলা। ঘরে টিকটিকি ডেকে ওঠে। তার চিন্তায় ছেদ ঘটে। আচ্ছা একটা সত্য প্রেমের গল্প নিয়ে কিছু লিখলে কেমন হয়! অনেক তো মিথ্যা কবিতা পড়লাম। বাস্তব গল্পটা লিখলে কী হতো! হয়তো সেটা আর বাকি লেখার মতো আকর্ষণীয় হবে না। পড়বে না কেউ। আজকাল তো সবকিছুই মিথ্যার রঙ মাখিয়ে প্রকাশ করা হয়। সেই রঙে পণ্যগুলো ঝকমকে হয়ে ওঠে।

একটা ঘটনা মনে পড়ে যায় কবির। সেটা তো অনেক আগের। মনে থাকারই কথা নয়। ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু এই বাস্তব গল্পের সূত্র ধরেই মনে পড়ে গেল তার।
বয়স কত হবে! এই মাধ্যমিক পাশ করা কিশোর। তার মনে ভালোবাসা এসেছিল। নতুন প্রেম। অনেক সুখের অনুভূতি। তখনকার মেয়েটিকে মনে পড়ে। গোল চোখ। চিকন ওষ্ঠধর। তখন সে উপমা/রূপক বুঝত না। কাব্যিক জ্ঞান কিছুই নেই। সে প্রেম বর্ননাও করতে পারে না।

দরজায় টোকা পড়ল। তার মা রাতের খাবার খেতে ডাক দেয়। সে না শোনার ভান করে। কোনো সাড়া না পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে মা চলে যায়।
কবি আবার ভাবতে থাকে। সেই গল্প নিয়ে এখন লিখলে লেখাটা কেমন হতে পারে! মনের মধ্যে কিছু লাইন সাজানোর চেষ্টা করে সে।
“মহাকালের পরে জীবন এসে থমকে গেছে।
খুব মনে পড়াতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু মনের ওপর পড়লে,
সে আঘাতের যন্ত্রণা কে সইবে?”

না৷ এ তো কবিতা হচ্ছে না। সব সস্তা আবেগ। তাহলে কী তার জীবনে সত্যিকার প্রেম ছিল না! তাতে কী! কবিতার উপজীব্য কী শুধুই প্রেম, ভালোবাসা? না। আজকাল কত নতুন ইস্যু দাড়িয়েছে। দেশের অবস্থা, ব্যবস্থা নিয়ে লেখা উচিত!
কবি আবার ভাবে। কিছু লাইন মাথা আসে। তবে লিখতে সাহস করে না। দেশ ব্যবস্থা তো তার মন মতো না। তাই দেশদ্রোহীতা করে কিছু লেখা ঠিক হবে না।
পাশের কোনো বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। লাউড স্পিকারের সাউন্ড বেড়ে যাচ্ছে। গানের বাজনার সাথে তার ভাবনাও বেজে উঠে হারিয়ে গেল। মুখে বিরক্তির রেখা ফুটিয়ে ঘর থেকে বের হলো সে।
তার মা’কে জিজ্ঞেস করল, “কারও বিয়ে হচ্ছে! এতো গান বাজনা যে?”
মা বললেন, “বাবু সাহেব তো বাইরের কুনো খোঁজই রাখিস না। কাল মিতুর বি, গান বাজনা হবে না?”
“মিতু! ফরিদ চাচার মেয়েটা?”
“হ’ কালকে তো দাওয়াত আছে। তোর বাপে যাবে না, তুই নিজেই খাইয়ি আসিস।”
“আমার ইচ্ছা নাই। ওসব ভিড়, চেচামেচি ভালো লাগে না।”
“আরে তেমন অনুষ্ঠান না। শুধু অল্প কয়েকজন মিলি ঘরোয়া ভাবেই হবে। বাইরের কেউ না।”
“একটাই মেয়ে একটু আয়োজন করেই বিয়ে দিতে পারত।” বলল কবি।
তার মা একটু নিচু স্বরে বললেন, “মাথা কী গেছে তোর! মেয়ের তো বয়স পুজি নি। জানিস না?”
তাই তো। মিতু তো এবারই এসএসসি পাস করল। বয়স আর কতোই হবে। ষোলোর একটু বেশি হয়তো।
কবির পেটটা মোচড় দিল। দুপুরে ভাত খাওয়ার কথা খেয়াল ছিল না। ভাবনায় সারাদিন পেরিয়ে গেছে। এখন খিদেটা জানান দিচ্ছে।
“ভাত দাও, খেয়ে নিই।”
মা রাগ দেখিয়ে বলল, “সবার খাওয়া শেষ। হাঁড়ি থিকে বাইড়িঁ খা।”

একটা কবিতাও লেখা হলো না৷ ক্লান্ত কবি। ঘুমে চোখ বুজে আসে। বিছানায় শুয়ে পড়ে সে৷ চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করতেই সে আবিষ্কার করল ঘুম উবে গেছে। চিন্তায় পড়ে যায়৷ এতো অল্প বয়সে মিতুর বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে। তবে সে চিন্তা খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আরেকটা চিন্তা মাথা ঘুরে ফিরে বেড়ায়।
শিমুল ছেলেটার কী হবে! কবি একেবারেই বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন তা নয়। স্কুলের সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে সে প্রতিবারই উপস্থিত হয়। সেখানে কবিতা আবৃত্তি, গান, নাটক ও নৃত্যকলার প্রদর্শন তার খুব উপভোগ্য৷ সেবারই শিমুল ও মিতুকে একসাথে দেখেছিল কবি। মিতু হলুদ ও লাল মেশানো শাড়ি পরেছিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে শিমুল অনেকবার লম্বা চুলে আঙুল বুলিয়ে ঝাকি দিচ্ছে। অনেক মানুষের ভীড়ে কবি তাদের দুজনকেই দেখতে পেল। তার ভালো লাগে সে দৃশ্য। নতুন প্রেমে পড়ার উপাখ্যান। দুজনকে অনেক খুশি মনে হচ্ছে। রোদের উত্তাপের মাঝেও দুজন হাসি হাসি মুখে পাশাপাশি বসে থাকে। শিমুল সবে মাত্র কলেজে উঠল। কিন্তু ঠিকই তার জোগাড়ে মোটরগাড়ি ছিল। একসময় বান্ধবীদের আড়াল করে স্কুল প্রাঙ্গন থেকে বেরিয়ে গেল মিতু। শিমুল অনেক আগেই গাড়িতে চেপে বেরিয়ে গিয়েছিল। তবে সেই পাশাপাশি কয়েক মুহুর্তে তাদের মাঝে নিশ্চিত আনন্দময় পরিকল্পনা ঘটেছে। আজকাল ছেলে-মেয়েরা খুব সাহসী হয়। কবির মনে আশংকা জাগে৷ তারা যদি কোনো সাহসী কর্ম ঘটিয়ে ফেলে!
মঞ্চে হাস্যকর একটা নাটক চলছে। ছেলেরা হাড়ির কালি, পাটের চুল লাগিয়ে ভিন্ন সাজে সেজেছে। দর্শক হাসি ও তালি দিয়ে মাতিয়ে তুলেছে তাদের সাজসজ্জা দেখে। কবিতা আবৃত্তি করতে আসে একটা মেয়ে। কঠিন একটা কবিতা। আবৃত্তির একসময় মেয়েটি কেঁদে ফেলে। শব্দ করে কম্পিত হয় তা কন্ঠ। কবি অবাক হয়, ছোট্ট একটা মেয়ে কবিতার আবেগ অনুভব করছে৷ তবে সে কোনোদিন লেখার আবেগে পড়তে পারে না। কেন পারে না? নিজেকে প্রশ্ন করে সে।
হয়তো সে আসল কবি না। কবিত্বের ঢং ধরে বসে থাকে। তাহলে তার দ্বারা কবিতা সম্ভব না!

ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। তাই সারাদিন একটু মাথা ধরা ভাব৷ বিকেলের পর বিয়ের আয়োজন। রাতের আঁধারে সব কাজ সেরে ফেলার ব্যবস্থা। তার সেখানে তেমন কাজ নেয়। বলতে গেলে ফরিদ চাচা তাকে খুব একটা পছন্দ করেও না। আগে সে যাই করত, তার বাবার কানে সব কথা বাড়িয়ে-বানিয়ে বিষ আকারে ঢেলে দিত। এখনও মাঝে মাঝে সে কাজ অবিরাম। সেইদিনই তার কোনও এক লেখা অনলাইনে পড়ে বাবার সামনে এসে হাসাহাসি করেছে। তার পিতার তো লজ্জায় মাথা হেট। বাড়িতে তাকে নানা কথা শুনতে হয়। সে সব অবান্তর আলোচনা৷

খাবার টেবিলে বসে আছে কবি। ভাত, ডাল ও গরুর মাংস প্লেটে সাজানো। সে ভাত নেড়ে চেড়ে মাখাচ্ছে। খেতে খেতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।

একবার সে বিনা দাওয়াতে বিয়ের অনুষ্ঠানে খেতে গিয়েছিল। খেতে যাওয়া বললে তার অপমান করা হয়ে যায়। বলতে হয় বিয়ে দেখতে গেল। সেই অনুষ্ঠানে রোস্ট, পোলাও, মাছ ভাজা ও স্পেশাল মিষ্টিও ছিল। আর ছিল মায়া। মায়া তার… উম.. ভাবার বিষয়। মায়া তার কিশোর বয়সের ভালোবাসা। সেটা কেউ জানতে পারবে না। কোনোদিন না। সে খুবই কাপুরষ৷ মায়াও হয়তো জানে না। এক ক্লাসেই পড়তো তারা। সে সময় ছেলে মেয়ের মধ্যে ক্লাসমেট সম্পর্ক অথবা বন্ধুত্ব হতো না।
স্কুল পাশ করে তবুও সে অনেক সাহস দেখায়। মায়াকে একটা চিঠি লেখে। চিঠিতে তার ভালোবাসার কথা লেখা ছিল। ছিল নতুন অনুভূতির প্রকাশ। নতুন আবেগের ছোঁয়া। সেই চিঠিটার কী হলো?
তাকে কাপুরুষ বলা আর ঠিক হবে না। কারণ চিঠি ঠিকই মায়ার কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল। কীভাবে! সন্ধার অন্ধকারে জানালার ফাঁক দিয়ে৷
চিঠির উত্তর আসে না। তার কিছুদিন পরই তো তার বিয়ের খবর পেল কবি।
বরকে সে চেনে। পাশের গ্রামের শাকিল কাকু। ব্যাংকে চাকরি করে। উত্তরাধিকার সূত্রে জমিজমা আছে। শহরেও বাড়ি বানাচ্ছেন।

সেদিন লাল শাড়িতে মায়াকে সিনেমায় দেখা বউয়ের মতোই মনে হয়েছিল। প্রতি শুক্রবার বিটিবিতে সিনেমা হয়। সেখানে বউয়ের শাড়ি ধূসর ও কালো মেশানো থাকে। টেলিভিশনটাই তো সাদা কালো।
দূরে দাড়িয়ে বিয়ে দেখতে থাকে সে৷ দেখতেই থাকে। তার সামনে যেন বাংলা ছায়াছবি প্রদর্শিত হচ্ছে৷ একদম মিলে যায়৷ মায়ার লজ্জায় লাল হওয়া গাল। মাথা নিচু করে বসে থাকা। ভারি গহনার ভারেও ঘাড় নিচু হতে পারে! তবে কবুল বলার দৃশ্যটা একদম আলাদা। তার কাছে সেটা ঝাপসা লাগে। চোখটা গেল না-কি! পাশে দাড়ানো  লাল জামা পরা ছেলেটা বলল, “আরে ভাই তুমি কানছ ক্যান?”
“আর বইলেন না, খাওয়ার হাত চোখে দিয়ে ফেলছি। মাংসের ঝাল ধোয়ার পরেও যায়নি হয়তো!” চোখে পানি নিয়ে সে হাসে। অসুন্দর হাসি।
মায়া কার গাড়িতে উঠে বসে। বিদায়ের আগে সে খুব কেঁদেছে। ঝকঝকে সাদা গাড়ি। গোলাপ, রজনীগন্ধা সাথে প্লাস্টিকের ফুল দিয়েও সাজানো হয়েছে। এতো সুন্দর করে সজ্জিত গাড়ি কবি আগে দেখেনি। গাড়ি চলতে শুরু করে। পেছনে আরো কয়েকটা মাইক্রোবাস। তার দৃষ্টি প্রথমের গাড়িতে। সেটাকে ধোয়াসে রথের মতো মনে হয়৷ একসময় হারিয়ে যায়।

মিতুর মা সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। মাংসটা হয়তো কুরবানির। টাটকা মাংসের স্বাদ আলাদা হয়। তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারে না কবি। একটা অস্বস্তি কাজ করছে তার ভেতরে।
অন্ধকার হয়ে গেছে। বর‍যাত্রিও চলে আসল। খুব বেশি মানুষ না। এই গন্যমান্য জন বারো। তাদের জন্য আলাদা আপ্যায়ন।
খাওয়া শেষে আর সেখানে দাড়ালো না সে। এখানে তার কোনো কাজ নেই। তাদের উঠান পেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠতেই আওয়াজটা পেল। পুলিশের গাড়ি। থেমে তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “এটাই কী ফরিদ মিয়ার বাড়ি?”
“যে আঠারো বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে?”
কবি সম্মতি জানিয়ে উত্তর দিল।
তারা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই আরো একটা গাড়ি এসে থেমেছে। দুইজন মহিলা ও একজন পুরুষ এই বাড়িতেই প্রবেশ করলেন৷ তাদের জেলার নারীবাদী রাজনৈতিক সংস্থা থেকে এসেছেন তারা৷
কবি খুশি মনে বাসায় ফিরল।
এই রাতটাও পেরিয়ে গেল। একটাও কবিতা লেখা হয়নি। সকালের কাগজে মিতুর ছবি সহ খবর ছেপেছে। নারীবাদী রাজনৈতিক সংস্থার মহিলা দুজনও সাথে আছে।

কবির মা বকবক করছেন। “ছিঃ ছিঃ ছিঃ কী লজ্জার কথা। মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে বাপকেই জেলে যেতে হচ্ছে। কোন জন্মের শত্রু যে পুলিশরে খবর দিছে কেডা জানে!”
কবি হাসতে হাসতে ভাবে সে সময় নারীবাদী সংস্থা গুলো ছিল না। বিয়েতে পুলিশের উপস্থিতি হলে, কিছু টাকা দিলে তারাও দাওয়াত খেয়ে যাবে।

সে নিশ্চয় শহরে চলে গেছে। বছরে একবারই গ্রামে আসে। এই কুরবানির ইদেও এসেছিল। তারা এলেই খোঁজ পাওয়া যায়। তবে কবির সাথে দেখা হয় না। তার খুব জানতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা মায়া, কেমন আছো তুমি!

“স্বামী সন্তান ফ্লাট আর গাড়ি
সুখের অসুখ আজ মহামারী?”
আহারে নচিকেতা! দারুণ গান বানিয়েছেন আপনি। কিন্তু অকর্মা কবি একটা কবিতাও লিখতে পারল না।

©আজফার মুস্তাফিজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here