তখনো বর্ষা আসেনি। বৃষ্টি পড়ে মাঝেমধ্যে। গ্রীষ্মের আকাশেও মেঘের মেলায় তাকিয়ে থাকতে দারুণ লাগছে।
চারপাশ ঘিরে প্রকৃতির অপরূপ রূপ যথেষ্ট মোহাচ্ছন্ন করে প্রকৃতি প্রেমীদের। বিকেলের দিকটা যেন ছাপিয়ে যায় সব। গৌধূলী লগ্নের আকাশ, আসি আসি করা থইথই পানি। আর একটু অথবা অনেকটা দূরে কোনো মাঝির মাছ ধরার আপ্রান চেষ্টা। যেকোনো চিত্রগ্রাহকের জন্যই কাঙ্ক্ষিত এক দৃশ্য।
ফতেপুরে অবশ্য তেমন কেউ নেই, সময়টা এখন হলেও কিছুটা সম্ভাবনা ছিল। বিশ বছর আগে ওমন কিছু প্রত্যাশাও অনুচিত। হারুন অর রশিদের অবশ্য ওসব দেখার সময় নেই। আকাশ, মাটি, পানি যেদিকেই তাকাচ্ছেন, কিছুই ভালো লাগছে না তার।
স্ত্রীর প্রসব বেদনা ওঠেছে। তিনি হন্যে হয়ে ঘুরছেন এদিক-ওদিক। কখন বৃষ্টি চলে আসে, সে চিন্তাও ঘিরে ধরেছে। বিল ঘেঁষে বাড়ি তার, অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছেন, তবুও ঠিক করতে পারছেন না ঘরের চালটা।
এতদিন তাও কথা ছিল, দুই রুমের ঘরে আরেক রুমে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গেছে। ওখানে খাট নেই, দুটো চেয়ার আর একটা টেবিল। বহু কষ্টে কিনেছেন।
যে রুমটায় রেখে এসেছেন গর্ভবতী স্ত্রী সুফিয়া বেগমকে, সেখানের ঠিক খাটটার উপরেই চালের ফুটো। বৃষ্টি পড়া শুরু হলে আর রক্ষা নেই, স্ত্রী না পারবেন ওঠে যেতে, না পারবেন শুয়ে থাকতে।
আপাতত ওসব চিন্তা একপাশে সরিয়ে রেখে হারুন দৌড়াচ্ছেন দাই মার খুঁজে। সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে তিনিই সবচেয়ে জরুরি এখন।
***
দাই মাকে নিয়ে যখন ফিরছেন হারুন, তখন আকাশের মেঘের গভীরত্বে অন্ধকার হয়ে গেছে সব। সদ্য আসা বিকেলকেও মনে হচ্ছে গভীর রাত। বৃষ্টিটা চলে আসতে পারে যেকোনো মুহূর্তে, এমনই ভাব চারদিকে।
হারুনের বাড়ির সামনের অস্থির পাঁয়চারি তখনো থামেনি। হঠাৎ তার গায়ে এসে পড়লো এক ফুটো পানি, বৃষ্টির অবশ্যই। সঙ্গে সঙ্গে একটা চিৎকারও শুনতে পেলেন হারুন, এক নবজাতক শিশুর।
পুরো দুনিয়াটা যেন রঙিন মনে হলো হারুনের, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। আনমনে হেসেও ফেলেছেন বেশ অনেকটা সময়। ভেতর থেকে বেরিয়ে দাই মা খবর দিয়ে গেলেন, একটা ছেলের, আরেকবার বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো হারুনের।
আকাশের মেঘ সরে গেছে তখন। পশ্চিম আকাশে লাল আভা দেখা দিয়েছে। আকাশটা ততক্ষণে দেখে ফেলেছেন তিনি। এবার ক্যালেন্ডারটা গিয়ে দেখে নিলেন। ২৪ অক্টোবর ২০০০ সাল। তারিখটা মনে রাখার দরকার, ছেলের নামটাও ঠিক করে ফেলার। বেশিক্ষণ ভাবতেও হলো না, ‘সাইমুন আহমেদ সায়েম’ নাম ঠিক করে ফেললেন।
****
সময় গড়ায়, বড় হয় সায়েম। হাঁটি হাঁটি পা পার দুষ্টুমি থেকে একটু একটু মুখে আটকে যাওয়া কথা। প্রথম ‘আব্বা’, ‘আম্মা’ ডাক। হারুনের টানাটানির সংসারের পরিবর্তন হয় না ততদিনেও। তবে তার জীবনের ঘোর অমানিষা কাটে কিছুটা। বর্ষায় মাছ, মৌসুমে ধান আর দিনমজুরের কাছে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটেনি, তবুও তিনজনের ছোট্ট সংসারে সুখের কমতি থাকে না একটুও।
তবে ‘গরীবের কপালে সুখ বেশি দিন সহ্য হয় না’ বলে যে প্রচলিত কথা। হারুনের টের পাওয়ার সময়টা চলে এলো। একটা কথা বলাই হয়নি। ক্রিকেট বেশ পচ্ছন্দ হারুনের। খেলা দেখেন খুব, আসলে শুনেছেন এতদিন।
এখন একটু আধটু দেখার সুযোগ পান।
সায়েম যে বছর জন্মালো, সে বছরের শেষদিকে বিদ্যুৎ এসেছে ফতেপুরে। তখনো টিভি নেই। হারুন খেলা দেখেন তারও আগে থেকে। বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জয়ের সময় থেকে। তখনো বিদ্যুৎ নেই আশেপাশে। রেডিও ছিল একটা, তাও পাশের গ্রামে। সেখানেই আকরাম খানদের বীরত্বগাঁথা শুনেছেন, সেই থেকে প্রেমে পড়েছেন ক্রিকেটেরও। সেদিনের উৎসব এখনো দাগ কেটে আছে তার মনে। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল আর মুখে মুখে লেগে থাকা রঙ; ভুলবেনই বা কীভাবে!
***
২০০৫ সালের জানুয়ারির ১০ তারিখ। ছেলেকে নিয়ে খেলা দেখতে যাচ্ছেন হারুস। বছর খানেক আগে একটা টিভি এসেছে খন্দকার বাড়িতে, সেটাই ভরসা তখন। যেতে যেতে প্রশ্নের বানে বিদ্ধ হতে হচ্ছে হারুনকে, তবে তাতে একটুও বিরক্ত লাগছে না তার।
‘আব্বা, আমরা কই যাই?’
‘খেলা দেখতে বাবা।’
‘কে খেলে আব্বা? আমরা কেন দেখবো?’
‘বাংলাদেশের খেলা বাবা। আমরা দেখবো কারণ তুমি বড় হয়ে খেলবা।’
‘কেন খেলবো বাবা?’
‘খেলবা আমাদের পতাকার লাইগা। তুমি খুব ভালো খেলবা। দেশকে জিতাবা। দেশের নাম সারা দুইন্নাইতে ছড়াইয়া দিবা।’
শেষের কথাটা নেহায়তই বলার জন্য বলেছেন হারুন। তিনি জানেন তার একটা বল কিনে দেয়ার সামর্থ্যও নেই ঠিকঠাক। ভিটেটা ছাড়া নেই জায়গা-জমিও। তবুও বলার সময় চোখটা ছলছল করছে হারুনের। ছেলের জবাবে সেটা গড়িয়ে পড়েছে চোখ বেয়ে, বেড়েছে কষ্টটাও।
সায়েম বললো, ‘বাবা আমি দেশের জন্য খেলবো। তুমি আমারে ব্যাট কিনে দিবা তো? আমি ক্রিকেট খেলতে চাই বাবা।’
হারুন জবাব দেন না। ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন কেবল। বাবার উত্তর না পেয়ে সায়েম যেন এই বয়সেই বুঝে ফেলেন সব-
‘তুমি কাইন্দো না আব্বা। আমার ব্যাট লাগবো না। আমি খেলমু না। তুমি কাইন্দো না আব্বা, ও আব্বা, তুমি কাইন্দো না।’
একটু মুচকি হাসি দিয়ে চোখের পানিটা মুছে নিলেন হারুন। ফের শুরু হলো বাবা ও ছেলের পথচলা। একটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাওয়ার। যে ম্যাচে ঘটে গেল ঐতিহাসিক একটা ঘটনা।
টেস্টের পঞ্চম দিন। খেলা চলছে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। জিম্বাবুয়ের নয় উইকেট নাই হয়ে গেছে। আর একজন ব্যাটসম্যান আউট হলেই ঘটে যাবে ঘটনাটা। চোখগুলো বড় বড় করে তাকিয়ে আছে হারুন।
সায়েম তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তবে কিছু যে একটা হবে সেটা টের পাচ্ছে। টিভিটা সামনেই আছে, তবুও তার নজর বেশি চারপাশে। ঘুরে ঘুরে দেখছে সবাইকে। তারা সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছেন টিভির দিকে।
সায়েম বাবাকে বলছে-
‘আব্বা, এহন কী অইবো?’
‘বাংলাদেশ জিততা যাইবো।’
‘জিতলে কী হইবো আব্বা?’
এবার যেন একটু বিরক্তই হলেন হারুন। একবার ছেলের দিকে তাকালেন চোখ বড় করে। এরপর আর কিছু বললেন না। যেন চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন, ‘চুপ থাক’।
জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় ইনিংসের ৬৪তম ওভারটা করলেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। দিলেন কেবল ১ রান। পরের ওভারে এনামুল হক জুনিয়র এলেন। প্রথম বলটা ডট করলেন। দ্বিতীয় বলে এমপুফু ক্যাচ তুলে দিলেন মোহাম্মদ আশরাফুলের হাতে। যেন খুশির আস্ত এক পৃথিবীই তিনি তুলে দিলেন বাংলাদেশের হাতে।
হারুন হয়তো তখনো মাহাত্ম্যটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেননি। তবুও বাঁধনহারা আনন্দে মাততে ভুললেন না ছেলেকে সঙ্গী করে। সঙ্গে সংকল্পটা দৃঢ় করালেন ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর, জাতীয় দলে খেলানোর। যেভাবেই হোক তা। বাবা-ছেলের খুঁনসুটির সমাপ্তি হতে হতে সন্ধ্যা নেমে এলো।
আকাশ থেকে নেমে এলো ঝিঁরিঝিঁরি বৃষ্টি। আধভেজা হয়ে ফিরতে ফিরতে ছেলেকে ভালো খাবারের আশ্বাস দিলো হারুন।
‘জানোস সায়েম, কালকে তালুকদার বাড়ির পুকুর মাছ ধইরা দিলাম। তারা একটা বড় মাছ দিছে। তোর মারে কইয়া আইছি যাতে ভাইজা রাখে। বাপ-বেটা মিইলা আইজকা জম্পেশ খানা হইবো। বাংলাদেশ প্রথম নাকি টেস্ট জিতছে, একটু তো আনন্দ করোন লাগবো।’
সায়েম বললো,’আব্বা, আমি কিন্ত মাথাটা খামু।’
বাড়িতে আসতেই বকা শুরু করলেন সুফিয়া, ‘বাপ-পোলা মিল্লা সারাদিন খেলা দেইখা এহন আইছে। অথচ ঘরে একটা জিনিস-পত্র নাই। মাছ ভাজার কথা বইলা গেছে, অথচ তেলই নাই। আরেক বাড়ির থেইকা ধার কইরা আনলাম। কানে তো কোনো কথা যায় না।’
শুনেও যেন না শোনার ভান ধরলেন হারুন। তিনি জানেন, তেল যেহেতু এসেছে ঘরে, রান্নাও হয়েছে নিশ্চিত।
‘সায়েম, খুব খুদা লাগছেরে। ঘুমও পাইতাছে, খাইয়া ঘুমাইয়া যামু আমি তাড়াতাড়ি।’
সুফিয়া বললো, ‘ হ পারে তো খালি খাওনডাই।খাওন বাড়তাছি সায়েম, তোর নবাব আব্বারে ক খাইতে আইতে।’
সায়েমদের দুই রুমের ঘরটা আছে তখনো। ঘরটা ঠিক করতে মাঠের একটু যে জায়গা আছে, বিক্রি করে দিবেন ভেবেছিলেন হারুন, শেষ পর্যন্ত আর করা হয়নি।
একটা পাটি বিছিয়েছেন সুফিয়া। দুই পাশে বসে আছেন বাবা-ছেলে। একটা পিঁড়ায় বসে সুফিয়া। ভাত বেড়ে দিচ্ছেন তিনি। অন্য সবার ঘরে বিদ্যুৎ থাকলেও নেই হারুনের ঘরে। টাকার অভাবে আনতে পারেননি। তার ঘরে চেরাগ জ্বলছে। সে আলোতই তিনজন একে-অপরের মুখ দেখছেন অস্পষ্টভাবে।
‘সায়েমের বাপ, পোলাটা বড় হইছে। এমনে তো আর চলুন যাইতো না। কিছু একটা ব্যবস্থা করা দরকার।’
সুফিয়া যতটা গুরুত্ব সহকারে বললেন কথাটা। হারুন তার জবাব দিলেন যেন ততটাই অবহেলায়-
‘কীরে সায়েম, কথা সত্যি নাকি? তুই কি আসলেই বড় হইয়া গেছোত? দেখি, কতটুকু বড় হইলি…’
এক হাতে সায়েমকে শুড়শুড়ি দিচ্ছেন হারুন। বাপ-ছেলে দুজনই হাসছেন অট্টো হাসি। সুফিয়া তাতে সামিল হবেন করে করেও হলেন না। বরং একটু বিরক্তই দেখালেন।
মুখটা মলীন করেই ছেলের পাতে মাছের মাথাটা তুলে দিলেন সুফিয়া। মাস খানেক পর ঘরে আমিষ রান্না হয়েছে। মাথাটা ছেলেরই খাওয়া দরকার। তার বড় হতে হবে। এই সংসারের অবস্থা ফেরাতে কিছু একটা করতে হবে তাকেই।
মাছটা সায়েমের পাতে তুলে দিয়েই মাথায় হাত দিলেন সুফিয়া। হঠাৎ করেই মাথা ধরার রোগটা তার অনেকদিনের। আজ যেন একটু বেশিই মাথা ব্যথা করছে। মাথায় হাত দিয়ে মুহূর্তেই জ্ঞান হারালেন সুফিয়া।
হারুন অস্থির গলায় বলতে শুরু করলো, ‘সুফিয়া! কী হইছে? মাথা কী বেশি ব্যথা করতাছে? ও সুফিয়া! কী হইছে?’
কথাটা শেষ করেই হারুন দৌড় দিলেন ভ্যানের খোঁজে। হাসপাতালে নেয়া দরকার তাকে। পকেটে একটাও টাকা নেই। কিছু টাকাও জোগাড় করা দরকার।
‘মোতালেব ভাই, বাড়িতে আছেন?’
‘কে? ওহ আচ্ছা। হারুন, তুই। রাইতের বেলা হঠাৎ?’
‘ভাই আমার কিছু টাকা দরকার, সুফিয়া হঠাৎ মাথা ঘুইরা পইড়া গেছে। তারে হাসপাতালে নেওন লাগবো।’
‘হারুন, তুই আগের টাকাই দেস নাই। তোরে কোনো টাকা দেওন যাইতো না।’
‘দেন না ভাই, আমি কাজ কইরা শোধ কইরা দিমু। বউটারে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেওন দরকার।’
‘না দেওন যাইতো না, তুই এখন যা।’
হতাশ মুখে একটা ভ্যান নিয়ে বাড়িতে ফিরলেন হারুন। টাকার জোগাড় হয়নি। তবুও হাসপাতালে নেয়া দরকার। সেখানে গেলে একটা ব্যবস্থা করা যাবে।
তবে তার আর প্রয়োজন হলো না। উপজেলার সরকারি হাসপাতালে ‘তাড়াতাড়ি’ নিতে পারলেন না হারুন। ডাক্তার জানালেন, পথেই মারা গেছেন সুফিয়া।
***
শুরু হলো এক অসহায় আর দরিদ্র বাবা আর ব্যর্থ স্বামীর সংগ্রামের গল্প। ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর সংকল্পটা আরও দৃঢ় করে ফেলেছেন ততদিনে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমেও সে খরচ মেটাতে পারছেন না যদিও। তবুও দমছেন না। স্বর্বস্বটা উজার করে দেবেন বলে সিদ্ধান্তটা চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
ক্রিকেট ধ্যান আর জ্ঞান দুটোই হয়ে গেছে সায়েমেরও। মাঠের জায়গাটুকু বিক্রি করে দিয়েছেন বাবা। ভর্তি করিয়েছেন শহরের এক ক্রিকেট একাডেমিতে। আসা-যাওয়ার খরচ মেটাতে বাবার নাভিশ্বাসও সে দেখছে সামনে থেকে। স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বটা এসে পড়ে গেছে তার কাঁধে, বুঝতে শিখেছে সেটাও।
-‘আব্বা, দেইখো আমাগো এই কষ্ট আর থাকবো না। আমি ক্রিকেট খেইলা অনেক টাকা কামামু। আমরা এরপর খুবই সুখে থাকমু।’
কথাটা শুনে যেন গা টা জ্বালাপোড়া শুরু হলো হারুনের
‘আর কোনো সময় এমন কথা কইবা না সায়েম। আমি তোমারে টাকার জন্য এত কষ্ট কইরা খেলা শিখাইতাছি না। তুমি দেশের জন্য খেলবা, আমাগো পতাকা পৌঁছায় দিবা পুরো দুইন্নাইতে।’
বুকটা ভরে উঠে সায়েমের। ক্রিকেটটা যে তার খেলতেই হবে। সব শেষ করে দেয়া এই বাবার জন্য, দেশের জন্য।
ধীরে ধীরে সায়েম বড় হয়। ক্রিকেটে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ব্যাট হোক কিংবা বল, সায়েম হয়ে ওঠে অদম্য। জেলা ক্রিকেটের এক কর্মকর্তা দেখা করতে চান হারুনের সঙ্গে।
‘হারুন সাহেব, সায়েম তো খুবই ভালো ক্রিকেট খেলে। সে নিশ্চিত জাতীয় দলে চান্স পেয়ে যাবে।’
‘হ, সাহেব। আমারও তো এটাই স্বপ্ন। ও দেশের লাইগা খেলবো।’
‘তো, হারুন সাহেব। দেশের জন্য তো এমনে এমনে খেলা যাবে না। আগে লীগে খেলতে হবে।’
‘কী জানি সাহেব, আমি তো এতকিছু বুঝি না। আমার পোলা জাতীয় দলে খেলবো এইটাই আমার স্বপ্ন।’
‘শুনেন, আপনারে একটা বাস্তব কথা বলি। এমনে যতই ভালো খেলুক না কেন। সায়েম কোনোদিন লীগে খেলতে পারবো না। আর লীগে না খেললে জাতীয় দলের তো প্রশ্নই আসে না। আপনি যদি আমারে কিছু টাকা দেন, আমি তাহলে লীগে তার খেলার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’
হারুনের পরিশ্রমের ছাপওয়ালা মুখটা হয়ে গেল আরও মলীন, ‘কত টাকা লাগবে সাহেব?’
‘এই ধরেন লাখ খানেক হলেই হবে।’
‘কী কন ভাই! এই একাডেমিতে ভর্তি করাইতেই আমি আমার যেটুকু জায়গা আছিল বিক্রি কইরা দিছি। এখন তো ভিটেটা ছাড়া কিচ্ছু নাই।’
‘তাইলে আর কী করার সায়েমের আর জাতীয় দলে খেলা হবে না।’
‘না, না সাহেব। আমি ভিটেটা বিক্রি কইরা দিয়া আপনার টাকা দিবো। কোনো সমস্যা নাই।’
‘আচ্ছা, আপনি যত দ্রুত টাকা দিবেন। সায়েম তত দ্রুত দেশের জন্য খেলতে পারবে। বুঝছেন তো?’
‘কিন্তু ভাই, একটা অনুরোধ। এই কথা সায়েমরে বইলেন না। ও শুনলে খুব রাগ করবো।’
***
ভিটেটা সত্যিই বিক্রি করে দিলেন হারুন। সে বছরই প্রিমিয়ার লীগের একটা দলে সুযোগ হলো তার ছেলের। শুরুতে একাদশে সুযোগ না পেলেও পরে পেয়ে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করেছে সায়েম। ৫ ম্যাচের তিনটিতেই হাঁকিয়েছে সেঞ্চুরি। উইকেটও পেয়েছে ১৫টি।
সামনেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ। সায়েম জানে তার সুযোগ আছে। লীগে খেলে কিছু টাকা পেয়েছে সায়েম, বাবাকে এখন আর কাজ করতে দেয় না। ঘরটা ঠিক করেছে, বিদ্যুৎের সঙ্গে ততদিনে একটা রঙিন টিভিও এসেছে ঘরে। লীগ খেলে পাওয়া টাকার বেশির ভাগই শেষ হয়ে গেছে এসবে। বিক্রি করে ভিটেটা এখনো ফেরত আনা হয়নি, পরের মৌসুমে খেলতে পারলেই আনা যাবে।
***
আজ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের স্কোয়াড ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচক মনিরুল ইসলাম। টিভির সামনে বাবাকে নিয়ে বসে আছে সায়েম। দেশের হয়ে খেলার স্বপ্নটা পূরণ হওয়ার পালা এসেছে। সারা দেশে তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
একে একে নাম পড়তে শুরু করলেন মনিরুল। এক, দুই করে পনেরো। সায়েমের নাম আর পড়া হলো না। প্রধান নির্বাচক বললেন, ‘তার আরেকটু সময় দরকার।’
মন মানলো না সায়েমের। দৌড়ে চলে গেলেন ফতেপুর কলেজ মাঠে। একটার পর একটা বল ছুঁড়ছেন তিনি। সামনে কেবলই তিন কাঠি, কোনো ব্যাটসম্যান নেই, নেই কেউও।
***
বল করতে করতেই হঠাৎ বমি শুরু হলো সায়েমের। কাশতে কাশতে একটা সময় যা পরিণত হলো রক্ত বমিতে। খবর পেয়ে দৌড়ে আসলেন হারুন। ছেলেকে নিয়ে অস্থির হয়ে গেলেন তিনি। নিয়ে গেলেন উপজেলা হাসপাতালে।
সেখান থেকে ঢাকায়। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। শুরু হলো হারুনের আরেক পরীক্ষা। প্রায় মাস ছয়েক পর জানা গেল, ক্যান্সারে আক্রান্ত সায়েম।
ততদিনে দেশের ক্রিকেট থেকে বিস্মৃত হয়ে গেছেন সায়েম। লীগ খেলে পাওয়া একটা টাকাও আর নেই তার। বিক্রি করার মতো কিছু নেই হারুনেরও। বিষণ্নতা ঘিরে ধরেছে চারপাশ, হুমড়ি খেয়ে পড়েছে অসহায়ত্ব।
শত লড়াই, সংগ্রাম আর কষ্টের বিনিময়ে যে সায়েমকে বড় করেছিলেন হারুন। মা মারা যাওয়ার পর নিজে একবেলা খেয়ে যে ছেলেকে দুবেলা খাওয়ার দিয়ে বড় করেছিলেন। যে ছেলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার প্রতীক্ষায় একটা একটা করে মুহূর্ত গুনছিলেন বাবা, তার লাশ তখন কাঁধে তুলে নিয়েছেন হারুন।
খাটিয়ায় করা লাশের পাশে শ খানেক মানুষ আছেন, কিন্তু তা যেন চোখে দেখছিলেন না হারুন। তার পা টা আদৌ চলছিল কিনা হচ্ছিলো না সে অনুভবও। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারি বোঝা, তার ওজনটা যেন হারুনের জন্য হয়ে গিয়েছিল আরও বেশি। তবুও লাশটা দাফন করেছেন কোনোভাবে। সমাধিটা আসলে হারুন করেছেন নিজের স্বপ্নের, হয়তো নিজ মন কিংবা শরীরেরও।
***
সায়েমকে দাফন করার পর আর কখনো হারুনকে দেখা যায়নি ফতেপুর গ্রামে। তিনি হারিয়ে গেছেন দূর অজানায়। কোনো কোনো বাবা ছেলেকে জয়ী করে হারিয়ে যান পেছন থেকে, ছেলেরা ভুলে যায়। সায়েমের মতো কোনো কোনো সন্তানের পরাজয়ে হেরে যান হারুনের মতো বাবারাও। শত দুঃখ আর কষ্টের ফলটা পান না তারা। পথে পথে ঘুরেন পাগল হয়ে। আচ্ছা, হারিয়ে যেতেই কি বাবাদের জন্ম?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here