১৮ সালের শেষের দিকের কথা। শীত একদম ঝেঁকে বসেছে। হাঁড় কাপানো শীত। সারা বছরের মধ্যে এই সময়টা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। প্রতিবারই এই সময়ে আমি লঞ্চের পিঠে সওয়ার হয়ে বসি। আম্মা ফোন করেছে। আর দেরী করবার জোঁ নেই। নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম নদী পথে!

গভীর রাত! আমি শুয়ে আছি ঘরের দক্ষিণ দিকে দোতলায় আমার রুমটায়। জানালা দুটো খোলা। পর্দা কিছুটা উপরে তুলে দিয়েছি। এটা আমার অভ্যাস। ঘুম ভাঙ্গলেও চোখ মেলতেই যেন সবুজের সমারোহ আমার চোখ দুটোকে একদন্ড শান্তি দিয়ে যায়। তাই এই অদ্ভুতুড়ে ইচ্ছে আমার। শীত, বর্ষা, গ্রীষ্ম – কোনো সময়েই এর হেরফের হয় না।

রাত তখন কত হবে খেয়াল নেই। চারদিকে অন্ধকার, সুনসান নীরবতা। আমি অনুভব করলাম শীতল বাতাসের হিম হিম আভা। ভালোই লাগছে। কম্বলটা মাথা থেকে টেনে বুঁক অব্দি নামিয়ে দিলাম। দু’চোখে তখনও রাজ্যের ঘুম। হঠাৎ আমি টের পেলাম একটা হাত আমার মাথা থেকে মুখমন্ডল হয়ে সারা শরীরে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। ঘুম ভেঙ্গে গেলো!

আমার আবার ইন্দ্রীয়শক্তি খুব প্রবল। সামান্য একটু শব্দ কিংবা কোনো কিছুর স্পর্শেই আমি সজাগ হয়ে যাই, ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম ভাঙ্গার পরও আমি চোখ মেললাম না। তখনো বুঝতে পারিনি কার স্পর্শ। স্বপ্ন নাকি বাস্তব, এটুকু বুঝতে সময় নিলাম। টের পেলাম যে হাতটা কিছুটা শক্ত!

হঠাৎ কানে এসে লাগলো শব্দমালার মধুর ঝংকার, “বাবা! ও বাবা! বিজয় বাবা!” আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না। আব্বা! আমার আব্বা!! আমার সর্বাঙ্গে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়া শক্ত হাতের মানুষটা আমার আব্বা। এই হাতের লোহার মতো শক্ত চামড়াগুলো আমার চেনা, খুব চেনা। আমাদেরকে মানুষের মতো মানুষ করার পেছনের স্বাক্ষী এই হাত!

আব্বা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। টের পেলাম মানুষটার চোখে জল। শীতের হিম কাটিয়ে সে জলের গরম স্পর্শে আমার ভিতরটা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে লাগলো। এই মানুষটাকে আমি কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। লম্বাটে গড়নের শক্তপোক্ত মানুষটার রাগী চেহারা ই যে সবার চিরপরিচিত। অথচ এই মানুষটার বুঁকে এত স্নেহ, এত মায়া, কে জানতো? স্নেহ সমুদ্রও তাহলে উত্তাল হয়ে ওঠে, হুটহাট গভীর রাত্রে।

বাড়ির সামনের গাছপালা ঘেরা রাস্তা। তার ছায়ায় বসে আছি আমি, আব্বা, চাচারা সহ আরো অনেকে। কথার মাঝে হুট করে হাতের ক্র্যাচটা ছুঁড়ে ফেলে আব্বা দাঁড়িয়ে গেলেন। পরক্ষণেই হাতটা বাড়িয়ে দিলেন “বাবা! কাঁধে উঠবি না? আয়..”। আমি কিছু বলতে পারছি না। দু’চোখে আমার জল আর জল, সাত সাগরের মস্ত জল। মাটিতে কতকগুলো গর্ত। ঝাঁপসা চোখে সেগুলো গুণে চলছি আমি, “১..২..৩..৪..”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here