– ও বাজান! মোর লাইগা শাট লইয়াও..
– আইচ্ছা! বাপধন লইয়ামু..
– ঐ যে ছবি দেয়া শাটখান। ঐডা কিন্যা আনবা..
– অইলো বাজান। তুমি ঘুমাও..

রাত পোহালেই ঈদের খুশিতে মেতে উঠবে পুরো দেশ। যদিও দেশের এই পরিস্থিতিতে খুশির চাইতে বেদনার বিষাদটাই বেশি। তবুও পবিত্র মাহে রমজান শেষে যে যার মতো একটুখানি আনন্দের পরশ পাবার চেষ্টায়। কিন্তু সেই খুশিটাও আজ যেন নেই রহিম শেখের মনে। সোডিয়াম লাইটের আবছা আলোর সাথে যেন মিলিয়ে গেছে ভেঙ্গে যাওয়া শরীরের ঐ অম্লান হাসিটুকুও!

একমাত্র ছেলের সাথে মোবাইলে কথা বলে পুরান ঢাকার হরিদাস লেনে রিকশা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে রহিম শেখ। ছেলেটার বয়স সাড়ে ৫ বছর। এক ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে ফড়িয়াপট্টির গিঞ্জি গলির ছোট্ট এক বাসায় ভাড়া থাকেন তিনি। সে বাসায় আলো প্রবেশের বালাই নাই। মাথার উপরে ৪০ ওয়াটের হলদে বাল্বের আলোয় কেটে যায় সময়। দিন রাতের পার্থক্য বুঝার সাধ্যি নেই..

বছরের অন্য সময় মোটামুটি রোজগার করেন রহিম। তাতে বাসা ভাড়া দিয়ে তিন সদস্যের পরিবার নিয়ে কোনোমতে কেটে যায় তার। কিন্তু এবার করোনা নামক এক মহামারির প্রাদুর্ভাবে ২ মাস যাবত সেভাবে ঘুরছে না রিক্সার প্যাডেল, আসছে না দুটো পয়সা, হাঁড়িতে ফুটছে না দুটো চাল। সকালে চুলো জ্বললে বিকেলে দুটো মুড়িতে সামাল দিতে হয় পেট নামক রাক্ষসের চাহিদা।

আজ সকাল থেকে এ পর্যন্ত তেমন খ্যাপ জুটেনি ভাগ্যে। জুটবে কি করে? সরকারের ঘোষনা পেয়ে সবাই প্রাইভেট কারে করে বাড়ির পথ ধরেছে। বাস বন্ধ, লঞ্চ বন্ধ,বন্ধ রেলস্টেশন। সদরঘাট, কমলাপুর কিংবা সায়েদাবাদের মতো জায়গায় দুটো খ্যাপ দিয়ে কয়েকটা পয়সা বেশি কামাবেন, সে পথটাও পুরোপুরি বন্ধ। সবার গন্তব্য মাওয়া কিংবা আরিচা ফেরিঘাট, বাহন প্রাইভেটকার।

পাশ দিয়ে সাঁই করে চলে যাওয়া সিএনজি কিংবা প্রাইভেট কার গুলোর দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে রহিম শেখ। রাত কত হবে? আরো কয়েকটা খ্যাপের আশায় রাতে সে বাড়ীতে ফেরেনি, ছেলেটাকে শার্ট কিনে দিতে হবে। আগামীকালের জন্য একটু ভালো খাবারও যোগান দিতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে প্যাডেলে পা চালায় সে। হরিদাস লেন থেকে বেরিয়ে পড়ে মেইন রোডে…

আরো গোটা দশেক খ্যাপ শেষ করে রহিম, দুটো ভালো খাবারের পয়সা হয়ে গেছে। ঘুম জড়িয়ে আসে তার দু’চোখে কিন্তু ছেলের আবদার ভুলে না। তার মনে পড়ে ছেলের পছন্দ করা সেই শার্টের দোকানের কথা। সেদিকে রিকশা ঘুরিয়ে প্যাডেলে পা লাগায় সে। তার চোখে ভাসতে থাকে শার্ট পেয়ে আনন্দে তাকে জড়িয়ে হাসতে থাকা ছেলের সেই নিষ্পাপ হাসি। আরো জোরে পা চালায় রহিম…

– ঐ রিক্সা থামা!
– আফনেরা কেডা ভাইজান?
– দুটো সিগারেট কেনার টাকা দে..
– পোলার লাগি শার্ট কিনমু। পথ ছাড়েন..
– শালার সাহস কত! ঐ ওরে ধর তো..

রিক্সাটা নিয়ে কোনোমতে ফড়িয়াপট্টিতে ডুকে রহিম। তার পা চলে না, অসাড় বোধ হচ্ছে। কেউ কি পাথর বেঁধে দিয়েছে? ঠিক বুঝে ওঠে না রহিম। তার বুঁকের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সাইক্লোনের ন্যায় ঝড়। সেই ঝড়ে রহিমের সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ছেলেকে শার্ট কিনে দেবার আশা, দুটো ভালো খাবারের আশা, এই শহরে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার আশা; সব। ঘরের দরজায় পা রাখে সে, ছেলেটা জেগে আছে!

শার্টের আশায় ছেলেটা ঘুমোয়নি। রহিমের বুঁকের বামপাশটায় চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হয়, খুব সুক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা। এ ব্যথায় উৎস সে জানে না। ভীষণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে ইচ্ছে হয় তার, “গরিবের পেটে এ কেমন লাথি খোদা?”। ৪০ ওয়াটের বাল্বটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে সে। দু’চোখে তার মস্ত জল। হঠাৎ রহিম টের পেলো মায়াভরা কন্ঠের আকুল আবেদনঃ

“বাজান! মোর লাইগা শাট লইয়াও..ঐ যে ছবি দেয়া শাটখান! ঐডা কিন্যা আনবা…”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here