স্বপ্ন

লামিয়া হান্নান স্নেহা

 

রাহেলা বেগম তার বই খাতা নিয়ে খুব মনোযোগ সহকারে কি যেন লিখছেন। তবে এই দৃশ্যটি নতুন কিছু নয় এই বাড়িতে। বলা যেতে পারে, প্রায় প্রতি রাতেই রাহেলা বেগমের বই-পুস্তক নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। রিসার্চে মগ্ন হয়ে থাকে তার মন ও প্রাণ। ব্যস্তভড়া দিন  কাটিয়ে, রাতের খানিক সময় রিসার্চেই ব্যয় করেন তিনি। রিসার্চ করা তার খুব আনন্দের পেশা। যেকোনো কিছুতে কোনো ধরনের গড়বড় দেখলেই যেন এক উত্তেজনায় তার মন ভরে যায়। জীবনে বিজ্ঞানী হয়ে উঠার এক বিশেষ স্বপ্ন ছিল তার। তবে ভাগ্যের লেখন কে জানে? সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। চাপা পড়ে গেল নিজের স্বপ্নের জগতে। জীবনে এক নতুন পরিচয়  পেলেও রিসার্চ থেকে দূরে থাকেননি এক মুহূর্তও। এখনো যেন তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রিসার্চ। প্রতিদিন রাত ছয়টায় বাড়ি  ফিরে, কিছুটা বিশ্রাম নিয়েই  শুরু করে তার শখের পেশাটি। রিসার্চের এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক ধারণা অর্জন করে তিনি কিছু বইও ছাপিয়েছেন। বইগুলো পেয়েছে তার সঠিক মর্যাদা। অনেকের কাছে তাই সে আজ লেখক নামেও পরিচিত।

রাহেলা বেগম মন দিয়ে একটি বই পড়ছিলেন তার চেয়ারে বসে। হঠাৎ  ফোনের রিংটোন বেজে উঠল উচ্চস্বরে। বই হতে মাথা সরিয়ে টেবিলে  রাখা ফোনের দিকে এক বিরক্তিকর ভাব নিয়ে তাকালেন তিনি। তখনই পূন:স্মরণ করলেন সে আজ ফোনটি বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন, তাই পছন্দের সময়টি নিমিষেই বিরক্তি ভরা মনোভাব গড়ে তুলল। অনিচ্ছা থাকা সত্বেও ফোনটি নিয়ে কানে ধরলেন তিনি।

 

তিনি হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে কন্ঠ এল; ” ম্যাডাম, আপনি আজ কোথায় ছিলেন? আমি আপনার ক্লিনিকে সামনে প্রায় দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

 

রাহেলা বেগম তার কন্ঠস্বর শুনে বুঝতে পেলেন,এটি হলো রাফি। বেশ কিছুদিন ধরেই থেকে ছেলেটি তাকে প্রায়ই ফোন করছে। রাফি তাকে কিছু জরুরী কথা বলতে চায়, তবে তা ব্যক্তিগতভাবে। ব্যক্তিগতভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করায় রাহেলা বেগম ফোনে জিজ্ঞাসা করলেও রাফি তাতে  একমত নয়।

 

কিছুটা বিরক্ত হলেও রাহেলা স্বাভাবিকভাবে বলেন; ” তোমার কি এমন সমস্যা যে, তুমি ফোনে বলতে পারবে না, ক্লিনিকেও পারবেনা? আমি তো কিছুই  বুঝতে পারছিনা।”

 

রাফি নিচুস্বরে ধীরে ধীরে বলল;”ম্যাডাম দয়া করে রাগ করবেন না। বিষয়টি জীবন মৃত্যুর না হলে, আমি আপনাকে এত বিরক্ত করতাম না।”

রাহেলা চমকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ;”মানে কি? তুমি কি বলতে চাইছো? 

 

রাফি উত্তর দিল; ” ম্যাডাম, আপনার একজন ভক্ত হিসেবে আমার জীবনের শেষ ইচ্ছাটি পূরণ করার সুযোগ দিন।”

 

রাহেলা বেগম থমকে গেলেন। কিছুদিন থেকেই সে খুব মনমরা হয়ে আছেন। মন, মেজাজও তেমন ভালো নয়। এর মাঝে হঠাৎ রাফির বিস্মিত ও আশ্চর্যান্বিত কথা শুনে তার বিষয়টি গুরুতর বলে অনুভব হল। 

রাহেলা বেগম কিছুক্ষণ ভেবে রাফিক বলল; “ঠিক আছে। তুমি কখন আসতে পারবে? আমি বাইরে কোথাও যেতে পারবো না। তাই তোমাকে আমার বাড়িতে আসতে হবে। পারবে?”

 

রাফি উতলা হয়ে উত্তর দিলো; “হ্যাঁ। পারব।আমি এখনই আসছি।”

 

রাহেলা বেগম রাফিকে তার বাড়ির ঠিকানা দেওয়ার পূর্বেই রাফি জানিয়ে দিল, তার তা জানা আছে। রাহেলা তার মোবাইল রেখে চলে গেল বারান্দায়। কিছুক্ষণ সেখানেই আনমনে কাটাতে আরম্ভ করলো। বেশি সময় হয়নি সে বই খাতা গুছিয়ে বসেছে। শরীরে বা মনে কিছুতেই শান্তি নেই তার। তাই আজকাল নিজ কাজেও মন বসাতে পারেন না বেশিরভাগ সময় এভাবে আনমনে হেঁটে বসে কাটিয়ে দেন। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আবার ফিরে এল তার চেয়ারে, মনের অজানায় দেয়ালে থাকা ঘড়িতে চোখ পড়তেই সে হতভম্ব হয়ে গেল। ঘড়ির কাটায় রাত আটটা বেজে গেছে। তখনই ফিরে এল তার বিবেক-বুদ্ধিনা। না জেনে, না বুঝে হঠাৎ কোনো অজানা মানুষকে বাড়িতে ডাকা, একদমই ঠিক হয়নি তার। আবার হারিয়ে গেল তার মনের আকাশ, কিছুদিন পর পর নিজের ভুল নিয়ে বিরক্ত হতে শুরু করলেন। গুনগুন করে নিজেই যেন নিজেকে কি সব বলতে লাগলেন রাগের ঠেলায়। 

শায়লা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো;”আফা,ভাত রান্না হইসে।আফনি এহন কাইবেন?”

রাহেলা বেগম এখনো কি যেন ভাবছে, শায়লার কথা তার কানেই আসেনি।

 

শায়লা আবার একটু উচ্চরবে বলে উঠলো; “আফা!”

 

– হ্যাঁ? কি হয়েছে?

 

– ভাত খাইবেন?

 

– না। এখন না। ও তুই এসে ভালো করেছিস। তোর সাথে কথা আছে।

 

শায়লা এগিয়ে এসে রাহেলার পাশে এসে দাঁড়ালো। নিজের ওর্নার নকশায় মন দিয়ে জিজ্ঞাসা করল; ” কি? কন!”

 

– আজ একজন অতিথি আসবেন। তাই ব্যস্ত হয়ে পরিস না ঘুমানোর জন্য। সে দ্রুতই চলে যাবে, তখন ঘুমাতে যাস।

 

– কে আইবো?

 

– আসবে কেউ একজন।তোকে যা বলেছি,করিস।

 

– আইচ্ছা।

 

রাহেলা বেগম সাহসী এবং বুদ্ধিমান একজন নারী। কিন্তুু কিছুদিন থেকে আনমনে প্রায়ই সে ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অচেনা মানুষকে রাতে আসতে বলে যদিও সে ঠিক কাজ করেনি। তবুও এতে কাউকে চিন্তিত সে করতে চায় না। তাই সে শায়লাকে জানালো না এই বিষয়টি। এছাড়াও রাহেলা ভয় পাওয়ার মানুষ নন। তাই দুর্ঘটনা নিয়ে বেশি ভেবে সে সময় নষ্ট করতে চান না। আবারো বইটা হাতে নিয়ে পড়তে আরম্ভ করল সে। কিছুক্ষণে দুর্ঘটনার ভয় তার মাথা থেকে গেলেও ছেলেটির এমন অদ্ভুত কথার অর্থ জানার জন্য সে খুবই উতলা হয়ে উঠলেন। এভাবেই ভাবতে ভাবতে যেন নিজের অজান্তেই সেই ছেলেটির আসার অপেক্ষা করতে লাগলো রাহেলা।

প্রায় এক ঘন্টার মাঝে বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলে  শায়লা দরজা খুলে দিল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন তরুণ। বয়স ২৫ এর কাছাকাছি। তবে যুবকের গরম রক্ত বইছে না তার দেহে। শরীরের হাড় বেরিয়ে গেছে, বাবলি চুলগুলো উস্কো ও এলোমলোভাবে রয়েছে। মুখে ফুটে আছে দুর্বল এবং ক্লান্তির ছাপ। চোখের কোণজুড়ে কালো অক্ষরেখা।

শায়লা তাকে সোফা আসন নিতে আমন্ত্রণ করল। দ্রুত রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস শরবত বানিয়ে নিয়ে আসলো মেহমান আপ্যায়নের খাতিলে। 

 

রাফি এদিক ওদিক তাকিয়ে শায়লাকে জিজ্ঞাসা করল; “রাহেলা ম্যাডাম কোথায়?”

 

শায়লা রাফি থেকে গ্লাস নিয়ে বলল; “তার বিশেষ রুমে পড়ালেখা করতেছে। বহেন আপনি, আমি ডেকে দিইচ্ছি।”

 

রাফি হা-সূচক ইশারা দিয়ে মাথা নাড়লো।

 

শায়লা চলে গেল রাহেলার পাঠের কক্ষে। এই কক্ষে ঢোকা নিষেধ সবার। এই কক্ষে রাহেলা কাউকে ঢুকতে দিতে চায় না। এমনকি শায়লাও অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে এই কক্ষে।

 

শায়লা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললো; “আফা আপনার মেহমান আইছে”।

 

-“আচ্ছা তুই ওর সাথে বসে গল্প কর, আমি আসছি।”

 

শায়লা ভ্রু কুঁচকে বলল; “আমি তার লগে কি গল্প করমু?”

 

-“গল্প করা লাগবে না, তুই ওখানে গিয়ে বসে থাক। আমি আসছি।”

 

-“আইচ্ছা”

 

শায়লা চলে গেলে রাহেলা তার কক্ষটি গোছাতে আরম্ভ করে। যেহেতু একটি জরুরি বিষয়ে কথা হবে,  তাই সে চায় রাফিকে এখানে এনে কথা বলবে। যত যাই হোক এই বাড়ির মধ্যে তার সবচেয়ে পছন্দের কক্ষ এটি।

 

রাফি শায়লাকে দেখে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললোঃ”ম্যাডাম কোথায়” 

 

শায়লা এসে বসতে বসতে উত্তর দিলো; “অধৈর্য হইয়েন না, আইতেছে।”

 

 রাফি আবার বসে গেল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর রাফি নিজ থেকেই   জিজ্ঞাসা করল; “আপনি কে হন ম্যাডামের?”

 

– “আমি এখানে কাম করি”

 

-“ও আচ্ছা”

 

– “আমি কাম করলে কি হইছে? আমি আফার অনেক  প্রিয় মানুষ। আফা আমারে অনেক আদর করে। আমি আর আফাই থাকি এই  বাসায়।”

 

রাফি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল; “আর কেউ থাকেনা?”

 

-“না। আফা বিয়া করে নাই। চল্লিশ বছরে পা দিচ্ছে। কিন্তু বিয়ার নাম গন্ধ নাই তার।”

 

-“ও”

 

আবার কি যেন জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও রাফি থেমে গেল। এরই মাঝে রাহেলা চলে এলো। রাহেলাকে দেখে সম্মান জানিয়ে  রাফি দাঁড়িয়ে গেল।

 

রাহেলা হেসে রাফিকে বলল; “স্বাগতম।”

 

– “ধন্যবাদ।”

 

রাহেলা শায়লাকে লক্ষ করে বলল; “কিছু নাস্তা নিয়ে আসো “

 

-“না, ম্যাডাম। প্রয়োজন নেই। আমি যতটা সম্ভব দ্রুত শুরু করতে চাই।”

 

রাফি শুরু করতে নিলেই রাহেলা তাকে বাধা দিয়ে বলল; “না। এখানে না। আমার কক্ষে গিয়ে কথা বলবো”

 

রাহেলা তাকে তার বিশেষ কক্ষে নিয়ে গেল। রাফি বেশ আকর্ষিত হয়, যখন সে এতগুলো বই সেই কক্ষে দেখতে পেল। বিভিন্ন রকমের বই সেখানে গোছানো আছে সারিবদ্ধ হয়ে। খুব সুন্দরভাবে শৃঙ্খলাতার সাথে সাজিয়ে রাখা আছে সেই বইগুলো। তবে বইগুলো কোন উপন্যাস বা কাল্পনিক গল্পের নয়, প্রত্যেকটি বই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণের। এর মাঝে বিশেষ তাকে রাখা আছে আত্মউন্নয়নমূলক বই গুলো। এছাড়াও কক্ষটিতে বিভিন্ন ধরনের খাতা, কলম, সংবাদ পত্র-পত্রিকা প্রভৃতি দিয়ে ভরপুর। তবে আসবাবপত্র বলতে একটি টেবিল, দুটি চেয়ার এবং কিছু বই রাখার তাক ছাড়া কিছুই নেই।

 

রাহেলা রাফি কে উদ্দেশ্য করে স্নেহের সাথে বলে; “কথাটা বেশ জরুরী বলেছিলে তুমি। আমি খুবই আগ্রহী হয়ে উঠেছি তোমার কথাটি শুনতে। আমাকে তোমার বন্ধু ভেবে সবকিছু খুলে বলো।”

 

– “আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা। তবে আমার দৃঢ় আস্থা আপনি আমায় বিশ্বাস করবেন।”

 

– “আস্থা রাখতে পারো।”

 

-“আমি সবসময় সাধারণ জীবন যাপন করেছি। আমার জন্ম হয়েছে ময়মনসিংহ জেলা গ্রাম। সেটি আমার পৈতৃক নিবাস। বেশ দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম আমি শৈশবে। তখন সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু আমার দশ বছর বয়স হতেই শুরু হয় কিছু অস্বাভাবিক কান্ড। আমি ব্যাপারটা প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি। ঘুমালে ঘুমে কথা বলতাম আমি। ব্যাপারটি যদিও খুব স্বাভাবিক, কিন্তু আমার সেই কথা ছিল বেশ অপরিচিত, অজানা এবং অদ্ভুত। আমার যেটুকু মনে আছে, সবাই বলেছে  কথাগুলো ছিল এক অন্য কন্ঠের, আলাদা স্বরের।  যেন এক বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর সেগুলো। এক ধরনের গম্ভীর ও ঘন কণ্ঠস্বর ছিল সেগুলো। প্রথম প্রথম আমার পরিবারের সবাই এসব নিয়ে হাসাহাসি করে উড়িয়ে দিতো। তবে মাসের-পর-মাস যেন সেই কণ্ঠস্বর আরো গম্ভীর ও ঘন হতে শুরু হলো। আমি..

 

রাহেলা রাফির কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠলো; “তোমার তখন বয়স মাত্র দশ বছর। তখন এতো গম্ভীর কণ্ঠস্বর কিভাবে হতো?…মানে এটা কিভাবে সম্ভব? তুমি কোনো ডাক্তার দেখাও নি? হতে পারে সেগুলো কণ্ঠনালীর সমস্যা হতে হয়েছিল। আর অন্যরকম বলতে কেমন কথা বোঝাতে চাইছো?”

 

রাশি মুচকি হেসে বলল; “গ্রামের ডাক্তারের   স্থান থেকেও বড় পদে নিয়োগ থাকে কবিরাজ। অশিখিত মা ও বাবা দিশেহারা হয়ে যে যেমন বলেছে তাতেই চেষ্টা করতে লাগল। পরিশেষে কবিরাজই দায়িত্ব নিল আমার এই রোগের। প্রায় ১০-১২টি তাবিজ আমার গলায় ঝুলত তখন থেকে। কিন্তুু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না।” 

 

রাহেলা আগ্রহী স্বরে বলল; ” তারপর কি হল?”

 

– “অনেকে  অনেক রকম কথা বলতে শুরু করল। কেউ বলল জিন, কেউ বলল অপদেবতা, কেউ বলল বাড়ি খারাপ,  আবার কেউ কেউ বলল কোনো ভুতপ্রেতের উপদ্রব। তখন থেকে আমার মা আমার সাথে রাতে ঘুমাতে  আরম্ভ করলো। আমি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলেই, মা আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিত। দু’বছর এভাবেই কেটে যায় আমার। আমার ১২ বছর হওয়ার পর থেমে যায় আমার এই  অভ্যাস। সবাই খুব খুশি ছিল। স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে যাই আমি। সবাই ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে গেছে, কিন্তু এটি পরবর্তীতে চরম ভুল প্রমাণিত হলো। আবার দুই বছর পর অর্থাৎ আমার ১৪ বছর বয়সে এক আলাদা সমস্যার আবির্ভাব ঘটলো। আমি প্রতিদিন রাত তিনটায় ঘুমের মাঝে হাটাহাটি করতে শুরু করলাম। চোখ বন্ধ থাকলেও আমার শরীর যেন সজাগ থাকতো। সকালে ঘুম ভাঙলে নিজেকে ঘরের কোনো এক কোণায় খুঁজে পেতাম। বিষয়গুলো তখন আমারও খুব বিস্ময়কর মনে হতে আরম্ভ করল। গ্রামের ছেলে আমি। এসব নিয়ে বেশি ধারণাও ছিলো না আমার। আমার এই অভ্যাস বেশ বিরক্তিকর হয়ে উঠল সমাজ ও পরিবারের কাছ। সকলের কাছে যেন এক বিরক্তির ও বোঝার পাত্র হয়ে পরলাম আমি। কিন্তু তবুও বিরক্ত হতো না, আমার মা। যতটা সম্ভব আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করত সে। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন তাবিজ অথবা পানি পড়া নিয়ে আসতেন তিনি। আমার গলার তাবিজের সংখ্যা বাড়তে লাগলো দিনে দিনে। এভাবে একটা সময় মাও তার প্রেরণা হারিয়ে ফেলতে আরম্ভ করলো। সাহায্য চাইল ঢাকায় থাকা আমাদের এক দুরসম্পর্কের চাচার। তিনি সময় করে  আমাদের গ্রামে এলেন কিছুদিনের মধ্যে। সকল কথা বিস্তারিত শুনে, তিনি খুব হাসলেন। আমাদের দুঃখের কাহিনী যেন তার কাছে ছিল হাস্যকর, কৌতুকাবহ ও রগুড়ে। তারপর তিনি আমাদের বললেন আমার  স্বপ্নচারিতা অথবা স্বপ্নচরণের সমস্যা রয়েছে। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় স্লিপ ওয়াল্কিং। তিনি আরও বলেন যে ভালো ডাক্তার দেখালে সব ঠিক হয়ে যাবে। তার  কথায় শুনে একটু আশার  আলো  পেলাম আমরা। কিছুদিনের মধ্যে আমি আর বাবা সেই চাচার সাথে পাড়ি দিই ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায়। চাচা আমায় একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার আমাকে  কয়েকটি ঔষধের নাম লিখে দিলেন পাশাপাশি বললেন চিন্তার কোন কিছু নেই। ডাক্তারের কথায় মনের মাঝে আস্থা খুঁজে পেলাম আমরা।

বেশ কিছুদিন আমরা চাচার বাড়িতেই থাকলাম। সেই কয়েকদিন আমি প্রাণ খুলে ঘুমিয়েছি। ঔষুধের হয়তো কাজ হচ্ছিল এই ভেবে কতই না আনন্দিত ছিলাম আমরা তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হচ্ছিল ডাক্তার যেন শুধু ডাক্তার নয় তিনি যেন একজন রূপকথার গল্পের অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি। তাকে যে কত দোয়া আর কত সম্মান জানিয়েছে তা অগণিত। সাত দিন কোনো অস্বাভাবিকতার আবির্ভাব না হলে, আমি আর বাবা আবার বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু ভাগ্য যেন বারবার আমাদের পিছনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। বাড়ি ফিরতেই আবার শুরু হলো আগের সেই সমস্যা। কিন্তু তখন আর ঘরের ভেতর রইল না এ অস্বাভাবিকতা, পাড়ি দিল ঘরের বাইরের জগতে।….”

এই কথা শেষে রাফি  কাশতে  লাগল। রাহেলা স্মরণ করলো অনেকক্ষণ যাবৎ রাফি কথা বলছে, কিন্তু তাকে কোন আপ্যায়ন করা হয়নি রাহেলার। রাফিকের কিছু জিজ্ঞাসা না করে উঠে দাড়ালো সে।

 

-“তুমি চা পছন্দ করো নাকি কফি?”

 

-“না ম্যাডাম। ব্যস্ত হবেন না, আমি ঠিক আছি। আপনি আমার কথা শুনছেন, এতেই আমি খুব সন্তুষ্ট।”

 

-“আহা! তোমাকে যা জিজ্ঞাসা করেছি তার উত্তর দাও।”

 

-“আপনার যেটা স্বাচ্ছন্দ বোধ হয় সেটাই করুন।”

 

-“আচ্ছা। তবে তুমি একটু অপেক্ষা করো ,আমি আসছি।”

     

-“অবশ্যই।”

 

রাহেলা প্রায় ৫ মিনিট পর শায়লাকে নিয়ে এল বিশেষ কক্ষে। দু’কাপ চা, বিস্কুট, চানাচুর এবং  কিছু ফল পাত্রে সাজানো। শায়লা তার হাতের কাজ সেরে চলে গেল নিজ ঘরে।

 

রাহেলা রাফির চায়ে চিনি মেশাতে মেশাতে বলল; “আমি চা পছন্দ করি, তাই তোমাকেও তাই দিচ্ছি।”

 

-“জি, ধন্যবাদ।”

 

-“বুঝেছ রাফি, তোমার কাহিনীটা বেশ স্বাভাবিক। স্বপ্নচারিতা কিন্তু কোনো বিশেষ সমস্যা নয়। এটি কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা স্বপ্নচারিতা ভুগছে । এখানে জীবন-মৃত্যুর কোনো হাত নেই। তুমি এত চিন্তা করো না, ভালো ডাক্তার দেখালে সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, বয়সের সাথে সাথে এই সমস্যার প্রতিকার আপনা আপনিও হয়ে যায়।”

 

রাফি মুচকে হেসে বলল; “ম্যাডাম, আমার কাহিনী বটে শুরু হলো। এখনো কিছুই বলা হয়নি। পুরো কথা শুনার পর আপনি কখনোই আমার কাহিনীকে স্বাভাবিক বলতে পারবেন না। এইটুকু বিশ্বাস আমার রয়েছে।”

 

রাহিলা কিছু বলল না। কিন্তু তারও যেন মনের কোনো এক কোনে সাড়া দিচ্ছে রাফি থেকে নতুন কিছু শোনা হবে আজ। তাই এই ব্যাপারে আর কোনো কথা বাড়ালো না সে। কিছুটা সময় তারা দুইজনে চায়ের পাশাপাশি ভাব বিনিময় করলেন। বিষয়বস্তুর বেশিরভাগ সময়ই রাফির পছন্দের বইগুলোর তালিকা নিয়ে তাদের আলাপ হল। 

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটি দিয়ে রাহেলা রাফি কে বলল; “শুরু কর, তোমার সে অস্বাভাবিক জীবন কাহিনী।”

 

-“ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর, শুরু হয় আলাদা এক সমস্যার আবির্ভাব। সুস্থ হওয়ার বদলে দিনে দিনে অবনতির দিকে পা দিচ্ছিল আমার শরীর। বাড়ি থেকে ঠিক রাত তিনটায় বের হয়ে যেতাম আমি। বেশ কিছুদিন এমন চলতে থাকলে আমার বাবা-মা দরজায় তালা লাগিয়ে রাখা আরম্ভ করেন। কিন্তু অস্বাভাবিক এবং ভয়ঙ্কর ব্যাপার সেটি ছিল, যখন সেই তালা আমি নিজ হাতে খুলে বাইরে চলে যেতে শুরু করলাম। সেই তালার চাবি আমার বাবার বিছানার নিচে থাকত। কিন্তু তবুও সেই চাবি ছাড়া তালা খুলতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি। সকালে উঠে দেখা যেত তালা ভাঙ্গা। আমি আজও বুঝে উঠতে পারছিনা এত শক্তি কোথা থেকে এসেছিল আমার শরীরে। সেই বিশাল শক্তির অধিকারী আমি কখনোই ছিলাম না। কিন্তু মাঝে মধ্যে কেন যেন অনুভব হতো এক বিশাল শক্তি বিরাজ করছে আমার শরীরে। কিন্তু সেটি অনুভুতিতেই ন্যস্ত। কেননা এ সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অথবা সঠিক ধারণা ছিল না, আজও নেই। তবে ঘুম ভাঙলে আমার শরীরে প্রতিটি অঙ্গ ব্যথা থাকতো। সেই অজানা ব্যাথার কারন আমি বুঝাতে সক্ষম নই। পরবর্তীতে উপায় না পেয়ে, আমার বাবা শিকল এনে রাতে আমার হাত-পা খাটের সাথে বেধে রাখত। কিন্তু সবকিছু আগের মতোই চলছিল। কিছুই থামছিল না কিছুতে। যেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এটাই ছিল যে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে রাতে তিনটায় । এমনকি যদিও এতে আমার শরীর প্রতিনিয়ত ক্ষতচিহ্নিত হতে থাকে।

আরো পাঁচ বছর কাটে এভাবে। ঔষধ, ডাক্তার, আংটি, পড়া পানি, মায়ের তাবিজ আর বাবার শিকল সকল কিছুই ব্যবহার করা হয়েছিল অগনিতবার। সেগুলোর রেখা আমার শরীরে দাগ ফেলে গেলেও, কোন ফলাফল পাচ্ছিলাম না আমরা। জীবনটা হয়ে উঠেছিল নরক। সারাক্ষণ মায়ের কান্না, ছোট বোনের   ভীতি ভরা কন্ঠ আর বাবার দিশেহারা মুখ যেন আরও ক্লান্ত ও দুঃখী করে দিত আমায় । গ্রামের মানুষের নানান মুখী কথার সীমা রইল না। দিনে দিনে কথাচালাচালির সহ্যের বাইরে চলে যেতে আরম্ভ করলো। তারা তাদের সন্তানদের আমার সাথে মিশতে নিষেধ করত, অনেকে আমাকে অভিশপ্ত বলে আখ্যায়িত করত আবার আমাদের অধিকাংশ নিকট আত্মীয় আমাদের এড়িয়ে চলতে শুরু  করলো। এভাবে ২০ বছর বয়সে শুরু হলো এক নতুন জটিলতার।

১৩ ই এপ্রিল রাত করে ঘুমাই আমরা সেদিন । আমার মা আমার সাথে ঘুমায় না পারিবারিক কিছু সমস্যা থাকায়। এছাড়াও ক্লান্ত শরীর হওয়ায় খুব দ্রুতই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। সবসময়ের মত আবার রাত তিনটায় বের হয়ে যাই আমি। সাধারণত এমন বের হলে ঘুম ভাঙতো আমার সূর্য উদয়ের পর। নিজেকে রাস্তার কোনো এক কোনায় অথবা বাগানে খুঁজে পেতাম ভোর সকালে। কিন্তু তিনটা থেকে সকাল পর্যন্ত কি হত বা কোথায় যেতাম তা কখনো জেনে উঠতে পারিনি। বলতে গেলে কখনও জানতেও চাইনি। কিন্তু সেইদিন ঘুম ভাঙ্গে মাঝরাতে। হাতে আমার ঘড়িটি রেখেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম অজান্তে ক্লান্তির ছলে। যখন ঘুম ভাঙ্গে ঘড়ির দিকে চোখ পড়লে লক্ষ করি তখন ঘড়িতে ৪ টা ৫১ মিনিট। হঠাৎ নিজের অজান্তেই যেন ভয় পেতে লাগলাম আমি। নিজেকে খুঁজে পেলাম এক ঘন বাগানে। কোনো মানুষের যেন বিন্দু রেখাও নেই এখানে । খুব নির্জন ও নিরব সেই বাগানটি। সে বাগানে কখনো যাইনি আমি। যদিও ময়মনসিংহের আনাচে-কানাচে প্রায় সকল জায়গা আমার খুব পরিচিত। কেননা জন্ম থেকেই আমি এখানে বড় হয়েছি। কিন্তু ময়মনসিংহের এই স্থানটির যেন কখনো আমার চোখে পড়ে নি। আদৌ কি এমন কোন স্থানের আবির্ভাব ঘটেছে এই ময়মনসিংহে তাও জানা ছিল না আমার। পাশাপাশি ঘনঘনে  অন্ধকার সেই স্থানে কিছুই যেন স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিলো না। ঝাপসা চোখে রাস্তার খোঁজার চেষ্টা থাকলেও শরীর যেন স্থির হয়ে থাকার জন্য আকুতি করছিল। কিছু খানেকের মাঝেই আবিষ্কার করলাম বেশ শীতল আবহাওয়া এখানে। খুব ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম আমার দেহ। অতি ঠান্ডার কারণে শরীর যেন জমাট হয়ে যেতেও আরম্ভ করলো। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার এটা ছিল যে, এপ্রিল মাসে যখন কড়া গরম আবহাওয়া বিরাজমান। তখন কিভাবে হঠাৎ এত শীতল আবহাওয়ার সৃষ্টি হল? ভীতির কবলে আক্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে আরম্ভ করলাম। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর অনুভব হল যেন আরো গভীরে হারিয়ে যাচ্ছি আমি। একটু একটু করে হাঁটার গতি বাড়াতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ সামনে যেতেই যেন মনে হলো আটকে যাচ্ছে আমার শরীর। আটকে যাচ্ছে ঘন জঙ্গলের লতা পাতার মাঝে আমার সর্বাঙ্গ। সবকিছু যেন আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছে আমায়। দিশেহারা হয়ে পিছনে ফিরে হাটা শুরু করলেই, কিছু একটা ফুড়ে যায় আমার পায়ে। অন্ধকারের মাঝে কিছু দেখতে না পেলেও স্পর্শ করে অনুভব করতে পারছিলাম, আমার পায়ে কোনো এক কাঁটা ফুড়ে গেছে । কোনো ভাবে সেই কাঁটা বের করে পায়ে স্পর্শ করলে অনুভব করি উষ্ণ তরল পদার্থের স্রোত। বুঝতে পেলাম, রক্ত যেন গড়গড় করে বইছে আমার পায়ের তালু থেকে। পাশাপাশি সেই ঠান্ডা আবহাওয়া ও শীতল বাতাসের কারণে কাঁপতে লাগলো আমার শরীর। সেই বাতাসের মাঝে কিছুটা অদ্ভুত দুর্গন্ধ ছিল। এক বিদ্ঘুটে দুর্গন্ধ বইছিল সেই বাতাস। জানিনা কেন কিন্তু ভীতির কবলে যেন ঘনিয়ে যাছিলাম আমি। চোখে অশ্রু না থাকলেও মন থেকে যেন বলছিল আজ পৃথিবীর শেষ দিন। আজই শেষ নিঃশ্বাস ফেলবে আমার প্রাণ। হাঁটতে আরম্ভ করলেই ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলাম আমি। পায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পেলাম রক্তের স্রোত বইছে অঝরে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে লক্ষ করলাম সেই মাটি ভেজা। হাতে কিছুটা পরিমাণ মাটি নিয়ে ঘ্রাণ নিতে উপলব্ধি করলাম সেগুলো ছিল রক্ত। তবে আমার রক্ত ঝরলেও এত রক্ত বইবার কথা নয়। এত রক্ত কোথা থেকে তাহলে এল? এইটুকু বুঝতে বেশি সময় লাগল না আমার যে, এখানে আমি ছাড়াও অন্য কেউ আছে। সেও রক্তাক্ত। তারও রক্ত ঝরছে । এইটুকু মনে আসতেই সকল ব্যথা তুচ্ছ করে দৌড়াতে আরম্ভ করলাম ভয়ের সাথে। পিছনের বাগানটি যেন আরও ঘন হয়ে আসছে।  ঘিরে ফেলতে চাচ্ছে আমায়, আটকে রাখতে চাচ্ছে আমায় ঘন জঙ্গলে, ফেলে দিতে চাচ্ছে অন্ধকারে। অজানা কন্ঠ যেন পিছন থেকে ডাকছে। যতই চাচ্ছি মনের ভুল ভেবে তাদের তাড়িয়ে দিতে, কিন্তু ততই সেই ধ্বনি এবং নিস্বন আরো স্পষ্ট ও গম্ভীর হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পর মনে হতে লাগলো  কেউ আমার সামনে। কিছুটা দূরে দাড়িয়ে আছে কেউ একজন। অন্ধকারের কারণে স্পষ্ট তাকে দেখা যাচ্ছে না । সে আমার দিকে এগুতে আরম্ভ করলো। একটু একটু করে সে আমার কাছাকাছি আসতে থাকতে লাগলো। তিনি যত কাছে আসছে, ততই সেই নোংরা দূর্গন্ধ কাছে ভেসে আসতে শুরু করলো। সে লোকটি একটু একটু করে খুব কাছাকাছি চলে এল। প্রায় সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুজন। পিছনের সেই গম্ভীর আওয়াজ আরো কাছে এসে গেল । আরো স্পষ্ট হয়ে আমার দু’কানে বাজতে লাগল । কিন্তু শরীরের উপর যেন কোনো নিয়ন্ত্রন আমার নেই। বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে জমে গেছে শরীর। কিন্তু মাথা গরিয়ে ঝর ঝর করে ঘাম বইছে। চোখের মনি দুটি অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করছে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজায়। তারপর……

 

রাহেলা উদ্দীপ্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো; “তারপর? তারপর কি হল?”

 

  -” ঘুম ভেঙ্গে গেল।”

 

  – ” মানে কি? এগুলো শুধু স্বপ্ন ছিল? 

 

  -“না। এসব স্বপ্ন ছিল না। কিন্তু..তারপর কি হয়েছে আমি জানিনা।  যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, তখন নিজেকে আমার বাড়ির বিছানায় আবিষ্কার করি।”

 

 -“তবে তুমি কিভাবে বুঝলে সেটা স্বপ্ন ছিল না?”

   

রাফি তার পায়ের মোজাটি খুলে রাহেলা দিকে পা এগিয়ে দিল আর বলল ; “এটাই প্রমাণ”

 

রাহেলা দেখল রাফির পায়ের পাতায়  একটি ফুটো। দীর্ঘদিন আগের ক্ষতটি, তা বুঝা যাচ্ছে। রাহেলা হতভম্ব হয়ে গেল এই দৃশ্য দেখে ।

রাহেলা আশ্চর্য হয়ে রাফি কে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো; “মা..মানে? কিভাবে? কিভাবে এমন হলো ?তুমি বাড়ি কিভাবে এসেছিলে?”

 

রাফি উত্তর দিল; “জানিনা। কিভাবে আমি বাড়িতে  ফিরেছিলাম। তার উত্তর কখনোই পাইনি।”

 

 রাফি আবার শুরু করল;  “এখানেই শেষ হলে হয়তো নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম। কিন্তু না। শেষ হয়নি কিছুই। পরদিন মা আর বোন যেন ঈদের মতো দিন কাটালেন। বাড়িতে উৎসবের মতো আনন্দের শুরু হল। সকলে ভাবল আমার হাতের নতুন তাবিজটি শেষ পর্যন্ত কাজ করেছে। তাদের সাথে সে আনন্দ আমিও উপভোগ করলাম।  এত বছর পর মায়ের কান্না ভরা চোখ শুকিয়ে যখন মুখে  উজ্জ্বল হাসি আর বোনের সে সুখানুভব ও প্রসন্নতার পুনরুত্থান, তখন যেন মিথ্যাকেই মাথা পেতে আমন্ত্রণ করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ হল আমার। কাউকে সেই রাতের ব্যাপারে কিছুই বললাম না। মা ও বোনের সে আনন্দের অংশীদার হয়ে রইলাম। কিছু মুহূর্তের জন্য যেন নিজেও ভুলে গেলাম সেই গভীর রাতের দৃশ্য।”

 

রাহেলা রাফিকে  থামিয়ে বললো; “আর…তোমার বাবার কি হলো?

 

রাফি থমকে গেল। তার মুখে ফুটে উঠল অস্বস্তিভরা ভাব। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, সে বলল; “বাবা….বাবা..মারা গেছেন। আমার ১৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।”

রাহেলা কিছুক্ষণ রাফির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। রাফি নিঃশব্দের চেয়ে রইল মাটিতে।

 

– “রাফি আমার বয়স ৪১। আমার জীবনের প্রায় সকল সময় আমি পার করেছি রিচার্জের মাধ্যমে। যদিও বর্তমানে ডাক্তার বলে পরিচিত, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এইটুকু বলতে চাই, তুমি কি আমার থেকে কিছু লুকিয়ে রাখছ?”

 

 রাহেলা আরও বললো; “রাফি, ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । তোমার সকল কথা আমার কাছে রক্ষিত থাকবে। শুধু আমাকে তোমার কাছের একজন বন্ধু ভেবে, আমাকে সবটুকু বল।”

রাফি মাথা তুলে নিচু স্বরে বলল; “ম্যাডাম, ক্ষমা করবেন। আসলে…. আমার কখনো কোনো বন্ধু ছিল না। আমি জানিনা কিভাবে বন্ধুর সাথে কথা বলতে হবে।”

 

রাহিলা থমকে গেল। কিছুক্ষণ চেয়ে রইল রাফির সেই স্নেহভরা মুখের দিকে। রাফির মুখে এমন কথা শুনে যেন, সে হতভম্ব হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। তরুণ বয়সের এক বালকের জীবনে কখনো কোন বন্ধুর আবির্ভাব ঘটেনি, ব্যাপারটা খুবই বেদনাদায়ক। শৈশব, কৈশোর, তারপর তরুণ এই সময়টিতে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বেশি বন্ধুর আগমন ঘটে । এই বয়সেই বন্ধুত্বের অর্থ তারা বুঝতে পারে। নিজেদের কথাগুলো বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু যখন সেই বন্ধই না থাকে? আর যদি কখনো তাঁর আবির্ভাবই না ঘটে? 

রাফি তার গল্পের শুরু করে এখন পর্যন্ত সকল কিছু ধাপে ধাপে বললেও,  নিজের অনুভূতি, আবেগ, কষ্ট ও একাকীত্বতার গল্পগুলো যেন নিজের মাঝেই লুকিয়ে রেখেছে। জীবনে কত কি ঘটেছে তার বিস্তারিত সে খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে তো বলছে, কিন্তু মনের মাঝে গেঁথে থাকা অনেক না পাওয়া আনন্দের কথা যেন কবরে গেড়ে রেখেছে।

 

রাহেলা রাফির জন্য সহানুভূতি নিয়ে তার হাত ধরে বলল; “আমি জানি, আমি ভাষার প্রকাশ ভালোভাবে করতে পারিনা। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার সকল কথা আমার কাছে আমানত । একটু আস্থা রেখে আমাকে সকল সত্য কথা খুলে বলো।”

 

রাফি এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ১৫ থেকে ২০ বছরের মাঝে ঘটে যাওয়া সেই গোপন কাহিনী বলা শুরু করলো; যেমনটি বলেছিলাম, ১৫ বছর বয়স থেকেই আমি ঘরের বাইরে যেতে আরম্ভ করি। কারো সাধ্য ছিল না আমাকে বাড়িতে আটকিয়ে রাখা।  শুনেছি মাকে আমি অনেকবার আঘাত করেছি, বাবাও আমার আমার আক্রমণে আহত হয়েছে বারবার। কিন্তু আমার যখন ১৭ বছর বয়স, বাবা প্রতিজ্ঞা করে তিনি আমাকে আজ কোথাও যেতে দিবেন না। এমনকি যদিও এর ফল তার জীবন দিয়ে দিতে হয়। তারপর…

রাফি অস্থির হয়ে পরলো। তার চোখ গুলো যেন অসহায় এর মত কাঁদছে। রাহেলার চোখে চোখ রেখে যেন একটি কথাও তার মুখ হতে বেরুচ্ছে না। রাফির এই অস্থিকর অবস্থা দেখে, রাহেলা তাকে এক গ্লাস পানির দিল। ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে তা পান করল রাফি ।

 

-” আমি বাবাকে মেরে ফেলেছি।”

 

 রাহেলা চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করল; “কি? কিভাবে?

 

-“আমি নিজেও জানিনা, আমি কিভাবে মামাকে মেরেছি। সেই মৃত্যু শুধু দেখেছিল আমার মা। আমাকে বাঁচানোর জন্য মা সবাইকে বলেছে, বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। সকলে তাই বিশ্বাস করে নিয়েছে কিন্তু আমি, মা আর বোন শুধু  এই তিনজন জানে সেই মৃত্যুর কারণ আমি ছিলাম। আমি খুন করেছি আমার বাবাকে।”

 

রাহেলা ভ্রু কুঁচকে বলল; “রাফি! তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কি বলছো?  তুমি ঘুমে থেকে তোমার বাবাকে মেরে ফেলেছ আর তোমার সেই ঘুম তখনো ভাঙ্গেনি?”

 

 – “কিন্তু এটাই সত্যি। আমি জানি, আমার কথাগুলো খুবই অবাস্তব, কিন্তু এটাই সেদিন বাস্তব হয়েছিল।”

    

-“কিন্তু, তু..”

 

দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ হলো। রাহেলা আর রাফি মাথা সরিয়ে দেখল, শায়লা দাঁড়িয়ে আছে।

 

-” আফা! ভাত বারমু?”

 

রাহেলা দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল তখন বাজে রাত ১ টা ৪৭ মিনিট। শায়লা সবসময়ই রাহেলার সাথে রাতের খাবার খায়। বলা যেতে পারে প্রায় দীর্ঘ সময়ে একসাথে পার করার কারণেই এ অভ্যাসটি গড়ে উঠেছে তাদের মাঝে। কিন্তু তাই বলে যে এত রাত অবধি সে অপেক্ষা করবে তারা রাহেলা ভাবেনি।

তারা তিনজন মিলে রাতের খাবার খেতে টেবিলে গিয়ে বসলো। শায়লার চোখে নিদ্রালু ভাব। রাফির চোখ দুটিও ঘুমের  আর্তনাদ করছে। অবশ্য তা এখন নয়, প্রায় যখন থেকে রাফি এসেছিল তখন থেকেই চোখগুলো ঝিমোচ্ছিল। তবে রাহেলা চোখে নেই কোনো ঘুম। উতলা হয়ে আছে রাফির পরবর্তী ঘটনাগুলো শুনতে, পাশাপাশি কিছুটা চিন্তিত হয়ে আছে রাফির বাবার  সেই পরিণতি শুনে।

যত দ্রুত সম্ভব তারা খাবার শেষ করে পাড়ি দিলো সেই বিশেষ কক্ষে। এক মুহুর্ত বিশ্রাম না নিয়েই শুরু করল রাফি।

 

“বাবার মৃত্যু সম্পর্কে আমি এইটুকুই জানি । এর বাইরে আর আমি জানিনা।”

 

রাহেলা মাথা নেড়ে বলল; “আচ্ছা এই বিষয়ে আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে কি হয়েছে, তা বলা শুরু কর।”

   

    – “বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে, আমি নিজ থেকেই ময়মনসিংহের আনাচে-কানাচে প্রায় সকল জায়গায় খুঁজতে আরম্ভ করলাম সেই বাগানটি। কিন্তু কোথাও সেই বাগানের সন্ধান পেলাম না। যেন উধাও হয়ে গেল সেই বাগানটি। কোথাও তার অস্তিত্ব নেই। পরিশেষে আবার বাড়ি ফিরে এলাম, খাবার শেষ করে রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে চলে গেলাম। আবার উপস্থিত হলাম সেই বাগানে ।আগের মত সে আবহাওয়া, সেই গন্ধ আর সেই অন্ধকার। কিন্তু কিছুটা পরিবর্তন চোখে পড়ল আজ। সেদিন একজন মানুষ জায়গায় প্রায় সাত-আট  মানুষের উপস্থিতি। পরদিন দেখলাম সেখানে কিছু মানুষ গোল হয়ে বৈঠক করে হাসাহাসি করছে। পরদিন দেখলাম তাদের মুখগুলো। সেদিনই বুঝতে পারলাম তারা মানুষ নয়। একটু একটু করে সে অন্ধকার দূর হতে লাগল, গাছের শিকড় দিয়ে ঘেরা অন্ধকার সেই রাস্তাটি পরিষ্কার হতে লাগল। কিছুদিন পর স্পষ্ট দেখতে পেলাম সেই দৃশ্যগুলো। সেখানে বৈঠক করা সেই দানবগুলো কাঁচা মাংস গিলছে । পরদিন যখন সেখানে আবার উপস্থিত হলাম। তখন দেখলাম সেখানে তারা জীবন্ত এক ব্যক্তিকে তাদের খাবার বানিয়েছে। কি ভয়াবহ সেই দৃশ্য! কেউ কেউ জীবন্ত মানুষের আঙ্গুল কেটে খাচ্ছে , কেউ বা পেট ছিবরে মাংস বের করে মুখে দিচ্ছে, নিষ্পাপ সেই চোখগুলো আঙ্গুল দিয়ে ছিড়ে বের করে আনছে। তার রক্তে ভেসে যাচ্ছে সে মাটি।  কেউ আবার সেই তাজা রক্ত ঢকঢক করে পান করছে। হাসাহাসি করে  তাদের ভোজন উপভোগ করছে তারা আর সেখানে চিৎকার করে কিছুক্ষণের মাঝেই লোকটির প্রাণ স্বস্তি পায়। নরকীয় বেদনা ভোগ করে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ে আমার চোখের সামনে । কিন্তু আজব ব্যাপার হচ্ছে কেউ আমাকে দেখতে পারছেনা । অদৃশ্যের মত দাঁড়িয়ে আছি আমি। বরফের মতো জমে কাঁপছি এক কোণে । সেখানে এসব দেখে পরদিন সকালে বার বার বমি করতে থাকি। ভয়ঙ্কর এসব পরিবেশ দর্শন করতে করতে আমার শরীর তখন যেন হার মানতে চাচ্ছিল। শরীরের তাপমাত্রা শুধু অগ্রসর হতে লাগলো। বমির কোন ধরনের উন্নতি নেই। কিন্তু এগুলোতে আগ্রহ বা ভয় কোনোটিই নেই আমার। ভয় শুধু একটি বিষয় নিয়েই, তা হচ্ছে আজ রাতে কি বা কেমন দৃশ্য অপেক্ষা করছে আমার জন্য। কিন্তু ভাগ্যবশত সেই রাতে তেমন কিছু হয়েছিল বলে আমার মনে পড়ে না। হয়তো অতিরিক্ত জ্বরের কারণে সেখানে গিয়েছি কিনা, তার স্মৃতি আমার নেই। পরদিন শরীরের কিছুটা উন্নতি দেখলে, আমি রওনা হই ঢাকায়। কেননা সেই দিনের সেই দৃশ্য আমাকে খুবই ভীত করে ফেলেছিল। শুধু মনে এসেছিল একটি কথাই। ঢাকায় থাকার সেই কয়েকটি দিন, আমি আমার মাঝে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষণ পাইনি। তাই ভাবলাম ঢাকায় গিয়ে কোনো না কোনো একটি পথ বের করে নিতে হবে। কেননা এসব থেকে বেরিয়ে আসতে ভিক্ষে করছে আমার মন ও প্রাণ। শান্তির ঘুম যেতে চায় আমার চোখগুলো এবং কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে চায় আমার শরীর। আমি ঢাকায় পাড়ি দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সক্ষম হই। দশ দিন সবকিছু যেন ঠিক হয়ে গেল আবার। সেই আরামদায়ক ঘুমের স্বাদ অনুভব করি আমি। কিছু ডাক্তারের খোঁজ নিই আমি ও চাচা। আবার শুরু হল অশান্তি ১১তম দিনে । আমি ঘুমাচ্ছিলাম, রাত তিনটায় অতীতের মতো আমি পৌঁছে যাই সেই বাগানে। সবসময়ের মত নতুন কিছু ঘটলো। সেই ভয়ঙ্কর দানবগুলো তাদের ভোজনের ফাঁকে ফাঁকে আমার দিকে তাকাচ্ছে। এইটুকু বোঝার বাকি রইল না যে, তারা আমাকে দেখতে পাচ্ছে। স্পষ্টভাবে তারা আমায় দেখছে। কিন্তু তারা কেউ এগুচ্ছে না কেন? এমনকি তাদের মাঝে কেউ চেষ্টাও করছে না, আমাকে ছোঁয়ার বা স্পর্শ করার। শুধু কিছুক্ষণ পরপর আমার দিকে তিক্ত  চোখে তাকাচ্ছে আর ভজন করছে নরকীয়ভাবে। আমি প্রতিদিনের মতো সেই জঘন্য দৃশ্য দেখতে লাগলাম দূর থেকে। আমাদের মাঝে দূরত্ব প্রায় দশ হাতের। গাছের এ কিনারায় নিজেকে যতটা সম্ভব লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছি। কিন্তু বুঝতে কোনো দ্বিধা রইল না যে, আগামীকাল হবে আরও ভয়াবহ কিছু। ফজরের আজানে আমার ঘুম ভাঙলো। আমার চাচাকে বেশি কিছু বলিনি এইসব ব্যাপারে। কারণ কেউই বিশ্বাস করবে না, তা আমার খুব ভাল জানা আছে। তাই চাচাকে শুধু এইটুকু বললাম আমি রাতের বেলা খুব ভয় পাই। স্বপ্নে আবোল তাবোল জিনিস দেখতে পাই। তাই চাচা আমায় কিছু অভিজ্ঞ ও তার চেনা মনস্তত্ত্বিকের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু সবসময়ের মত কিছুই লাভ হল না। তখন বুঝতে পেলাম আমার সাহায্য আর কেউ করতে পারবে না। আমার সাহায্য করতে হবে আমাকেই। উপায় খুঁজে পেলাম খুবই দ্রুততার সাথে। খুবই সাধারণ ও সহজ উপায়টি। সেটা হচ্ছে আমি যদি না ঘুমাই তাহলে স্বপ্ন আসবে কোথা থেকে? সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আজ থেকে আমি এই পদ্ধতি অনুসরণ করব। শুরু করেদিলাম ঘুম বন্ধ করা। কিন্তু বলা যত সহজ, কাজটা করা ততটা সহজ কখনোই হতে পারে না।  না ঘুমিয়ে একরাত থাকা গেলেও দ্বিতীয় দিনের দিন তা হয়ে পড়ে মাথা ব্যাথার বিষয়। পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতাম চোখ, চোখগুলো টেনে ধরে রাখতাম টর্চ লাইট জ্বালিয়ে, শীতের সময় কিন্তু বরফের মত ঠান্ডা পানিতে মুখ ভিজিয়ে রাখতে শুরু করলাম,  আরো কত কি। কিন্তু কিছুতেই দু-তিন দিনের পর ঘুম বন্ধ করে রাখা সম্ভব হলো না।”

 

রাহেলা জিজ্ঞাসা করল; “আচ্ছা তুমি যদি, রাতে না ঘুমিয়ে সূর্য উদয়ের পর ঘুমাতে, তাহলে কি সেই বাগানের উপস্থিত  হতে?”

 

রাফি মনটা খারাপ করে বলল; “হ্যাঁ। ঘুমালেই সে বাগানে উপস্থিত হতাম যতই রাত হোক বা সকাল। তবে সেখানে সব সময় রাতে বিরাজ করত। শুধুমাত্র সেখানে যাওয়ার পথে বাধা দেয়ার একটি উপায় ছিল, তা হল না ঘুমানো। সেই কয়েকদিনের মাঝে আমার ২৩ বছর পূর্ণ হয়। নিজ থেকে একটি ঘুমের তালিকা তৈরি করি। সপ্তাহে তিনদিন, বেশি জোর চারদিন ঘুমাবো আমি। বাকি দিনগুলো যেকোনোভাবে যেভাবে সম্ভব জেগে থাকতে হবে। এভাবেই কয়েকটি দিন, মাস তারপর বছর অতিক্রম করি আমি। নতুন নতুন অনেক কিছু জানতে পারি সেখানে। আবিষ্কার করলাম সেখানে একটু একটু করে মানুষের পরিমাণ বাড়ছে। আরো পরিস্কার ও স্পষ্ট হতে লাগলো সেই বাগানটি। সেই বাগানটি পরিশেষে আর কোনো বাগান রইল না। সেটি পরিণত হলো এক নতুন জগতে। একটু একটু করে তাদের হিংস্রতার পরিমাণ বাড়তে লাগলো। সেই তিক্ত চোখের দৃষ্টি থেকে শুরু করে আমাকে স্পর্শ তারপর আঘাত করতে আরম্ভ করল তারা। তবে আমি আবিষ্কার করলাম সেই আঘাতের কোনো চিহ্ন আমি কখনো খুঁজে পাইনি । সকালে ঘুম থেকে উঠলে যেন সেই চিহ্ন মুছে যেত আপনা আপনি।”

 

রাহেলা মুখে হাত রেখে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর জিজ্ঞাসা করল; “তোমার শেষ স্বপ্নে কি হয়েছিল আর কবে হয়েছিল?”

 

– “তিন দিন আগে। আমি স্বপ্ন দেখেছি তিনদিন আগে। কিন্তু সেই দিনের থেকেও জরুরি সাত দিন আগের ঘটনাটি। সেদিন অনেক মানুষের ভিড় ছিল। নতুন কিছু মানুষের সন্ধান পেয়েছি সেদিন। তাদের মাঝে অনেক জন শিশুও ছিল। কেউ আমাকে দেখতে পারছিল আবার কেউ কেউ পারছিল না। কেউ কেউ কাঁদছিল আবার কেউ কেউ আনমনে চোখ বন্ধ করে হাঁটছিল। পাশাপাশি কিছু মানুষকে জীবন্ত ছিঁড়ে খাচ্ছে সেই নিষ্ঠুর দানবগুলো। আবার রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো মাটি। তখনই হঠাৎ একজন পেছন থেকে এসে, আমার গায়ের শার্টটি ধরল। আমি বেশ ভয় এর সাথে পিছনে ফিরি। পিছনে ছিল একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার সর্বাঙ্গে রক্ত মাখা। ভয়ের চোটে তার হাতটি  থরথরিয়ে কাঁপছে অনবরত। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, তার পা অত্যান্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না সে। মনে হচ্ছে কেউ যেন তার পা উপড়ে ছিড়ে ফেলতে চেষ্টা করেছে। রক্ত ঝরছে অনবরত সেই ক্ষত স্থান থেকে। আমি যতটা বুঝতে পারলাম আমার থেকে সে বয়সে ছোট। ১৮ থেকে ২০ বছর হবে তার বয়স। কান্নার কারণে মেয়েটি কোনো কথা বলতে পারছিল না। তবুও নিজেকে সামলে কোনো ভাবে কি যেন বলল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত আমি তার কোনো কথা বুঝতে পারলাম না। এমন সময় কোথা থেকে একটি দানব এসে আমার বুকের উপর তার ধারালো নখের আচর দিল। ব্যথা ও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠি আমি। অতিরক্ত ব্যাথার জালার সেখানেই যেন পা ভেঙ্গে পড়ে যেতে লাগলাম আমি। কিন্তু সেই মেয়েটি তার আগেই আমাকে নিয়ে ছুটতে শুরু করলো। আমি দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে লাগলাম তার সাথে। আমার বুক থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে গরগর করে। পরনের শার্টটি রক্তে লাল হয়ে গেল। আর সেই অসহ্যকর যন্ত্রণা যেন বাড়তেই লাগলো। মেয়েটি হঠাৎ থেমে গেল। আমি লক্ষ্য করলাম, এক বিশাল বাংলোর সামনে আমরা দাঁড়িয়ে। খোলা জায়গায় বিশেষ আদলে নির্মিত চওড়া বারান্দা ঘেরা দোতলা একটি বাংলো। তার সদর দরজা আমাদের সামনে। মেয়েটির অনুসরণ করে আমি সেই দরজায় প্রবেশ করলাম। মেয়েটির দেখানো পথে হাঁটতে লাগলাম আমি। সেই বাংলোর পিছনে রয়েছে একটি ছোট্ট মন্দির। সেই মন্দিরে গিয়ে আমরা আশ্রয় নিলাম। মন্দিরটি খুব ছোট হলেও সেখানে লুকিয়ে থাকার মতো ব্যবস্থা ছিল। আমি আর মেয়েটি সেখানে লুকিয়ে বসে রইলাম। আমি আমার ক্ষত জায়গাটি শার্ট দিয়ে চাপ দিয়ে ধরলাম। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে আমার শার্টটা রক্তে ভেসে যেতে লাগলো। নিজের রক্ত মাখানো শার্টটি চিপে আবার বুকে চেপে ধরলাম। মেয়েটাকে নিঃশব্দে তা দেখছে। তার মাঝে ভয়ের আর কোনো চিহ্ন নেই।  নিঃশব্দে কি যেন ভাবছে সে। অত্যন্ত সাহস ভরা তার আচরণ। আমার থেকে ছোট হওয়া সত্বেও যেন আমার থেকে অনেক কিছু বেশি জানে সে।

 আমি বললাম; ” তোমার পা….”

 

– ” তা নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। আজ আমার মৃত্যু নির্ধারিত। আমি শুধু চেয়েছিলাম মৃত্যুর আগে কারো সাথে কিছু কথা বলতে।”

 

– “কিসের কথা?”

 

– “আজ আমার মৃত্যু হলেও আপনার মৃত্যু আজ হবেনা। তবে কিছুদিনের মাথায় আপনার জায়গা হবে সেই টেবিলে যেখানে দানবগুলো ভজন করে। “

 

আমি তাকে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম; “তুমি কি কিছু জানো কিভাবে এর থেকে রেহাই পাওয়া যায়?”

 

–  “তা নির্ধারিত ভাবে আমি জানলে আমি নিজেকে রক্ষা করতাম। কিন্তু একজনের কাছে এর উপায় পাওয়া যাবে।”

 

-কে? কে সে ?

 

-“রাহেলা বেগম। তিনি একজন লেখিকা এবং ডাক্তার। পাশাপাশি একটি কথা বলতে ভুলবেন না। 

মেয়েটি কিছুক্ষণ থেমে আমাকে অনুরোধ করে বলল; “তাকে বলবেন আমার নাম ‘স্ব

‘স্বপ্না’।”

 

তারপর মেয়েটির..”

 

হঠাৎ রাহেলা বেগম থমকে গেল, চোখগুলো বড় করে হতভম্বের মত তাকিয়ে রইল রাফির দিকে। নিঃশ্বাস একটু একটু করে বড় হতে লাগল তার।

রাহেলার এমন অবস্থা দেখে রাফি জিজ্ঞাসা করলো; “ম্যাডাম, আপনি ঠিক আছেন?”

-” ..পানি…”

রাফি দ্রুত রাহেলাকে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিল। রাহেলা এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি ঢকঢক  করে পান করল।

 

এদিক-ওদিক তাকিয়ে ভাঙ্গার স্বরে জিজ্ঞাসা করল; “তারপর.. তারপর কি হলো?”

 

রাফি রাহেলার এমন অদ্ভুত আচরণে চমকে গেলেও, সে আবার বলা শুরু করে।

 

– “হঠাৎ সে মন্দিরে উপস্থিত হল দুটি দানব..।”

 

রাফি একটু থেমে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো; “আমার চোখের সামনে মেয়েটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার শরীর থেকে আলাদা করে ফেলল তারা। হাত পা ছিড়ে তাদের ধারালো নখ মেয়েটির বুকের ঢুকিয়ে দিলো হিংস্রতার সাথে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল সেই ছোট্ট প্রাণ। মুহূর্তের মাঝেই সেই নরকীয় শাস্তির অবসান ঘটিয়ে তার আত্মা বেরিয়ে গেল তার ক্ষতবিক্ষত শরীর থেকে। তারপর একজন সেই মৃতদেহটিকে নিয়ে যেতে লাগল। টপটপ করে তাকিয়ে রইল তার মৃত বিশাল চোখ দুটি আমার দিকে। হঠাৎ পিছনের দানবটি আমার দিকে এগুতে লাগলো। জানিনা তখন কি ভাবছিলাম, দৌড়াতে পারলেও চেষ্টা করছিলাম না, হঠাৎ যেন ভয়ও লাগছিল না, কিন্তু এর মানে এই না যে সাহস লাগছিল, নীরবে তাকিয়ে রইলাম সে দানবের দিকে। সে এসেই আমার সেই আহত স্থানে আরেকটি আঁচড় কেটে এক টুকরা মাংস গিলে নিলো। আবার রক্তের বন্যা বইতে লাগলো। পুরো মন্দিরটি রক্তে রক্তাক্ত। স্বপ্নার শরীরের কিছু কিছু অংশ পড়ে রইল সেই রক্তের ফাঁকে। আহত স্থানের যন্ত্রণা এবং ব্যথায় চিৎকার করতে লাগলাম আমি। কিন্তু একটি চিৎকারও যেন বের হয়নি সেই মৃত মুখগহ্বর থেকে।”

 

রাফি থেমে গেল। নজর করে দেখল রাহেলার চোখটির দিকে। আকর্ষণীয় বড় বড় চোখ দুটি থেকে অনবরত পানি ঝরছে। চোখ দুটি যেন রক্তের মতো টকটকে লাল হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। রাহেলার এই কান্নার কারণ, ঠিক বুঝতে না পারলেও নীরবতা সঙ্গে চেয়ে রইল রাফি। কিছু প্রশ্ন জানার ইচ্ছে আছে তার । কিন্তু সেই অশ্রুর  সাগর বইতে যেন বাঁধা দিতে চাচ্ছে না রাফির মন। তাই স্বইচ্ছায় সেই সাগর বইতে দিল রাফি। নীরবতার সাথে শুনলো রাহেলার সেই নীরব চিৎকার।

 

ফজরের আযান দিলে চারিদিক থেকে। রাহেলা চোখ মুছতে লাগলো টেবিলে রাখা টিস্যু দিয়ে। চোখ নিচু করে ভাঙা স্বরে রাফিকে জিজ্ঞাসা করল; 

“মে.. মেয়েটি তোমাকে আ… আর  কি বলেছে?”

  

– “আর কিছু বলেনি সে। যা সে বলেছে আমি আপনাকে সবটুকুই বলেছি। মূলত তার কথায় আপনার এখানে আসা আমার। অনেকদিন যাবত আপনার বই পড়া হয়। কিন্তু কখনো ভাবি নি আপনি এসব ব্যাপারে বিশ্বাস করবেন। তবুও তার কথায় আস্থা রেখে এখানে এসেছি।”

 

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রাহেলার কোন উত্তর না পেয়ে রাফি সেই নীরবতা ভাঙলো।

 

-“আপনি কি জানেন? ম্যাডাম? কি করলে আমি এসব থেকে বের হতে পারব? আর স্বপ্ন কে? আপনি কি তাকে চেনেন?”

 

রাহেলার মুখে ও অঙ্গভঙ্গিতে রাফি এক ধরনের অস্বস্তিকর এবং আতঙ্কিত আচরণ লক্ষ্য করলো। স্বপ্নার নাম শোনার পর থেকে রাহেলার এই অস্বস্তিকর আচরণ রাফিকে  স্তম্ভিত করছে। তাই কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও বলতে পারল না সে।

 

রাহেলা অন্যদিকে তাকিয়ে রাফিকে বলল; “তুমি আজ তোমার বাসায় ফিরে যাও। কোন উপায় পেলে তোমাকে খবর দিব।” 

 

-“গত চার রাত ঘুমাইনি আমি। জানিনা পারবো কিনা আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে। দয়া করে যত দ্রুত সম্ভব একটি উপায় খুঁজে বের করুন। কেননা এবার সেখানে গেলে রেহাই নেই আমার।”

 

রাফি উঠে দাঁড়ালো। এমন সময় রাহেলা বললো; “তোমার ঠিকানা লিখে দিয়ে যাও।”

রাফি টেবিলে রাখা একটি খাতায় তার ফোন নাম্বার এবং বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলো।

 যাওয়ার সময় রাফি রাহেলাকে লক্ষ্য করে বললো; “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমার কথাগুলো শোনা এবং বিশ্বাস করার জন্য।”

 

দরজা খোলার আওয়াজ শুনতেই শায়লা এসে হাজির। সারারাত সে টিভি দেখেই কাটিয়েছে। যদিও রাত জাগার অভ্যাস তার নেই, কিন্তু সে অভ্যাসের থেকেও মূল্যবান তার রাহেলার আদেশ। অবশ্য রাহেলার আদেশকে সে আদেশ বলে নয় বরং আবদার হিসেবে মনোনীত করে। কিন্তু এইটুকু সত্য যে, সে খুবই রাহেলা ভক্ত।

শায়লা রাফিকে দরজা পর্যন্ত নিয়ে যেতে লাগলো।

 রাহেলা নিশ্চুপে বসে সেখানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা চোখের আড়াল হলো। বাহিরে তাকিয়ে দেখল পূর্ব দিকে সূর্যের উদয় হচ্ছে। সেই আলো একটু একটু করে ছড়াতে শুরু করেছে। সেখানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখের অশ্রু ফেলতে লাগল সে। কিছুক্ষণের মাঝেই শুরু করলো কুঁকড়ে কাঁদতে। চেয়ার থেকে মেঝেতে বসে মুখ চেপে, এক ছোট্ট নবজাত শিশুর মত কাদতেঁ লাগলো।

 

সকাল ৯  টার দিকে শায়লা দৌড়ে এসে রাহেলাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো; “আফা? ও আফা? আফা  আফনার কি হইসে?”

 

রাহেলা শায়লার চিৎকার শুনে আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো; “হ্যাঁ? কি হয়েছে? এমন করছিস কেন?”

 

–  “আফনে ফ্লোরে কেন? আপনার চোখ এমন ফুলা কেন? শরীর খারাপ?”

 

রাহেলার মনে পরল, কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি সে। তবুও শায়লাকে এসব বলে চিন্তিত করানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

মেঝে থেকে উঠে বসে সে উত্তর দিল;”হয়তো চেয়ারে ঘুমিয়ে থাকার সময় চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। রাতে ঘুমায়নি তো তাই চোখগুলো ফুলো। নাস্তা তৈরি করেছিস?”

শায়লা উঠে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল; “আমারে এই রুমে আইতে দিবেন না। একদম ভালা হইছে, এমনেই একদিন এহানে পইড়া মইরা থাকবেন। কেউ ফানি দিতেও আইবো না।”

শায়লা  কক্ষটি থেকে বের হতে হতে বলল; “নাস্তা খাইলে চলে আহেন।”

 সারাটা দিন রাহেলার আনমনে কাটিয়ে দিল। বেশ কয়েকদিন থেকে ক্লিনিকেও যাচ্ছে না সে। পায়ের ব্যথাটা একটু একটু করে সেরে গেলেও ক্লিনিকে যাওয়ার ইচ্ছা তার নেই। সারাদিনের ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর করার জন্য ঘুমের ওষুধ গ্রহণ করে একটি আরামের ঘুমের ব্যবস্থা করল রাহেলা।

 

সকালের মিষ্টি রোদে পাখির কোলাহলে ঘুম ভাঙলো রাহেলার। সময় তখন ৬ টা ৩৬ মিনিট। বিছানা থেকে উঠেই হাত মুখ ধুয়ে, দ্রুত নিজ ঘর থেকে বের হলো সে,  সাথে নিয়ে নিলো মোবাইলটি। শায়লার ঘরে গিয়ে দেখল, শায়লা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শায়লার ঘরের দরজা টেনে দিল রাহেলা এবং প্রবেশ করল তার বিশেষ কক্ষে। নিঃশব্দে আটকে দিল সেই কক্ষটির দরজা। ধীরে ধীরে  কয়েকটি তালা খুলে বের করে একটি পুরনো বাক্স। বাক্সটি থেকে বেরিয়ে আসে মেয়ে শিশুর ছোট্ট ছোট্ট অনেকগুলো ব্যবহারের জিনিস। এর মধ্যে রয়েছে ছোট একজোড়া মোজা, কাপড়ের জুতা, জামা, কাঁথা, ছোট্ট একটি দাঁত যা রিং এর বক্সে রাখা, খাতা, পেন্সিল এবং কয়েকটি ছবি এছাড়াও আরও কত কি। রাহেলা সেখান থেকে ঘাটিয়ে একটি ছোট্ট পেডখাতা বের করল। সেখানে অনেকগুলো মোবাইল নাম্বার লেখা। সেখান থেকে খুজে সে একটি নির্দিষ্ট নাম্বার বের করল। সেই নাম্বারে কল দিয়ে কানে ধরল ফোনটি। কিছুক্ষণ পর ফোনের ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো;

– “হ্যালো? “কে বলছেন?”

– “আমি ২০৭ নাম্বার বেডে থাকা  রোগীর গার্ডিয়ান বলছি।”

 

– “আ….২০৭… ও ….স্বপ্নার?”

 

-“জি”

 

– “হ্যাঁ। ম্যাডাম বলুন, কি মনে করে?”

 

– “আপনার যদি সময় থাকে, দেখা করতে চাই। কখন আসব? একটু তাড়াতাড়ি হলে খুব উপকার হয়।”

 

-“জী, ম্যাডাম। অবশ্যই। আপনি আমাদের হাসপাতালে ভিআইপি মানুষ। আপনি চাইলে এখনি চলে আসুন। আমি ফ্রি আছি। আর আপনাকে দেওয়ার মত আমার কাছেও কিছু আছে।”

 

– “আচ্ছা। আমি তাহলে দ্রুত রওনা হচ্ছি।”

 

– “জী । আচ্ছা।”

 

১০ মিনিটের মাঝে রাহেলা বেগম তৈরি হয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে গেল। তাড়াহুড়ায় শায়লাকে বলার সুযোগ পেল না সে, তবে এতে চিন্তার বিষয় নেই। শায়লা এটুকু বিষয়ে মাথাব্যথা করে না। 

নিজের গাড়িতে উঠে নি রাহেলা। রাস্তা থেকে একটি সিএনজি ভাড়া করে নিয়ে, প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালো মানসিক হাসপাতালে।

ডাক্তার ফয়সালের কার্যালয়ের বাইরে অপেক্ষা করছে রাহেলা। সাথে আছে হাসপাতালের ম্যানেজার শফিক সাহেব। রাহেলার সাথে শফিক সাহেবের জরুরী আলাপ প্রয়োজন তবুও সে পরবর্তীতে ডা. ফয়সালের নাগাল পাবে না বলে এখানে অপেক্ষায় নষ্ট করছে অনেক মূল্যবান সময়। প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা কর ফয়সাল এলেন।

 শফিক সাহেব হেসে বললেন; “এই তো, ডাক্তার সাহেব চলে এসেছেন।” 

শফিক সাহেবকে বাইরে রেখে কক্ষে প্রবেশ করলেন রাহেলা।

 

“এই তো দেখছি রাহেলা বেগম এসেছেন”- ফয়সাল হেসে বলল।

 

-“জি। কেমন আছেন?”

-“ভালোই আছি। কিন্তু আপনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কোনোটিই ভালো নেই তা বুঝতে পারছি।”

 

-“আমার আপনার সাথে কিছু জরুরী কথা আছে, ফয়সাল সাহেব।”

 

ফয়সাল সাহেব তার হাতের ঘড়িটি দেখে বলল; “অবশ্যই। তবে এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ করতে হবে। আমার ডিউটি শুরু হতে এক ঘন্টা বাকি।”

 

-“জি,অবশ্যই। আসলে কথাগুলো স্বপ্নাকে নিয়ে। ঠিক ৮ দিন আগে ওর মৃত্যু হয়েছে। তাই না?”

 

-“জি। কিন্তু আপনি যেহেতু সময় করতে পারেননি। আপনার কথামতো ওকে ঠিক ঠিকানা কবর দেওয়া হয়েছিল বলে,আমি জানতাম।”

 

-“না বিষয়টা কবর নিয়ে না। ওর মৃত্যুর পর ওর শরীরে কি কোনো আঘাত ছিল? অথবা কোন অঙ্গ আহত অবস্থায় ছিল?”

 

ডা. ফয়সাল চমকে গিয়ে বললেন; “ওটা সম্পূর্ণ সাধারণ মৃত্যু ছিল। ঘুমের মাঝেই মৃত্যুবরণ করে স্বপ্না। তাহলে আহত হবে কিভাবে? কিন্তু কেন বলুন তো রাহেলা বেগম?”

 

-” না। মানে এমনিই।

 

রাহেলা কিছু ভাবছিল এমন সময় ডা. ফয়সার বলল; “জানেন রাহেলা বেগম, আপনার রোগীর অনেক পরীক্ষা করেছি আমি। কিন্তু সব রিপোর্টই তাকে সুস্থ বলত। তার আচরণ দিনে দিনে খুবই অস্বাভাবিক ও আতঙ্কের হয়ে উঠেছিল। গুন গুন করে কি সব কথা বলত সে, আবার মাঝে মাঝে বলতো তার খুব ভয় করছে, কারা নাকি তাকে  মেরে ফেলবে। আবার কখনো কখনো শরীরে কিছু অঙ্গ দেখিয়ে বলত সেখানে নাকি অনেক ব্যথা করছে। আমাকে ধরে অনেক সময় কান্না কাটি করত, সাহায্যের মিনতি করত। একদিন আমাকে কি যেন আবোল-তাবোল ভুত জিনের কাহিনী বলল। রাতে ঘুমাতে পর্যন্ত চাইতো না সে। আমি ঘুমের ঔষধ দিলে তা ফেলে দিত, লুকিয়ে রাখত। এর কারণে ইনজেকশন দিয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে রাখত নার্সরা তাকে।

ডা. ফয়সাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো; “সবশেষে একটাই কথা আমরা ব্যর্থ, মেয়েটিকে আমরা একটি স্বাভাবিক জীবন এনে দিতে পারিনি।”

রাহেলা নিচুস্বরে বলল; “মৃত্যুর আগের দিন কি হয়েছিল?”

 

ডা. ফয়সাল কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর বললো; “না। মনে পড়ছে না। আসলে অনেক রোগী দেখা হয় তো।”

 

এর মাঝে সমাপ্তি ঘটলো এক ঘন্টার। ডা.ফয়সাল বিদায় জানালো রাহেলাকে। এরপর রাহেলা গেল শফিক সাহেবের সন্ধানে। রাহেলা এবং শফিক সাহেব হাসপাতালে ক্যান্টিনে গিয়ে বসলেন।

 

“আপনার পায়ের কি অবস্থা?” -শফিক সাহেব বললেন।

 

-“হ্যাঁ। এখন বেশ ভালোই আছি। স্বপ্নার বিষয়ে আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।”

 

-“জি। জি। বলুন।”

 

-“মৃত্যুর আগের দিন স্বপ্না কি কোন আলাদা আচরণ করেছিল?এই যেমন- ভয় লাগছে, খালাকে ফোন দিন, বাড়িতে যাব?”

 

-“না। এমন কিছুই করেনি। বরং তার উল্টোটি হয়েছিল সেদিন। সে খুবই শান্ত ছিল। সারাদিন ভরে কি যেন লিখছিল সে। মাঝে মাঝে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল। এমনকি ঘুমাতেও গিয়েছিল সেদিন কোনো রকম ঝামেলা ছাড়া।। ঘুমানোর আগে আমায় দিয়ে গিয়েছিল একটি চিঠি। তারপর বললো আমি যেন চিঠিটা না পড়ি। ওটা যেন সরাসরি আপনাকে দেওয়া হয়। কঠিন ছিল সেই ভাষা এবং কণ্ঠস্বর। এটাও বলেছিল যদি চিঠিটি আমি পড়ি অথবা আপনাকে না দেই তাহলে আমার উপর দাবি সে কখনো ছাড়বে না। কথাগুলো শুনে অবাক হলেও এখন মনে  হচ্ছে যেন সে আগে থেকেই জানতো এটাই তার শেষ রাত।”

 

শেষ কথা বলে শফিক সাহেব তার চশমাটা খুলে দু’ফোটা পানি মুছে, শার্টের পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ রাহেলা বেগমকে দিল।

 

রাহেলা বেগম কাগজটি নিয়ে বলল; “ধন্যবাদ সপ্নার দেখাশুনার জন্য।”

 

-“না। আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। স্বপ্নাকে একটি সুস্থ্য জীবন ফিরিয়ে দিতে পারিনি। কিছুটা অস্বাভাবিকতা থাকলেও সে খুবই লক্ষী এবং ভদ্র ছিল। দেখতে বেশ আপনার মত, বিশেষ করে চোখ দুটি। বোঝাই যায়না আপনার বোনের মেয়ে সে, বরং মনে হয় যেন আপনি তার মা। বোধহয় আপনার ও আপনার বোনের মুখের  মিল আছে, তাই না?”

 

রাহেলা এড়িয়ে গিয়ে বলল; “আজ তবে উঠি, শফিক সাহেব।”

 

রাহেলা একটি সিএনজি নিয়ে বাড়ির পথে রওনা না হয়ে একটি ছোট্ট লেকে গেল। সবচেয়ে নিরব জায়গাটি খুঁজে নিয়ে বসলো সে। বেঞ্চের এক কোণে বসে  চিঠিটি বের করল রাহেলা।

চিঠিটি এমনভাবে লেখা-

 

“প্রিয় মা,

আমি তোমার সপ্না। তোমায় দেখিনা বহুদিন হলো। আশা করি ভালো আছো। আমি সব সময়ের মতই আছি। হয়তো কাল হতে এই নরক, যাকে তোমরা জীবন বলো তা থেকে রক্ষা পেতে চলেছি। তবুও জানি না কেন, খুব ভয় লাগে মৃত্যুকে। এখন ভাবছো আবার আবোল তাবোল কি বলছি, তাই না? আচ্ছা, বাদ দেওয়া যাক এই বিষয়টি।

মা জানো? তুমি যেমন অনেক রিসার্চ করো, আমিও একটি রিসার্চ করেছি। আজ বা কাল নয় প্রায় কয়েক বছর ধরে  রিসার্চটি, আমি করছি। রিসার্চটির নাম আমি দিয়েছি ‘রাহেলা বেগম’। এই রিসার্চটা আমি তোমায় নিয়ে করেছি। অনেক অজানা জানতে পেরেছি, অনেক জানাকে ভুল প্রমাণিত করেছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে রিসার্চের শেষ দিন চলে এসেছে। তাই ফলাফলও আজি দিতে চাই। যদিও তোমাকে সরাসরি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু মনে হয় না সেই সৌভাগ্য আর হবে। তাই চিঠিতেই জানাচ্ছি।

তুমি বেশ আগে থেকেই রিসার্চের প্রতি আকর্ষিত ছিলে। বিজ্ঞানী হওয়া ছিল তোমার জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু নানা তা মেনে নেয়নি। তার স্বপ্ন ছিল তোমাকে একজন ডাক্তার হিসেবে দেখবে, তার সেই সম্মানিত স্থানে। তবুও একটি সুযোগ তোমাকে নানা দিয়েছিল। বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের  মাঝে  প্রতিযোগিতা যেটি প্রতি দশ বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যদি তুমি প্রথম স্থান দখল করো, তাহলে নানা তোমাকে তোমার স্বপ্নে হাঁটতে সাহায্য করবে। তখন তোমার পরিচয় হয় মি. রুবেলের সাথে। তোমাদের মাঝে গড়ে ওঠে আত্মার সম্পর্ক। তোমরা বেশ সুখী ছিলে একসাথে, বিয়েও করেছিলে তোমরা লুকিয়ে। আমার নানা-নানি তা জানতো না। কিন্তু তোমার সেই প্রতিযোগিতার কিছুদিন আগে হারিয়ে যায় মি. রুবেল। তুমি অনেক খোঁজো তাকে কিন্তু কোথাও তার নাম নিশানা খুঁজে পাওনি। কেননা যে নিজ ইচ্ছায় হারিয়ে যায় তাকে আবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তারপর হারিয়ে যায় তোমার সেই রিসার্চ এর ফর্মুলা। প্রতিযোগিতার দিন এগিয়ে আসে কিন্তু তোমার রিসার্চের কোনো সন্ধান খুঁজে পাওয়া যায় না। পরবর্তীতে তোমার সকল সন্ধানের খোঁজ মিলে সেই প্রতিযোগিতার দিন। মি. রুবেল বিজয় অর্জন করে তোমার সেই রিসার্চের ফর্মুলা নিয়ে। পিছনের রয়ে যাও তুমি। তোমার ৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি সেই খোঁজ হারিয়ে যায় নিমিষে। মি. রুবেল যার সাথে কিনা সারা জীবন পাড় করার কথা ছিল, সে আজ তোমারই প্রতিপক্ষ হয়ে পরিণত হয়েছে এক ধোঁকাবাজে। কিন্তু তুমি তার কোনো প্রতিবাদ করতে পারলে না, কেননা তোমাদের বিয়েতে ছিল না কোনো ধরনের আইনি প্রমাণ। পাশাপাশি নানাও নিয়ে ফেলে তার কঠিন সিদ্ধান্ত। তুমি হারিয়ে ফেলো বিজ্ঞানী হওয়ার সে উপায়টি। হারিয়ে ফেলো তোমার সেই জীবনসঙ্গীকে। কিন্তু সাহসিকতা নিয়ে তুমি সব ভুলে শুরু করো নতুন করে আবার একটি জীবন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের সমাপ্তি ঘটেনি তোমার, সেই সুন্দর নতুন জীবনের সূচনার পূর্বেই হারিয়ে যায় শূন্যতায়। কারণ আমি যে তখন তোমার গর্ভে একটু একটু করে বাসা বাঁধতে আরম্ভ করে দিয়েছিলাম। নানা-নানীর শত বাধা পেরিয়ে তুমি আমাকে দুনিয়ার আলো দেখানোর সিদ্ধান্ত নাও। কিন্তু সমাজের দেয়া নোংরা নাম যেন তোমাকে একটু একটু করে শাস্তি দিতে আরম্ভ করলো। ২২ বছর বয়সী নারী, যে কিনা তখন নিজ স্বপ্ন গড়ার পথ খুঁজবে, সুন্দর একটি জীবনের স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু তুমি কিনা বেছে নিলে এক যুদ্ধের মঞ্চ। মায়ের যুদ্ধ, সমাজের সাথে যুদ্ধ এবং নিজ সম্মানের জন্য যুদ্ধ। সমাজের থেকে রক্ষা করতে নানা-নানি তোমাকে পাঠিয়ে দিল নতুন এক শহরে। যেখানে কেউ তোমাকে চিনবে না, কেউ তোমার অতীত নিয়ে ভাববে না। পাশাপাশি নানা-নানি আরো একটি শর্ত দিলো তুমি যেন তোমার সন্তানকে সমাজে নতুন পরিচয় গড়ে তোল। তাই মা থেকে তুমি পরিণত হলে আমার খালায়। মি. রুবেলকে শাস্তি দিতে তুমি আবার শুরু করার রিসার্চ। কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তুমি সফল হও। তিলে তিলে মৃত্যু এনে দাও মি. রুবেলের। কিন্তু সেই দানবগুলো পড়ে যার রক্তের এবং মাংসের লোভে। তুমি সব ভুলে নিজের নতুন জীবন আবার আরম্ভ করলেও দানবগুলো থামল না। তারা শত শত মানুষকে এভাবে শাস্তি দিয়ে তিলেতিলে মারতে মারতে স্বাদ গ্রহণ করতে থাকলো তাজা রক্তের ও মাংসের। শত শত মানুষের মাঝে এক শিকার ছিল তোমারই ১২ বছর বয়সী মেয়ে স্বপ্না । তোমাকে বারবার বলার চেষ্টা করলেও তুমি এসব বিষয় নিয়ে সবসময় এড়িয়ে যেতে। তোমার একটাই কথা ছিল, ‘এগুলো সব দুঃস্বপ্ন’। এভাবেই কাটতে থাকে সময়, সাথে সাথে বাড়তে থাকে আমার ভয় ও পাগলামি। আমার পাগলামী দেখে ১৩ বছর বয়সে মানসিক হাসপাতালে রেখে এসো তুমি। কিন্তু ঠিক আমি হয়নি, কেননা আমি তো মানসিক রোগীই ছিলাম না।

মা এটাই ছিল আমার রিসার্চ। জানিনা তুমি এবারও বিশ্বাস করবে কিনা। তবে একটা কথা মনে রেখো, তুমি যা শুরু করেছো তার শেষ আজও হয়নি। অনেক বছর আগে তোমার সেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত, আজও এক বড় ভুল। আজ শত শত মানুষ সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত দিচ্ছে বছরের পর বছর নরকীয় যন্ত্রণা ভুগে। ভুগছে ভয়ঙ্কর শাস্তি অপরাধহীন হয়ে। তারা মানুষকে একবারে মারে না। মারে অসহ্য যন্ত্রণা দিতে দিতে। সেই ভয়ঙ্কর শাস্তি তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না আমি। হাত-পায়ে আচর মেরে মাংস কেড়ে নেয় শরীর থেকে। কিন্তু ঘুম ভাঙলে দেখি সেই ক্ষত, আঘাতের চিহ্ন আর নেই। তবে যন্ত্রণা যেন ছটফট করছে পুরো শরীর। সারাক্ষণ যন্ত্রণায় নিশ্চুপে কাঁদতে হত। কেননা সেই ক্ষত তো আর দেখা যায় না, যে মলম লাগাবো। প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তির নিষ্ঠুর ভাবে মৃত্যু সেখানে আমি দেখেছি স্বচক্ষে। তবে আজ সেই মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতে হবে আমার।

প্রিয় মা, হয়তো আমার জন্যই  এত ক্ষত তোমার মাঝে ছিল, হয়তো আমার জন্যই মাঝেমাঝে দুর্বল হয়ে পড়তে তুমি। মি. রুবেল তোমার জীবন থেকে চলে গেলেও আমার চিহ্ন সে রেখে গিয়েছিল তোমার মাঝে। তাই হয়তো ক্ষোবের বশে এই পথ বেছে নিয়েছিলে তুমি। তোমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার নাম স্বপ্না কেন? তুমি বলেছিলে, আমি তোমার কাছে স্বপ্নের মতো। সেদিন আমি খুব খুশি ছিলাম তোমার উত্তর পেয়ে। তবে আজ আমায় একটি উত্তর খুব তাড়া করে, আমি কি তাহলে তোমার দুঃস্বপ্ন ছিলাম?

 

মা, শেষ একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে খুব ইচ্ছে করছে। তোমাকে কখনো আমি কাঁদতে দেখিনি। যত বাধা, বিপত্তি, বিপদ, ধোকা, প্রতারণা হোক তুমি কখনো কাঁদোনি। তুমি ছিলে অনেক সাহসী নারী, যাকে কেউ কাঁদাতে পারে না, যার কান্না কেউ দেখতে পারে না। তার অশ্রু যেন বিলুপ্ত কোন প্রাণীর মতো, যা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কি আমার মৃত্যুও তোমাকে কাঁদাবে না?  তুমি কি কাঁদবে আমার জন্য, মা?

 

ভালো থেকো।

তোমার স্বপ্নের

 স্বপ্না”

 

রাহেলা চিঠিটিকে বুকে আঁকড়ে ধরে মরণ কান্না শুরু করল। চিৎকার করে কাঁদতে লাগল সে। পৃথিবীতে এক মায়ের কাছে সন্তানের মত মূল্যবান আর কিছুই। যত যাই হোক, পৃথিবী উল্টে পড়ে গেলেও, মা তার সন্তানকে ভালবাসবে তার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। আর এটাই প্রকৃত সত্য। আর সেই সন্তানের মৃত্যু যে মা দেখলো সে হলো পৃথিবীর সবচাইতে অভাগী, দুঃখী।  শত বাধা পেরিয়ে, পৃথিবী কে তুচ্ছ করে, নিজের স্বপ্নের বিসর্জন দিয়ে, সমাজের নোংরা অপবাদকে এড়িয়ে- দীর্ঘ নয় মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছিল এই রাহেলা। একটাই তার কারণ ছিল, তার সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখাতে চায় সে। কিন্তু সেই সন্তানকে যেন সে আজ অন্ধকারে ফেলে দিয়েছে  নিজ হাতে। নিজ অজান্তে শত শত অশ্রু জড়িয়েছে তার স্নেহের সন্তানের।

 

পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে কাঁদে না। আমরা সবাই কাঁদি। মানুষের বেদনা, দুঃখ, ভয়, যখন তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে, তখন আর মস্তিষ্ক কাজ করেনা। মস্তিষ্ক কোনো কথা বলে না। তখন কথা বলে হৃদয়। আর হৃদয়ের ভাষায় একটিই। সেটি হল অশ্রু। চোখের প্রতিটি ফোটায় লুকিয়ে থাকে হাজারো বেদনার গল্প। আর সেই ফোঁটাগুলো গড়িয়ে একটু একটু করে হালকা করে মানুষের শরীরকে। তবে এই নিয়ম দুই দলের মানুষ, দুই ভাবে পালন করে। এক ধরনের মানুষ কাউকে বলে, কাঁধে মাথা রেখে, অশ্রু ছাড়ে। আর আরেক দলের মানুষ- নীরব কোন কোণে বসে নিরবতার সাথে অশ্রু ছাড়ে, যেন কেউ তাকে অসহায় না মনে করে। রাহেলা দ্বিতীয় দলের লোক। যেদিন রুবেল তাকে ছেড়ে গেল, বিজ্ঞানী হওয়ার সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেল, সমাজের নোংরা নামে যখন রাহেলাকে ডাকতে লাগল, স্বপ্না মারা গেল- সবগুলো দিনেই রাহেলা ছিল খুব অসহায় এবং দুর্বল। মরণ কান্না কেঁদেছিল অগনিত বার। তবে কেউ তার শব্দ শুনতে পায়নি। বালিশ মুখে দিয়ে সে কেঁদেছিল নিঃশ্বাস বন্ধ করে। কেউ তার আলাপ পাইনি, বুঝতে পারেনি। তবে আজ সন্তানের শোক যেন তাকে দিয়েছে সব ভুলিয়ে নিমিষেই। আজ সে চিৎকার করে কাঁদছে খোলা ময়দানে। তবে কেউ যেন পাশে এসে হাতটা ধরার নেই তার। নেই বলার, আমি পাশে আছি। এমন কেউ নেই, যাকে নিজের গল্পটুকু সে বলেছিল ভয়হীন হয়ে। তাইতো তার জীবনের অতীত মুছে ফেলতে চেয়েছিল সে।  কিন্তু অতীত যেন তাড়া করে বেড়ায় রাহেলাকে আজও। 

প্রায় ১৫ মিনিট পর নিজ থেকেই থামল রাহেলা। নিঃশ্বাসগুলো বড় বড় হয়ে আসছে তার। নিঃশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। চারিদিকে ঘেরা গাছগুলো যেন আজ অক্সিজেন কম দিচ্ছে তাকে। চারিদিকের সবকিছু যেন অভিমান করে আছে তার প্রতি। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে নিজ থেকে হাত মুখ ধুয়ে, পানি পান করল সে। রুমাল দিয়ে মুখ মুছলো। দীর্ঘ দুটি নিঃশ্বাস নিল। এভাবেই সারা জীবন কাটিয়েছে রাহেলা। জীবনের দীর্ঘ রাস্তায় বারবার পড়েছে সে, আবার নিজ থেকেই দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু  করেছে পিছু না ফিরে। কিন্তু  কখনো পাশে ছিল না কেউ, ছিলোনা তার কান্না শেষে চোখদুটি মুছে দেওয়ার, সান্তনা দেওয়ার। সারাটা জীবন একাকীত্বতার সাথে পথ পাড়ি দিয়েও কখনো জীবনের প্রতি অভিমান করে নি সে।তার ভঙ্গি এমন ছিল যেন কখনো ব্যর্থতার স্বাদ, সে গ্রহণ করেনি। ভেবেছিলে এটাই হয়তো জীবন। এটাই জীবনের নিয়ম। তাই তো  প্রতিটি ক্ষণে তার সঙ্গ করে নিয়েছিল তার সুপরিচিত বন্ধু একাকীত্বতা। আর নির্দ্বিধায় তাকে গ্রহণ করেছিল  রাহেলা।

 

তবে আজ রাহেলার দুর্বল দিকটি বেশিক্ষণ বাইরে রইল না। দ্রুত উঠে রওনা হলো বাড়িতে। গাড়িতে বসেই ফোন দিল রাফিকে। আজকের মাঝেই একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে রাহেলার। বাড়িতে এসে দেখল, রাফি তার আগেই পৌঁছে গেছে রাহেলার বাড়িতে। পাঁচ দিন থেকে এক পলক ঘুম তার চোখে জোটেনি। চোখদুটি যেন কালো এক গর্তে আটকে পড়েছে, এমন অবস্থায় রাফির। কিছুক্ষণ পরপর ঝিমিয়ে পড়লেও রাহেলার করা কথা, রাতে ঘুমাতে পারবে না। কেননা  আজ যদি রাতে ঘুমিয়ে যায়, তাহলে সেই ঘুম ভাঙবে না কোনোদিন। রাফিকে শায়লার সাথে রেখে, নিজেকে তার সেই বিশেষ কক্ষে বন্দি করে নিল রাহেলা। না খেয়ে, না বিশ্রাম নিয়ে, সারাদিন সেই কক্ষেই রইলো সে। সেই বিশেষ কক্ষে লুকোনো আছে একটি ছোট্ট ঘর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরনো অনেক স্মৃতি। পুরানো সেই জিনিস গুলোর মাঝে খুজে নিল তার প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আর শুরু করল তার অক্লান্ত পরিশ্রম।

সারাদিন কাজে মগ্ন হয়ে, একটি  উপায় খুঁজে পায় রাহেলা। তখন বাজে রাত ১:৩০ মিনিট। রাহেলা দ্রুত চলে শায়লা ও রাফির সন্ধানে। রাফির অবস্থা আগের মতই। কোনভাবেই নিজেকে সামলে নিয়ে বসে আছে সে। শায়লা টিভি চালিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। রাহেলা যত দ্রুত সম্ভব রাফি কে সব বুঝিয়ে দিল। রাহেলা উপায় খুঁজে পেলেও এর মুক্তির পথ খুঁজে নিতে হবে রাফিকেই। যদিও শায়লা বেশি কিছু জানে না, তবুও সে এইটুকু বুঝতে পেরেছে রাফি বিপদে রয়েছে। তাই শায়লার অনুরোধে রাফিকে ওযু এবং কালেমা পড়ানো হলো ঘুমানোর পূর্বে। রাফি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুয়ে পড়লো বিছানায়। বিছানায় মাথা রাখতেই, সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো মুহূর্তে। শায়লা বিছানার পাশে কোরআন পাঠ করতে আরম্ভ করল রাতের জন্য। এবং রাহেলা  মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকল।

দু’ঘণ্টার মাঝে রাফি পৌঁছে গেল সেই দানবের আড্ডা খানায়। ঘড়িতে তখন ঠিক রাত তিনটা বেজে এক মিনিট। সেখানে পৌঁছেই রাফির চোখে পড়লো এক আলাদা দৃশ্য। আজ সেখানের গাছগুলো আর স্থির নেই। হঠাৎ যেন তাদের শাখা প্রশাখা দিয়ে ঘিরে ফেলছে রাফির পুরো শরীর। রাফির আশ্রয় নেওয়া সেই গাছটির আকার আরও বৃদ্ধি পেতে আরম্ভ করলো। পায়ের নিচের মাটিও হঠাৎ কাঁপতে শুরু করলো। রাফি সেই স্থান থেকে  সরে যেতেই সামনাসামনি হলো সেই দানবগুলোর। পেছনে তাকিয়ে দেখল গাছের সেই স্থানটির মাটি যেন ঘোষে পড়ে যাচ্ছে।  দানবগুলো এগিয়ে আসছে। আর কোনদিকে  মন না দিয়ে রাফির দৌড়ে গেল বাংলোর সামনে। সেই বাংলায় রাফির ঢোকা হয়নি কখনো। বাইরের পরিবেশ থেকে ভেতরের পরিবেশ আরো ভয়াবহ হবে তা রাফি আগে থেকেই জানতো। কিন্তু কাছে গিয়ে সে যেন এক আলাদা চিত্র ফুটে তার চোখে। সামনে যেন কোনো দানব এর বাড়ি নয় বরং বিলাসবহুল কোনো  হোটেল সেটি। স্বপ্নার সাথে যেদিন এই পথ অতিক্রম করছিল রাফি, তাড়াহুড়ার ফলে এসবের উপর লক্ষ করতে পারেনি সে। তবে আজ যেন মুগ্ধ করছে রাফির চোখ এই দৃশ্যে। হলুদ রঙের বড় বড় বাতি জালানো সেই বাংলোয়। লাল কার্পেটে পরিপূর্ণ সেখানের ময়দান, ফুল দিয়ে সাজানো চারিদিকে, কিছু মানুষ হাসাহাসি করে গল্প করছে আরামের ভোজনের সাথে। রাফি ভেতরের দরজায় প্রবেশ করা মাত্রই হারিয়ে গেল সেই সকল দৃশ্য। হারিয়ে গেল সেই বাতি, ফুল এবং  মানুষ ও সকল কিছু। চোখের সকল ধোকা দিয়ে সেই স্থান পরিণত হল অন্ধকার একটি শীতল ঘরে। চারিদিক থেকে ভেসে আসছে অসহ্যনীয় দুর্গন্ধ। কিছু দূরে রাফি একটি জ্বলন্ত মোমবাতি দেখতে পেল। ভয়ের সাথে সেই মোমবাতি হাতে নিয়ে হাঁটতে লাগলো রাফি। হঠাৎ যেন পিছন থেকে খুব দুর্গন্ধ ভেসে এলো তার নাকে। পিছন থেকে কিছু একটি কাছে আসার শব্দ শুনতে পায় রাফি। কিন্তু পেছনে ফেরার পূর্বেই তার পিঠে আচর মারল এক দানব। পিছনে না ফিরে কোনো চিৎকার না করে রাফি এগুতে লাগলো রাহেলার কথামতো। রাহেলা বলেছিল “তুমি ভয় না পেয়ে ওদের দিকে না তাকিয়ে, চিৎকার না করে এগিয়ে যাবে। দেখবে ওরা তোমার পেছনে আসবে না, কিন্তু খবরদার দৌড়াবে না।” পিঠ থেকে ঝর ঝর করে রক্ত বইতে লাগল রাফির। চোখ দিয়ে বেয়ে বেয়ে পানি ঝরছে যন্ত্রণায়, কিন্তু চিৎকার করা যাবে না তার। যেভাবেই হোক রাফিকে দোতালায় যেতে হবে। ততক্ষণ এমন যতো আঘাত হানুক থামা যাবে না তার এক মুহূর্তের জন্য। রক্ত সহকারে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতেই আবার সেই বাতিগুলো জ্বলে উঠলো। আবার সেই স্থান পরিণত হলো মুগ্ধ করা দৃশ্যে। তবে মানুষগুলো পরিণত হল দানবে। চেয়ারে বসে থাকা দানবগুলো চোখ পরল রাফির দিকে। রাফির মাংস ও রক্তের লোভে দৌড়ে এল তারা, রাফি কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে দৌড়াতে লাগলো। কিন্তু রাফির পায়ের নাগাল পেয়ে আঁচড় দিতে লাগল তারা নিষ্ঠুরভাবে। তিন চারটি পায়ের নখ উল্টে গেছে রাফির। পায়ের কিছু টুকরো মাংস  ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেই সিঁড়িতে। তবুও সে পিছনে ফিরে তাকায় নি একবারও। সব দানব ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন অবস্থায় যখন রাফি দোতালায় প্রবেশ করে। হঠাৎই সকলে থেমে গেল শৃঙ্খলতার সাথে। তাদের নিয়ে কোনো চিন্তা না করেই, রাফি এগুতে লাগলো। দোতলার প্রায় শেষ প্রান্তে একটি দরজা দেখতে পেল সে। সেখানে প্রবেশ করল রাফি। ভেতরে বসে আছে এক বিশাল  দানব। কি ভয়াবহ সেই দানব! পুরু কিউটিকলযুক্ত শরীরের তার। হাত পায়ের নখ গুলো বিশাল ও নোংরা। সম্পূর্ণ কচকচে কালো গায়ের রঙ তার। ভয়ঙ্কর চোখগুলো  রক্তের মতো লাল। উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট লম্বা সেই দানবটি। বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল অন্য এক দিকে, হঠাৎ তার চোখের মনি পরলো রাফির দিকে। সেই চাহনিতে রাফির হাত পা ঠান্ডা হতে লাগল। শরীর যেন থরথরে কাঁপতে লাগলো তার। ছোট্ট শরীরের অধিকারী একটি সাধারণ মানুষ কি করে মারবে এত বড় ভয়ঙ্কর দানবটিকে? এই চিন্তায় একটু একটু করে ঘামাতে লাগলেও, মুখে নেই সেই ভয়ের চিহ্ন। চোখে চোখ রেখে সাহসিকতার সাথে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাফি। দানবটি এগুতে লাগলো কিন্তু রাফি পিছপা হলো না। দানবটি গর্জে উঠল ভয়ঙ্করভাবে। রাফি ভয় না পেয়ে এবার এগোতে লাগলো বীরের মতো। দুজন সামনাসামনি হয়ে পরল মুহূর্তে। ভয়ঙ্কর সেই দেহে আক্রমণ করতে লাগল রাফি তার সকল শক্তি দিয়ে। কিন্তু সেই আক্রমণে যেন এক বিন্দু পরিমানও পরিবর্তন হলো না সেই দানবের। রাফি গর্জে উঠে আবার আক্রমণের চেষ্টা করতে গেলেই দানবটি তাকে আচর মারতে আরম্ভ করে। কিছুক্ষণের মাঝেই রাফি পড়ে যায় মাটিতে। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন ঘন হয়ে আসতে থাকে মুখ দিয়ে। প্রতিটি অঙ্গের কোণে কোণে ভয়ঙ্কর ক্ষতের দাগ তার শরীরে। রক্ত মাখা সেসব স্থান। কিন্তু এখন কি হবে? রাফি তো মাটিতে শুয়ে পড়েছে, দানবটি অগ্রসর হচ্ছে রাফির দেহকে চিবানোর জন্য। কিভাবে সে তার জীবন রক্ষা করবে? হঠাৎ রাফি  সেই কক্ষের এক কিনারায় ভাঙা দেয়ালের গুহা দেখতে পেল। ভাঙ্গা দেয়ালের ওপাশে আশ্রয় নেওয়ার চিন্তা করে রাফি একটু একটু করে এগুতে লাগলো। কিন্তু পা উঠিয়ে দৌড়ানোর সময়ও নেই তার। কোনোভাবে বুকে ভর করে সেখানে কাছাকাছি গন্তব্যেপৌঁছালো সে। কিন্তু তখনই পেছন থেকে আঁকড়ে ধরল দানবটি তার হাত। রাফি সকল শক্তি দিয়ে দানবটি থেকে তার শরীরকে ছাড়তে চাইলেও শারীরিক শক্তিতে  পেরে উঠলো না সে। রাফির ধ্বস্তাধ্বস্তির  মাঝে দানবটি রাফির একটি হাত ভয়ঙ্করভাবে  ছিড়ে ফেলল হিংস্রতার সাথে । চিৎকার করে উঠল রাফি। তার হাতের থেকে ঝরঝরিয়া অফুরন্ত রক্ত ঝরতে লাগল। রাফির সারাদেহ রক্তে ভিজে গেল। দানবটি রাফির সেই রক্ত ভরা হাতে দৃষ্টি নিবন্ধ করলে, রাফি সুযোগ নিয়ে ঢুকে যায় সেই দেয়ালের ফাঁকা স্থান দিয়ে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে, রাফি সেই ফাঁকা স্থান দিয়ে পড়ে যায় দোতলা থেকে। মাটিতে পড়তে রাফির একটি পায়ের কব্জি ভেঙ্গে গেল। তার হাত হতে রক্ত বের হচ্ছে সজোরে। দ্রুত দেহের গেঞ্জিটি খুলে বেঁধে দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করলো রাফি। চারিদিক ভালোভাবে দেখতে লাগল হতভম্বের মত। চারিদিকে মানুষের শরীরের কিছু অংশ, হাড় এবং  দেয়ালে রক্তে থৈথৈ করছে। রাফি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পায়ের কব্জিটি ভেঙ্গে যাওয়ায় সে হাঁটতে পারছে না। সে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল কিছুটা সামনে একটি আলমারি। সেখানে করাত, ড্রিল মেশিন ছুরি কাঁচি, বঠি প্রভৃতি সরঞ্জাম সাজানো।  সকল ব্যথা-যন্ত্রণা উপেক্ষা করে রাফি উঠে দাঁড়াল। সে অনুভব করল, তার  বাম পাটি আর হাঁটার যোগ্য নয়। কিন্তু এখন থেমে থাকার সময় নেই তার। তাই হাঁটার অযোগ্য  পা টিকে টেনে টেনে সেখানে গিয়ে পৌঁছালো সে। আলমারি থেকে বেছে সবচেয়ে ছোট ছুরিটি সে হাতে নিয়ে নিল। তারপর লুকিয়ে পরল সেই আলমারির পিছনে। থর থর করে কাঁপছে রাফির পুরো শরীর। তার হৃদয়ের স্পন্দন যেন শতগুণ বেড়ে গেছে। ভীতির কবলে সে যেন কিছুই ভাবতে পারছে না আর। শরীরের ক্ষতস্থানগুলো ভয়ংকর যন্ত্রণাও  যেন তাকে  একপলক ছুঁতে পারছে না। সে শুধু এইটুকুই ভাবছে যে,  কিছুক্ষণের মাঝেই সেই দানব উপস্থিত হবে এখানে। আর যদি সে দানবটিকে  হারাতে না পারে তাহলে তাকে হার মেনে মৃত্যুর পথে অগ্রসর হতে হবে আজই। তবুও এক বিন্দু পরিমান সাহস হয়ে উঠছে না তার। তখনই গর্জন দিয়ে প্রবেশ করল সেই দানবটি। তার ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বর দিয়ে চিৎকার করে গর্জিয়ে খুঁজতে লাগল রাফিকে।  মুহূর্তের মাঝে সে আলমারি আছাড় মারতেই খুঁজে পেল মৃত্যুর ভয়ে ভীত, রক্তাক্ত এবং মারাত্মক আহত রাফিকে। রাফি হাতের ছুরিটি দিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করলেও তার হাত যেন অকেজো হয়ে পড়েছে ভয়ের কারণে। দানবটি তার ভয়ঙ্কর হাত দিয়ে রাফির বুকে তার বিশাল নখগুলো ঢুকিয়ে দিবে।ঠিক এমন সময়, পেছন থেকে কে যেন দানবটির পিঠে মাঝারি আকারের পাথর ছুড়ছে। রাফি মাথা সরিয়ে দেখল, ওপাশে প্রায় ১০-১২ বছরের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে তার কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থামছেনা সে। পিছপা হচ্ছে না তার ছোট্ট দেহটি। রাফির দিকে লক্ষ্য করে ছেলেটি ভাঙা স্বরে বলল; “পালাও”

রাফি তার কোনো উত্তর না দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই ছেলেটির দিকে। কি অসাধারণ এই ছোট্ট ছেলেটি! কোথা থেকে এসেছে এই ছেলের এত সাহসিকতা? আর তার হৃদয় এত বিশাল কি করে হতে পার? অন্যের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও সে দ্বিধাবোধ করছে না। 

দানবটি রাফিকে ফেলে গর্জিয়ে দৌড়ে গেল সেই ছেলেটি প্রাণ নিতে। হঠাৎ ছেলেটির অশ্রুভরা চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। চিৎকার করে সেও সেই দানবটিকে হত্যা করতে হামলা করতে লাগলো। কিন্তু মুহূর্তেই ছোট্ট ছেলেটাকে মাটিতে আছাড় মারল দানবটি। শরীরের কয়েকটি হার ভেঙে গেলেও সে যেন এখনো ছটফট করছে দানবটিকে আক্রমণ করার জন্য। দানবটি মাটি থেকে ড্রিল মেশিন হাতে নিয়ে এগুতে লাগল ছেলেটির দিকে।

ছোট্ট শিশুর এত সাহসিকতা দেখে রাফি নিজের প্রতি ধিক্কা জানিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তার মনের মাঝে গেঁথে থাকা সকল ভয় যেন নিমিষেই হারিয়ে গেল, ভয়ঙ্করভাবে আহত শরীরে হঠাৎ যেন ফিরে পেল তার সকল শক্তি, জমে থাকা হাতটি এখন হিংস্র হয়ে উঠেছে এবং অশ্রু ভরা চোখ থেকে বের হচ্ছে ধাউধাউ আগুন। রাফি দৌড়ে গিয়ে দানবটির পিঠে ছুরি চালানো আরম্ভ করলো।  দানবটির শরীরের চামড়া ফেটে বেরোচ্ছে তরল কালো রক্ত। চিৎকার করতে লাগলো দানবটি। রাফির দিকে ফিরে তাকিয়ে আক্রমণ করতে লাগলো সে। কিন্তু রাফি কোনো ক্রমেই থামাচ্ছে না তার হামলা। আবার রক্ত ঝরতে লাগলো রাফির শরীর থেকে। কিন্তু কিছুতেই থামাতে পারছে না রাফিকে সে। তবে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে রাফির শরীর একটু একটু করে কান্ত ও আয়ত্ত্বহীন হয়ে পরছে। এমন সময় ছোট ছেলেটি বিশাল একটি কুড়াল এনে কোবাতে করতে লাগলো দানবটির পায়ে। চিৎকার করতে করতে  দানবটা ধপাস করে পড়ে গেল মাটিতে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে দানবটি। দানবটির স্থির অবস্থা দেখে ছেলেটি মাটিতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগল ছেলেটি। 

 

“তুমি ঠিক আছো?”

 

ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল; “হ্যাঁ”

 

রাফি তার ভাঙ্গা পা টেনে টেনে সেখানে থাকা আগুনের মাঝে একটি রড বসিয়ে ছেড়ে দিল। দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো রডটি। পাশে বসে পরলো রাফি। হঠাৎ যেন শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে অনুভব করতে লাগলো সে। প্রতিটি অঙ্গ যেন চিৎকার করছে যন্ত্রণায়। অনেক রক্তক্ষরণ হওয়াতে চোখ মুখ আধার হয়ে যাচ্ছে তার। রক্তক্ষরণ বন্ধ হলেও শরীরের প্রত্যেকটি স্থান যেন দাউদাউ করে জ্বলছে তার। দেয়ালে মাথাটা দিয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিতে চেষ্টা করল রাফি। ছেলেটি উঠে রাফির পাশে এসে বসলো। 

 

-“ভাইয়া  দানবটা কি মরে গেছে?”

 

-“না। যেকোনো সময় উঠে আক্রমণ করতে পারে, প্রস্তুত থেকো।”

 

-“তুমি চিন্তা করো না। আমি এক্ষুনি ওকে মেরে ফেলছি।”

 

ছেলেটি আবার উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু রাফি তাকে বাধা দিয়ে বলল; “দানবটি এভাবে মরবে না। ওর নিঃশেষ আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই করছি।”

 

ছেলেটি চুপ করে দাড়িয়ে রইল। রাফি নিজ থেকে আবার বলল; “তুমি অনেক সাহসী।”

 

ছেলেটি কিছুই বলল না। মুচকে  মুচকে হাসতে লাগল মুখ লাল করে। ছেলেটির মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে না যে, সে কত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। যেহেতু সে দানবটির বাংলোয় প্রবেশ করতে পেরেছেন সেহেতু অবশ্যই সে ততটাই শাস্তি ভোগ করেছে যতটা করেছে রাফি। তবুও ভয়হীন মুখখানা যেন সকল সত্যকে  মিথ্যা প্রমাণ করে দিচ্ছে। 

রাফি উঠে দাঁড়ালো। অত্যন্ত গরম রডটিকে ছোয়ার জন্য কোন একটি আস্তরণ খুঁজতে লাগল সে। ছোট্ট ছেলেটিও সঙ্গ দিল তার। স্থিরতা নেই তার। এখান থেকে সেখানে থেকে এখানে শুধু ছোটাছুটি করছে সে। এত বড় একটি মুশকিলে পরেও যেন সে খুব আনন্দে আছে। শরীর কিছু কিছু জায়গায় ক্ষত হলেও তাতে চিন্তা নেই তার। ভাইয়া ভাইয়া বলে রাফির পিছে পিছে বেশ লাফালাফি করছে সে। এমন সময় মাটিতে পড়ে থাকা ছুরিটি ঢুকে যায় তার পায়ের তালু দিয়ে। চিৎকার করে কাঁদতে আরম্ভ করলে রাফি দৌড়ে আসে। দ্রুত পা থেকে ছুরিটি বের করে, ক্ষতস্থানে কাপড় বাধানোর জন্য কিছু দূরত্বে পড়ে থাকা কাপড়টি আনতে গেল। কিন্তু পিছন ফিরতেই সে দেখতে পায় এক ভয়ঙ্কর চিত্র। দানবটি ঝাঁপিয়ে পড়েছে ছেলেটির ওপর। রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে সেই স্থানটি। মাংস উপড়ে ফেলছে তার শরীর থেকে। রাফির দুই চোখজুড়ে ভরে গেল অশ্রুতে। চিৎকার করে সেই জ্বলন্ত রডটি হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই দানবটির উপর। রডটি ঢুকিয়ে দিল দানবটি একটি একটি করে বড় নিকৃষ্ট চোখ দুটিতে। 

রাহেলা বলেছিল প্রধান দানবটির আসল শক্তি হল তার চোখ দুটি। তার চোখ দিয়ে মানুষের স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করে সে।  একটা সময় সেই স্বপ্ন থেকেই এই জগতে আবির্ভাব ঘটায় মানুষের। তাই যদি রাফি দানবটির চোখ ধ্বংস করতে পারে তাহলেই সেই জগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে নিমিষেই।

রাফি কাঁদতে কাঁদতে দানবটিকে সরিয়ে ছেলেটিকে ডাকতে লাগল। নিজের একটি হাত দিয়ে ছেলেটিকে ভালোভাবে  কোলে তুলে নিতে পারছে না। তবে ছেলেটি এখনো জীবিত আছে তার উপলব্ধি করতে পারল রাফি। 

কিন্তু হঠাৎই যেনো সব অন্ধকার হতে লাগল। রাফির চোখ দুটি বন্ধ হতে  লাগলো একটু একটু করে। একটা সময় চোখের কিনারায় ছোট্ট আলোর বিন্দুও যেন উধাও হয়ে গেল।

 

“রাফি! আমায় শুনতে পারছো? রাফি!”

 

চোখদুটি খুলে গেল রাফির। সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাহেলা এবং শায়লা। তার যে হাতটি দানবটি চিবিয়ে ফেলেছিল সেই হাতটি সম্পূর্ণ ক্ষতহীন। শরীরের সমস্ত আঘাত গুলো মিশে গেছে শূন্যতায়। দেহের কোনো অংশের  যন্ত্রণার অনুভব করছে না সে। সম্পূর্ণ সুস্থ সে জেগে উঠেছে। তবে কি হয়েছে সেই ছেলেটি? সে কি আদো বেঁচে ফিরেছে? আর তার নাম কি ছিল? সে কেন  রাফির সাহায্য করেছিল?

শত প্রশ্ন রাফির মাথায় দৌড়ালেও সব ভুলে মুচকি হেসে তাকিয়ে রইলো সে রাহেলা দিকে।  কেননা তার শাস্তির অবসান ঘটেছে আজ। স্বস্তির ঘুম আজ থেকে সে উপভোগ করবে।

 

দিন কাটতে থাকে তার নিয়ম মেনে। জীবনের সকল অতীত ভুলে রাফি সূচনা ঘটায় তার নতুন জীবনের। যেখানে আছে শুধু উৎসব এবং আনন্দ। আছে শুধু স্নেহ ও ভালোবাসা। আছে শুধু মমত্ব ও মায়া। আছে শুধু স্বপ্ন এবং সুফল।

আজ রাহেলা স্বপ্নার কবরের সামনে বসে আছে হাতে একটি গাছের বীজ  নিয়ে। মুখে মায়াময়ী একটি হাসি হেসে মিনমিনিয়ে কথা বলতে লাগল স্বপ্নার সাথে।

 

“জানিস, মা? তোর কথা মতো আমি সব ঠিক করে দিয়েছি। আর কেউ কষ্ট পাবে না তোর মত, সেই জগতে আর কেউ প্রবেশ করবে না, আর যারা করেছিল তারাও আজ মুক্তি পেয়েছে। তুই জানতে চেয়েছিলে আমি কি কাঁদবো নাকি তোর মৃত্যুতে। আজ বলছি, আমি অনেক কেঁদেছি যেদিন খবর পেলাম তুই নেই। আমার মাথা যেন উলটপালট হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ সব ভুলে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে সব। তারপর হঠাৎ জানিনা কিভাবে, সিঁড়ি হতে পড়ে যাই আমি। পায়ের একটি হাড়ও ভেঙ্গে গিয়েছিল আমার। খুব ব্যথা পেয়েছিলাম কিন্তু শারীরিক ব্যথা যেন সেদিন স্পর্শ করেনি আমাকে এক বিন্দু পরিমানও। সেদিন তোর মুখ দেখতে আমার খুব ভয় লাগছিল, ভাবছিলাম তোর সাথে কিভাবে মুখোমুখি হব আমি, আর কীভাবেই বা নিজেকে সামলাবো, কিভাবে দেখতে পারবো যখন তোকে কবরের ছোট্ট ঘরে রেখে আসা হবে।  তাই আসতে পারি নি। ক্ষমা করিস আমায়। জানি তুই আমায় ক্ষমা করবি।কিন্তু খুব মনে পড়ে তোকে। জানিনা কিভাবে জীবন যাপন করছি। কিভাবেই বা তোকে ছাড়া বেঁচে আছি। সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। জানিস?”

 

রাহেলা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল, “তুই কি ভাবে ভাবতে পেরেছিস, তুই আমার দুঃস্বপ্ন?  তোর নাম স্বপ্না দিয়েছিলাম। কারন তুই ছিলি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটি স্বপ্ন। স্বপ্ন যেমন না জিজ্ঞাসা করে হঠাৎ চলে আসে ঠিক তেমনি তুই আমাকে না জিজ্ঞাসা করে চলে এসেছিল। স্বপ্ন যেমন সব ভুলিয়ে  ঘুমকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলে, তেমনি তুইও পৃথিবীর সব ভুলিয়ে আমার জীবনকে করে তুলেছিলি মূল্যবান। আমার জীবনে নিয়ে এসেছিলি একটি লক্ষ। বেঁচে থাকার একটি কারণ, তুই আমায় দিয়েছিলী। তুই যখন আমায় মা বলে ডাকতি তখন পৃথিবীতে সবচেয়ে আনন্দময় মানুষটি আমি ছিলাম।

 

কিভাবে ভাবলি আমার জীবনে তুই দুঃস্বপ্ন ছিলি? স্বপ্না!”

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here