“বাবা, সারা শরীরে মাইরছে। সহ্য হচ্ছে না বাবা।

আমি মুনে হয় আর বাচমু না বাবা…

তুমি যে কইতা আমারে তুমি বুক দিয়া আগলায় রাখবা, আমারে এখন একটু বুকে জাইতি ধরো বাবা। আমি তোমার বুকের মদ্ধেই মরি যাই, তুমি আর আমারে আগলে রাখতে পারলা না বাবা।”

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠলেন আয়নল, সারা শরীর কাঁপতে থাকে। মুখে হাত দিয়ে দেখেন চোখ ভিজে আছে, উঠে মুখ ধুয়ে আসেন। খাটে বসে পানি খান ঢকঢক করে। বালিশে হেলান দিয়ে ভাবতে থাকেন তার স্বপ্নে দেখা কথাগুলো। ঐগুলো স্বপ্নে দেখা কথা নয়। কথাগুলো বাস্তব, তার আদরের মেয়ে সুফিয়ার মৃত্যুর আগে বলা শেষ কথা। এই কথা গুলো রোজ রাতে স্বপ্নে দেখেন আয়নল। চোখের সামনে ভেসে উঠে তার আদরের মেয়ের মরা মুখ।

এমন করে রোজ রাতে তার ঘুম ভাঙ্গে। বুকে ব্যথা শুরু হয়, বুকের ভেতর তোলপাড় চলতে থাকে। একসময় হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন, “মা, সুফিয়া, আমি তো তোরে বুকে আগলায় রাখতে পারলাম না মা। তুই তো আমার বুক খালি করে দিয়ে চলি গেলিরে মা। আমি তোরে বাঁচি রাখতি পারলাম না। আমায় মাফ করে দিস তুই মা।”

আয়নলের কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙে তার স্ত্রীর। আয়নল তার বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, সুফির মা। এই মাইয়া আমার কত আদরের,আমার কলিজার টুকরা ছিল। খোদা ওরে আমার বুক থেকি কেন কাড়ি নিল? কেন আমি ওরে বড় বাড়িতে বিয়ি (বিয়ে) দিছিলাম। এখন আমার মেয়েটা মাটির নিচে শুয়ে আছে। আমার তো ঘুম আসে না সুফির মা, আমার তো ঘুম আসে না।

******

আয়নলের এক সময় ভিটেতে একটা ঘর ছাড়া কিছু ছিল না। বউ নিয়ে তার অনেক কষ্টের দিন কাটত। গ্রামে ফেরিওয়ালা হয়ে সে জীবন কাটাত। একদিন জানতে পারে তার স্ত্রী মা হবে। খবর শুনে আয়নলের খুশির সীমা নাই। সাথে সাথে আল্লাহর কাছে হাত পেতে দোয়া করে যাতে তার ঘরে কন্যা সন্তান আসে। তার খুশি দেখে স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, “এত যে খুশি হচ্ছো তুমি, এমনেই অভাবের সংসার। বাচ্চা হলি পরে কেমনে যে কি হবে তাই ভাবছি আমি।” সাথে সাথে আয়নল জবাব দেয়, তোর এত ভাবতি হবেনা। আমার ঘরে একটা মেয়ে আসবে দেখিস। ওরে আমি আমার বুকে করি রাখব। ও আসলে পরে আমাদের আর অভাব থাকবে না দেখিস, দেখিস তুই।

******

আসলেই সেই মেয়ে হওয়ার পর আয়নলের জীবন পাল্টে গিয়েছিল। অর্থপ্রাচুর্যে ভরপুর না হলেও অভাব কমে আসে জীবনে। ফেরিওয়ালা আয়নল তখন কষ্টে জমানো টাকায় একটি ছোট জমি কিনে ফেলে। আর সেই জমিতে যেটুকু চাষবাস হয়, তা দিয়ে সংসার মন্দ চলছিল না। সাথে নিজের ঘরটাও আরও একটু বড় করে তোলে। বলা চলে তাদের সংসারে একটু সুখের দেখা পাওয়া যায়। মেয়ের জন্মের পরে এই বদলগুলো আয়নলের কাছে তার মেয়ে সুফিয়াকে আরও আদরের করে তোলে, সে সত্যিই বিশ্বাস করে মেয়ে জন্ম হয়েছে বলেই বদলেছে তার জীবন। তার জীবনের সব সুখের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তার মেয়ে।

মেয়েকে না দেখে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার চলে আসে মেয়েকে একনজর দেখার জন্য। মেয়ে যখন একটু বড় হয়ে উঠে তখন মেয়েকে কাঁধে নিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়াত সে। মেয়েকে নিয়ে যেত গায়ের মেলাতে। মেয়ের আবদার রাখতে এটা সেটা কত কিছু কিনে দিত আয়নল। মেয়ের মুখের হাসিই তখন তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। মেলায় পুতুল দেখে মেয়ে যখন বায়না ধরে আয়নল বলে, “আমার সুফি মারে আমি ঠিক পুতুলের লাহান (মত করে) সাজ্জায় (সাজিয়ে) বিয়ে দেব, আমার মেয়েরে আমি ম্যালা ভাল ঘরে বিয়ে দিব।”

মেয়েকে বুকে জড়িয়ে না ধরে ঘুম আসে না আয়নলের। মেয়ের মুখ না দেখে যে কাজে যায় না, ফেরার পরেও সবার আগে মেয়েকে তার দেখা চাই, কোলে নিয়ে আদর করতেই হবে। মেয়েকে বুকে নিয়েই সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে যেত সে। ঘর আলো করে আরও দুই-দুই জন পুত্র সন্তান হলেও, আয়নলের সব ভালবাসা যেমন তার মেয়েকে ঘিরে। এই নিয়ে বউ অভিযোগ করে, “নিজের ছেলে দুইটার দিকে তো একবার তাকাও, যে মাইয়া রে বিয়ে করে পর করি দিতি হবে তারেই শুধু মাথায় করি রাখলি হবে নাকি গো সুফির বাপ? এ তোমার কেমন তর হিসেব শুনি?”

আয়নল গর্জে উঠে, “আমার মাইয়া নিয়ে খোটা দিবা না কইয়া দিলাম সুফির মা। আমার মাইয়া আমার কইলজার টুকরা, ওরে আমি সবসময় বুকের মইদ্দে রাইখা দিমু। পোলা তোমার, আর মাইয়া হইল আমার।”

হেসে ওঠে আয়নলের বউ, “শুনছ নাকি পাগলের কথা, মাইয়া নাকি বুকে রাইখ্যা দিব। কেন গো, তুমি কি তোমার মাইয়্যা রে বিয়া দিবা না? নিজের কাছেই রাইখ্যা দিবা?”

আয়নলের মন খারাপ হয়ে যায়, “সুফির মা, আমি যদি পারতাম মাইয়্যাডারে আমার কাছিই রাখি দিতাম। তা তো আর হবে না। বিয়ে আমি দিব ঠিকই তবে আমি ওরে এমন ঘরেই বিয়ে দিমু যেইনে ওরে আমার মত আদর করি রাখিব।’’

কথাটা শুনে বুকটা কেঁপে ওঠে সুফিয়ার মায়ের। মানুষটা মাইয়্যা বলতে অজ্ঞান। মাইয়্যাটার যদি ভাল ঘরে বিয়া না হয়, ওর বাপ তো কষ্টে মরি যাইব। এক অনিশ্চিত দিনের বা সময়ের অপেক্ষায় কেঁপে ওঠে তার বুক, সে তাকায় তার স্বামীর দিকে। মেয়ে সুফিয়ার সাথে খেলনা নিয়ে আপন মনে খেলে যাচ্ছে আয়নল। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হচ্ছে সুফিয়ার বাবা আয়নল।

সময় এগিয়ে যায়, ধীরে ধীরে সুফিয়া বড় হয়। উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট ও করে। মেয়ে আরো অনেক পড়ালেখা করার ইচ্ছার কথা জানায় তার বাবাকে। বাবাও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারে না। কিন্তু সংসারে ততদিনে খরচ অনেক বেড়ে যায়, দুই ছেলেও বড় হয়ে ওঠে, তাদেরও পড়ালেখার খরচ বহন করতে হয়। মেয়ের আরও বেশি দূরের পড়ালেখার খরচ যে কম হবে না তা বেশ ভালই বুঝতে পারে আয়নল। মনের কথা জানায় সুফিয়ার মাকে।

কথা শুনে সুফিয়ার মা বলে, মাইয়্যা বলব আকাশের চান্দ ধরমু, তুমি কি তাই আইন্না দিবা নাকি? সবসময় মাইয়্যা নিয়া পাগলামি কইরা কাজ নাই। মাইয়্যা বেশি পাশ দিয়া কী করব? সেই তো পরের বাড়িতে গিয়া সংসার করতে হইব। ছোট থেকে তো নিজের মত কইরাই বড় করছ। এইবার আমার একটা কথা শুনো। মাইয়্যারে ভাল ঘর দাইখা বিয়া শাদি দাও।

আয়নলের মেয়ের মুখ মনে পড়ে আর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পরতে থাকে। নিজেকে অনেক অসহায় মনে হয়।

পাশের গ্রামের ভাল এক ঘর থেকে বিয়ের কথা চলতে থাকে সুফিয়ার। মেয়ে কিছুতেই রাজি না, মেয়ের দিকে তাকিয়ে বাবার মনেও শান্তি আসে না। কিন্তু পরিস্থিতিকেও অবজ্ঞা করতে পারছে না আয়নল। মেয়েকে বোঝায়, মা দেখিস তারা তোরে ভালাই রাখবো আমি তাদের কাছে বইল্লা দেখুম যাতে তোরে আরও লেহাপড়া করতে দেয়। দেখিছ তুই ভালাই থাকবি।

ছেলের বাড়ি থেকে বিয়েতে যৌতুক হিসেবে দাবি করে নগদ ১ লক্ষ টাকা আর কানের দুল। দিশেহারা হয়ে যায় আয়নল, এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় হবে। সুফিয়ার মা বলে, এত ভাইব্ব না সুফির বাপ। কষ্ট হলেও এইগুলা মাইয়্যার জন্য করাই লাগবে। টাহা ছাড়া মাগনা তো মাইয়্যা বিয়া দিবার পারমু না। আর এর চেয়ে ভালা ঘরে সুফির বিয়া দেয়া ও সম্ভব না। তুমি না কইরনা।

দীর্ঘশ্বাস দিয়ে আয়নল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এক শুভদিন দেখে মেয়ে সুফিয়ার বিয়ে দেয় আয়নল। মেয়ের বিয়ে আর যৌতুকের টাকার জন্য আয়নলকে বিক্রি করতে হয়েছে তার একমাত্র জমি। বিয়ের দিন আয়নল হুহু করে কেঁদে উঠে, সুফির মা। এই মাইয়্যা আমার ঘরে লক্ষী হইয়া জন্ম নিছিল। ওরে আমি অনেক আদরে মানুষ করছি। আমার ঘরের লক্ষ্মীরে আমি আইজকা পরের ঘরে দিয়া দিতাছি। আমার বুক ফাইট্টা যাইতাছে, আমার সহ্য হইতাছে না।

মেয়ে বিদায়ের সময় মেয়ের জামাই আর শ্বশুরকে বারবার করে অনুরোধ করে আয়নল, আমার মাইয়্যারে আমি অনেক যত্নে রাখছি। ওর অনেক শখ লেহাপড়ার। এইটুকু ওরে করতে দিয়েন। সুফিয়ার শ্বশুর তাকে আশ্বস্ত করে সুফিয়াকে তারা মেয়ের মত করেই রাখবে।

মেয়েকে বুকে নিয়ে আয়নল বলে, আমার কলিজার টুকরা। তুই কান্দিস না, আমি যখন সুযোগ পামু তোরে গিয়া দেখি আসুম। তুই ভাল থাকিস মা।

আয়নলের ঘর, জীবনকে শূন্য করে দিয়ে তার আদরের ধন সুফিয়া পালকিতে করে শ্বশুরবাড়ি চলে যায়।

******

সুফির মা, আমি আজকে একটু সুফির কাছে যামু, মাইয়্যারে দেখতে মন চাইতাছে।

আয়নল বউ তখন খুশি হয়ে বলে, হ, যাও। দেইখা আসো । যদি পারো ওরে একটু সাথে করে নিয়া আইসো। আমারও মাইয়ারে দেখতে মন চাইতাছে। বিয়াই সাহেবরে কইয়া দেইখো। যদি দুইদিনের জন্য ওরে সাথে দেয়। আর যাওয়ার সময় কিন্তু নতুন কুটুমের বাড়িতে খালি হাতে যাইও না।

তুমি ভাইবো না সুফির মা।

******

শ্বশুরবাড়িতে মেয়েকে দেখে চোখে পানি চলে আসে আয়নলের। তার আদরের মেয়ের চোখ-মুখের এই হাল কেন? মেয়ে কি তার সুখে নাই? মেয়েকে অসুস্থ নাকি?

বাজান তুমি এত দিনে আইলা? আমার না দেইখা কেমনে থাকলা বাজান?

নারে মা, তোরে ছাড়া কি থাকা যায়? হাতে কাজ ছিল যে তাই আসবার পারিনাই। তোর মায় তোরে দেখবার চায়, তোরে কি দুইদিনের জন্য দিবো আমার সাথে?

সুফিয়া চুপ করে থাকে, বলে বাজান চলো তোমারে খাইতে দেই। মায় কেমন আছে বাজান? ভাই দুইটা সারাদিন তোমারে জ্বালায় অনেক?

নারে মা, সবাই ভালা আছে। তোর মা তোর লাইগা কান্দে খালি। তুই কেমন আছোস মা? তোর চোখ মুখ এমন কেন?

কথা শুনে সুফিয়া বাবার মুখে মাথা দিয়ে কান্না শুরু করে, বাজান আমার এইখানে ভালা লাগে না। কেউ ভালা ভাবে কথা কয় না। সবাই ফইন্নির মাইয়্যা বলে কথা শুনায়। আমার ভালা লাগে না বাজান। তোমার জামাই নাকি কিসের ব্যবসা শুরু করব, ৩০ হাজার টাকা লাগব। তোমার থেকে আনতে বলে বাজান। আমি না করায় আমার গায়ে হাত তুলছে, আমারে অনেক কথা শুনাইছে বাজান। আমি এহন কী করুম বাজান?

এই কথা শুনে আয়নলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তার আদরের সুফিয়া এইসব কী বলছে? মেয়েকে সে সুখের বদলে কী জীবন উপহার দিল?

মেয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে আয়নল বলে তোর বাবা তোর সুখের লাগি সব করতে পারবে মা, আমারে কিছুদিন সময় দে মা, জামাইয়ের আবদার আমি ঠিক পূরণ করব।

মেয়ের শ্বশুরের কাছে কিছুদিনের সময় চেয়ে আর মেয়েকে আবার এসে নিয়ে যাবে কথা দিয়ে আয়নল চোখ মুছতে মুছতে বিদায় নেয়।

বাড়ি ফিরে আয়নল কিছুতেই ভেবে পায় না সে কী করবে, কোথা থেকে টাকা জোগাড় হবে। এদিকে মেয়ের মুখ মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। যেই মেয়েকে সে কখনও ধমক দেয়নি, সেই মেয়ে কি না পরের বাড়িতে মাইর খাইছে? না যে করেই হোক তাকে টাকা জোগাড় করতে হবে। সুফিয়ার মা পরামর্শ দেয় সুদে টাকা নেয়ার। অনেক ভেবে অনেক উপায় খুঁজে না পেয়ে অবশেষে সুদে টাকার জোগাড় করে আয়নল।

টাকা নিয়ে দশদিন পর সে যখন মেয়ের বাড়িতে যাবে ঠিক করে, সেদিন সকালে মেয়ে সুফিয়া এসে হাজির হয় আয়নলের বাড়িতে।

মেয়েকে দেখে আয়নল গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠে। সারা শরীরে মারের দাগ, চোখ-মুখ ফোলা। দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আয়নল। মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাজান, তোমার টাকা নিতে দেরি হচ্ছিল দেখি আমারে বেদম মাইর দিয়া এইখানে পাঠায় দিল, আর কইছে টাকা না নিয়া যাতে ওই বাড়িতে না যাই। বলেই জ্ঞান হারাল সুফিয়া।

******

হাসপাতালের বিছানায় ব্যাথায় কাতরাচ্ছে সুফিয়া। চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে। দিশেহারা আয়নলের মেয়ের কষ্ট দেখে সহ্য করতে পারছে না। চোখের সামনে তার আদরের মেয়ে ছটফট করতে করতে মারা গেল, সে বুক দিয়েও পারল না মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে। সে ব্যর্থ, সে ভাল বাবা না। এক মনে ভেবে যাচ্ছে মেয়েকে আমি নিজের হাতেই মেরে ফেললাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here