আমি ও তিনি

তাসীন

বৃদ্ধ লোকটিকে রোজ বিকেলে সামনের ধারের ঐ জঙ্গলাবৃত জায়গাটায় আসতে দেখি,একসময় হয়তো ওখানে কোন সাজানো বাগান ছিল। কিন্তু তা দেখে এখন আর বোঝার উপায় নেই, এখন শুধু কিছু বড় বড় আম,কাঁঠাল আর মেহগনির অবিনস্ত সারি পূর্বকার গোছানো বাগানের সুখস্মূতি বহন করছে।জায়গাটার সামনে দিয়ে একটা বড় বাড়ি দেখা যায়,বোধহয় ঐ বৃদ্ধরই বাড়ি।তবে ঐ বাড়িতে বিশেষ কেউ থাকে বলে মনে হয় না।তাছারা বাড়িটার অবস্থাও জরাজীর্ন ,চারপাশ দিয়ে পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে,গত বিশ-ত্রিশ বছরে মনেহয় বাড়িটার উপরে কোন মিস্ত্রির হাত পড়েনি।

এক সপ্তাহ হলো আমরা এই ছোট্ট মফস্বল শহরে এসেছি,এলাকার নামটা খুব অদ্ভুত,লঙ্কপুর**না কি যেন,উচ্চারনে দাঁত ভেঙে যায়।বাবা সরকারি চাকুরে তাই প্রতিবছরই বাবার চাকরির সুবাদে কোন না কোন নতুন এলাকায় যেতে হয়।তবে এবারে একেবারে বছরের মাঝামাঝি সময়ে বদলি,তাই নতুন করে আর স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি।

তবে বাসায় বসে পড়ালেখা চলছে,প্রতিদিন সকালে মার সামনে বসে বইয়ের পাতা উল্টাতে হয়।তাছারা বাবা এক হোমটিউটর ঠিক করে দিয়েছে,রোজ সন্ধায় বিরক্ত করতে আসে।সকালের খাবার পর থেকে সারা দুপুর আর সারা বিকাল থেকে সন্ধা অবধি আমার বিস্তর অবসর।নতুন জায়গা তায় আবার স্কুলে ভরতি হতে পারেনি ফলস্বরুপ নতুন বন্ধুও জোটেনি,কোন ভাইবোনও নেই যে তাদের সাথে দুএকটা কথা বলে সময় কাঁটাবো,পুরো নিঃসঙ্গ জীবন কাঁটছে এখন।এখন আমার ঘরের সঙ্গী বলতে শাহারিয়ার বেসিক আলী আর হার্যের টিনটিন।এই দুইই নিয়ে দিব্যি অনেকক্ষন কাটিয়ে দেই।এক জিনিস তবুও সময় কাঁটানোর জন্য বারবার পড়ি।

বাসায় অবশ্য টিভি কম্পিউটার সবই আছে তবে তা আমার ভাল লাগেনা।বিকেলবেলাটায় জঙ্গলের ধারের ঐ জানলাটার সামনে বসি আর কিছুক্ষন পরই ঐ বৃদ্ধ লোকটিকে দেখতে পাই।লোকটির রুটিন এক,কিছুক্ষন ঐ অগোছালো বাগানে পাইচারি করে তারপর বেঞ্চির মত একটা মোটা ডালের উপর বসে বসে ঝিমোয়।একদিন কি মনে হলো, মাকে গিয়ে বললাম যে আমি একটু ঐ বাগান দিয়ে ঘুরে আসি।মা প্রথমে রাজি হননি,পরে কি চিন্তা করে অনুমতি দিলেন। আমিও খুশি হয়ে ঐ জঙ্গলে গেলাম।তখন সূর্য সবে পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে,আকাশ হালকা হালকা লাল হচ্ছে।আমি গিয়ে দেখলাম বৃদ্ধ ঐ ডালটিতে বসে আছেন।আমিও তার সামনে গিয়ে দাড়ালাম।

বৃদ্ধভদ্রলোক আমার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন,কি বলবো ভাবছি,তার আগেই উনি বেশ রাশভারি কন্ঠে বললেন,”কি কেমন আছো খোকা”।আমি একটু ইতস্তত করে বললাম,”জ্বি ভালো,আপনি”?বৃদ্ধলোকটি একটু উদাস গলায় বললেন,এই আছি উপরওয়ালার দয়ায়”।তারপর ভোল পাল্টে আমাকে ভালো করে নিরিক্ষন করে বললেন,”তা তোমরা বুঝি এখানে নতুন এসেছো”। আমি এখানে আসার বিষয়টি বললাম।আমার কথা শুনে উনি বেশ খুশি হলেন।পাশে বসতে বলে আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন।মোটা ডালের উপর বসে আমি আমার নাম বললাম।এর ভিতরেই সূর্য ডুবে গেল,দূড়ের কোন মসজিদের মুয়াজ্জিনের ভরা কন্ঠে মাগরিবের আজানের আওয়াজ ভেসে এল।আমি উঠতে যাচ্ছি দেখে উনি বললেন,”এখনি যাচ্ছ”?আমি আমতা করে বললাম,”না মানে,সন্ধেতো হয়ে গেল এখন না গেলে মা বকবে তাছারা আরেকটু পরে আমার স্যার পড়াতে আসবে”।

উনি বললেন,”আচ্ছা বেশ,কালকে এস আবার।ওনাকে বিদায় জানিয়ে আমি বাড়িতে এলাম।সেদিন ঘুমোনোর সময় ঐ বৃদ্ধের কথা বারবার মনে হতে লাগলো,ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করে আমার সমন্ধে অনেক কথাই জেনে নিয়েছেন কিন্তু ওনার সমন্ধে আমি তেমন কিছুই জানিনা।নাহ ক্লাস এইটের ছাত্র আমি,এতটা লাজুক হওয়া উচিত হইনি।কালকে ওনাকে ওনার নামধাম জিজ্ঞেস করবো,এরকম চিন্তা ভাবনা করে ঘুমিয়ে পড়লাম।সেদিন ঘুমের ভিতর ওনাকে স্বপ্নেও দেখলাম,আমকে যেন কি কি বলছে।পরদিন বিকেলে যথাসময়ে আবার ঐ জঙ্গল সমান বাগানে গেলাম।গিয়ে দেখি উনি সেই মোটা ডালে বসে আছেন,আমকে দেখে খুব উচ্ছাসের ভঙ্গিতে বললেন,”ওয়েলকাম,ওয়েলকাম কেমন আছো”?
“ভালো,আপনি”?”
“এই যেরকম দেখছো,তথৈবচ”।
গতকালের থেকে আজ আমার জড়তা ভাব অনেকটা কমে গেছে,স্বতঃফুর্ত ভাবে বললাম,”আপনি তো আমার দাদুর বয়সী,আপনাকে দাদু বলে ডাকি”।
কথাটা শুনেই উনি চমকিত হয়ে ছলছল চোখে আমার দিকে একপলক তাকালেন,তারপর সেই ভাব মুছে দিয়ে হোহো করে হেসে বললেন,”বেশতো,এতে আর আপত্তির কি আছে।তুমি দাদু ডাকলে আমারো বেশ ভালো লাগবে”।

এই কথা শুনে আমার মনের সংকোচ আরো কেঁটে গেল,আমি বললাম,”আচ্ছা দাদু ,আপনার বাড়িতে আর কে কে আছে,না মানে বিশেষ কেউ আছে বলে তো মনে হয় না,তাই জিজ্ঞেস করছিলাম আরকি”।
কথাটা শুনেই ওনার উচ্ছাসের ভাবটা অনেক কমে গেল,তারপর মনখারাপ করা সুরে বললেন,নিজের বলতে কেউ নেই,স্ত্রী গত হয়েছে আজ প্রায় দশ বছর,দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আর এক ছেলে-সে থাকে বিদেশে” ,থাকার ভিতর আছি শুধু আমি,রাধুনি আর কেয়ারটেকার”।

আমি আর তিনি কিছুক্ষন চুপচাপ বসে রইলাম। তারপর নিরবতা ভেঙে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,”ছেলে মেয়ে কেউ আসেনা”?
উনি বললেন,”আসে বছরে একবার,পাঁচ-ছয়দিন থেকে তারপর চলে যায়। আমি বললাম,”আপনি ওদের সাথে চলে যেতে পারেন না,এখানে একা একা পড়ে আছেন কেন”?

উনি একটু মুচকি হাসি দিয়ে উদাসীন স্বরে বললেন,”ওরা আমাকে অনেক বার যেতে বলেছে,কিন্তু আমার ভাল লাগেনা।এই বাগান এই বাড়ি,এখানকার আকাশ বাতাস সবকিছুর প্রতি কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে।মায়া বড়ো কঠিন জিনিস,একবার মায়ার খপ্পরে পড়লে সেখান দিয়ে বেড়োনো মুশ্কিল।মানুষ সব ছাড়তে পারে কিন্তু কোন আপন জিনিসের প্রতি মায়া সহজে ছাড়তে পারেনা। যক্ষের ধনের মত তাকে আগলে রাখতে চায়।যদি না পারে তবে তার সময় ওখানেই থমকে যায়”।

দীর্ঘ বক্তিতা শেষ করে তিনি আমার দিকে তাকালেন।আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম।উনিও হাসলেন।যতদিন এই মফস্বল এরিয়ায় ছিলাম,ততদিন প্রতি বিকালে ঐ দাদুর সাথে সময় কাটাতাম।দাদুকে আমার ভালো লাগতো,কি যানি হয়তো তারপ্রতিও একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল।

সময়ের চাকা আপন গতিতে ঘুরতে থাকে,একদিন আমরাও এই মফস্বল ছেড়ে শহরে চলে আসি,আস্তে আস্তে এদিককার স্মৃতি ভুলে যেতে থাকি।দাদুর কথাও একসময় ভুলে যাই।তারপর কেঁটে গেছে অনেক বছর,দীর্ঘ সময়-এই সময়ে অনেক কিছুই বদলে গেছে।আমাকে যেন আচমকা একদিন আমি নতুন করে আবিষ্কার করি।পুরনো সব স্মৃতি যেগুলো ভুলে গিয়েছিলাম,কোন দৈববলে সেগুলো আবার সব মনে আসছে।সেই দাদুর কথাও মনে পড়ল।হাহ আমিও তা আজ কারোর দাদু।তবে কেউ ডাকার নেই,কারন আমিও আজ একা,বড্ড একা ।নিঃসঙ্গ জীবন আমাকে আকড়ে ধরেছে কঠিন ভাবে আর আমি আকড়ে ধরেছি আমার মায়া যা শত চেষ্টাতেও ছাড়াতে পারছি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here