গ্রামে-গঞ্জে করোনা আতংক

বিকেল বেলায় মন খারাপ করে বারান্দায় চেয়ারে বসে আছে রুনু। বারান্দার গ্রিলে মুখ লাগিয়ে সামনে তাদের ফুল বাগানে আসা নতুন পাখিটাকে দেখছে। ছোট্ট রুনু পাখিটার নাম জানে না। তবে পাখিটা রোজ বিকেলে তাদের বাগানের গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়। রুনুর খুব ভালো লাগে হলুদ, কমলা মেশানো, লম্বা লেজের এই পাখিটা। আচ্ছা পাখিটার নাম কি! ভাইয়া হইতো বলতে পারবে। ভাইয়া সব জানে, সব। সে তার ভাইয়াকে ডাক দিল। রুনুর ভাই রনো, এই বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সেও সারাদিন ঘরে বসে থাকে। তার অবস্থা খুব খারাপ। যে ছেলে ,বন্ধুদের আড্ডাতে চোখের মণি। সেও তার চোখের পাতা বন্ধ করে, সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে কাটাচ্ছে । কি আর করার! তাই রুনুর ভাইয়ের মাথা আজকাল খুব গরম হয়ে থাকে। রুনু যখন বললো, ‘ ভাইয়া বলনা! ঐ পাখির নাম কি?’ রনোর মাথায় রক্ত উঠে গেলো।
‘ এই জন্যে ডাকলি আমাকে?’ বলে রুনুর মাথায় চাটি মেরে দিল।
কিন্তু পরক্ষণে পকেট থেকে মোবাইল বের করে, পাখিটার দিকে ক্যামেরা ধরতেই ইন্টারনেটে তার নাম, বংশ পরিচয় সব বেরিয়ে আসলো। রনো তা ভাব নিয়ে রুনুর সামনে বলতে লাগলো। আর রুনু ভাবলো,’ ভাইয়া আসলেই সব জানে, সব!
 
রুনুর দাদা আফজাল হোসেন ধীরে সুস্থে লাঠি হাতে বের হলেন। রাস্তায় দাড়িয়ে কিছু সময় এদিক সেদিক তাকালেন । তারপর পকেট থেকে একটা নীল রঙের মাস্ক বের করে, মুখে পরে নিলেন। রুনু তার দাদুকে চিল্লিয়ে ডাক দিলো,
‘ ও দাদু , কোথায় যাচ্ছ?’ রুনুর দাদু রুনুর দিকে তাকিয়ে একটু কাচুমাচু করে বললেন,
‘ এই বাজার থেকে একটু চা খেয়ে আসছি!’
‘ দাদু তুমি জানো না? বাইরে গেলে পুলিশ পিটাবে!’
‘ আমি মুরুব্বী মানুষ, আমাকে কিছু বলবে না।’ আমার গায়ে হাত দেওয়ার কারো সাহস নেই!’ একটু বিজয়ীর হাসি হাসলেন আফজাল হোসেন।
রুনু একটু অবাক হয়ে বললো,
‘ করলা ভাইরাসের ও না?’ রুনুর দাদু হাসতে হাসতে বললেন,
‘ দাদু ভাই,ঐ টা করলা না, করোনা ভাইরাস। আর করোনা ভাইরাসে আমার কিই বা হবে? এবার ও চল্লিশ দিনের চিল্লা দিছি। আল্লাহর বরকত আছে। মরলে মরবো জান্নাত পাইবো তখন। আল্লাহ না চাইলে তো কিছু হবে না।’
 
রুনু মৃত্যু জিনিস টা খুব একটা বোঝে না। তবে কিছু দিন আগে সুমির দাদী মারা গিয়েছিল তখন সুমি অনেক কান্না করতে ছিল। তাই দেখে রুনুও অনেক কান্না করেছিল। মৃত্যু মানে মনে হয় অনেক কান্না। তাই সে দাদুকে বললো, ‘ না দাদু তুমি মরবে না ।’
 
দাদু একটা রিক্সায় করে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। রনো কেন জানি মোবাইল টেপা বাদ দিয়ে বললো, ‘ বাজারের দোকান পাট তো সব বন্ধ। দাদু চা খেতে কোথায় গেল?’
 
আফজাল সাহেব ও জানেন বাজারের চায়ের দোকান, আড্ডার জায়গা সব বন্ধ। কিন্তু তিনি গোপন সূত্রে খবর পেয়েছেন, মতি মিয়ার দোকান এখনও চলছে। আর তার পরিচিত সবাই সেখানেই এসে আড্ডা দিচ্ছেন। মতি মিয়ার দোকান ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পেটের দায়ে আর করোনা ভাইরাস এর ঝুঁকি সম্পর্কে না জানায় সে গোপনে তার নিজ বাড়িতে দোকান মতো বানিয়ে চা-নাস্তা এইসব সরঞ্জাম বিক্রি করছে। আর সেখানে এলাকার বড় বিখ্যাত ব্যাক্তিবর্গ প্রতিদিন উপস্থিত হয়। তাদের বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কথা বার্তা পরিচালনা করার জন্য। আফজাল হোসেন তাদের মাঝে খুব নগন্য। তিনি হয়তো ভাবছে তাদের সাথে কিভাবে আড্ডায় তাল দেবে। হয়তো এমন ভারি কথা বার্তা চলছে সেখানে,
‘ভাই সাহেব, আপনি তো জানেন না। কাল ট্রাম্প আমার ছেলেকে ফেসবুকে নক করছিলো। কিন্তু আমার ছেলে তো ফেসবুক সেলিব্রিটি! খুব ব্যস্ত মানুষ। আজ সকালে সে মেসেজ এর রিপ্লায় দিয়েছে। তারপর ট্রাম্প তার থেকে মতামত নিয়েই নিজের আমেরিকাকে লক ডাউন করছে।’
 
‘ কি বলছেন ভাই? আমিও তো বলি ব্যাটা ট্রাম্প এর মাথায় এতো বুদ্ধি কোথায় থেকে এলো? আমি ভাবছিলাম করোনা প্রতিরোধে ও সুইচ টিপে দেবে। আপনার ছেলের জন্যেই আমেরিকার মানুষ একটু হলেও বাঁচতে পারে।’
 
‘আমার মেয়ের বিষয়ে তো আপনাদের বলাই হলো না। আমার মেয়ে কাল করোনার সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধের ওপর একটা ভিডিও করে টিকটক এ আপলোড করেছে মনে হয়। এক রাতেই নাকি সেটা হাজার হাজার লাইক পেয়েছে। মনে হয় মেয়েকে নায়িকাই বানাতে হবে। সামনে বছরের সেরা অভিনেত্রী পুরষ্কার আমার মেয়ের হাতেই থাকবে।’
 
এমন বিশেষ ব্যাক্তিদের বিশেষ আলোচনায় যোগ দিতে সেখানে পৌঁছে গেলেন আফজাল হোসেন। কিন্তু তিনি সেখানে যা দেখলেন তাতে আশাহত হলেন। সবাই তার মতো সাধারন কম শিক্ষিত মানুষ। শুধু মাস্টার মশায় শিক্ষিত ব্যাক্তি। অন্যদিনের আড্ডায় হাসি তামাসা চলে। আজ পরিবেশ গম্ভীর সবাই চুপচাপ। চায়ের কাপে চুমুক চলছে। কেতলি থেকে ধোয়া উঠে বেরিয়ে যাচ্ছে ফাঁক দিয়ে। রফিক মাস্টার আরেক দফা চা দিতে বললেন। আফজাল হোসেন এসে সালাম দিলেন সবাইকে। কিন্তু উত্তরে এলো বিষন্নতার সুরে। তিনি প্রশ্ন করলেন,
‘ কি ব্যপার! রফিক মাস্টার খবর সবর কি?’
‘খবর ভালো না চাচা। দেশে অনেক জনকেই ভাইরাসে ধরেছে।’
‘হয়, আজ খবরে দেখলাম। আমাদের সকলেরই সচেতন হতে হবে। কি বলো?’
‘ঠিক বলছেন চাচা। আসেন বসেন এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা প্রয়োজন।’
‘অবশ্যই! লোকজন কম কেন! মানুষ না থাকলে আসলে আলোচনা জমে না।’
‘আরে চাচা, আপনি তো একাই সব মানুষের বরাবর।’
‘ওহ তা তো অবশ্যই।’
শুরু হলো ব্যপক আলোচনা। যাকে বলা যায় কমান্ডোদের ব্লু প্রিন্ট প্লানিং। চায়ের কাপ বাড়তে লাগলো। কেতলি সংখ্যা বাড়তে লাগলো। মানুষ ও বাড়লো। মতি মিয়ার কাপ সংখা যখন কম পড়ে যাচ্ছিল। তখন এটো কাপেই অনেক জন চা পেলো। মাঝে মাঝে সেগুলো ধোয়াও হচ্ছিল না।
‘আচ্ছা মাস্টার আজ উঠি। আর যা বোঝালাম সব মেনে চলবা। সবাইকে সচেতন করে দিবা এই বিষয়ে।’
‘তা তো করতেই হবে। আমাদের একটা র্যালি বের করে, ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সচেতন করা দরকার।’
‘বাহ! ভালো কথা বলেছে। কাল এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করে ঠিক করা যাবে।’
হয়তো একসময় বৈজ্ঞানিকরা রক্তে অতিরিক্ত একটা উপাদান আবিষ্কার করে ফেলবেন। সেটা শুধু একটা বিরল জাতির মাঝেই বিদ্যমান থাকবে। তারা সেটির নাম দেবে আড্ডা চক্রিকা। দেশ-বিদেশের মানুষ, গ্রহ-নক্ষত্র অন্য সৌরজগতের, অনেক অনেক দুরের গ্যালাক্সি থেকে এলিয়েনরা দলে দলে যোগদান করবে, বাঙালিদের রক্ত নিয়ে গবেষণা করার জন্য।
 
ফিরতি পথে আফজাল হোসেন দেখলেন কিছু ছেলেপেলে আবার বড় মানুষও কিছু ছুটে বাজারে মোড় এর দিকে আসছে। তিনি তাদের প্রশ্ন করলেন, ‘কি হয়েছে?’ তাদের মধ্যে রহিমা বানু মুখে উত্তেজনা ফুটিয়ে তুলে বললো,
‘ঐ দিকটাই পুলিশ আসছে। শুনলাম ছামাদ আলি আর কিছু লোককে নাকি লাঠি দিয়ে খুব মার মেরেছে। তাই সবাই দেখতে যাচ্ছি।’
‘ও! কি বলো পুলিশের এতো বড় সাহস! আমাদের এলাকার ছেলের গায়ে হাত দেয়। চলো তো দেখি।’
‘হ্যা! তাড়াতাড়ি চলেন। আজ একটা বিরোধ করতেই হবে।’
#সমাপ্ত
 
আসলে লিখতে আর ভালো লাগছে না। ঘৃণা বা লজ্জা আসছে। তুলে ধরতে লাগলে অনেক গল্পই উঠে আসবে। এটা যদিও নিছক মিথ্যা গল্প, তবুও কি একটু সচেতনতা দেখানো যায় না। বিশ্বের সামনে নিজেদের পরিচয় দিয়ে মজা পান?গ্রামে না হয় খুব একটা কড়াকড়ি হচ্ছে না। শহরে তো পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট বসেছে তাও কেন বের হতে হবে। সরকার ছুটি দিয়েছেন ঘরে থাকার জন্য। সরকারী চাকরিজীবি যারা তাদের তো পিকনিক পিকনিক বসে বসেও বেতন পাবেন। তাহলে পিকনিকটা ঘরে বসে পালন করলেই ভালো হয় না?
সন্মানিত সকল আমি আপনাদের উত্তর জানতে চাচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here