চকলেট

আমার না অনেক কথা বলার অভ্যাস। সব ফালতু অপ্রয়োজনীয় কথা। আসলে আমার অনেক গল্প ছিলো। আগে গল্প শোনানোর কোনো মানুষ ছিলো না। শোনার ও কেউ ছিলো না। এখন তাও হাতে গোনা, আসলে হাতে গোনা বললে ভুল হবে আঙুলে গোনা কিছু প্রিয় মানুষ আছে। আর তারা আপনের থেকেও এতোটাই আপন, যে মনে হয় আমাকে আমার থেকে ভাল বোঝে। আসলে তাই আমি নিজেকে ভালো চিনি না। নিজেকে বুঝতে পারি না। তাই নিজেকে বুঝতেও আমার মানুষের সাহায্য লাগে। এটা মনে হয় আমার দুর্বলতা। তবে এই দুর্বলতা আজকাল খুব উপভোগ করছি। দেখেছেন আমি যে অনেক বাচাল তার পরিচয় দিয়ে ফেলেছি। কি কথা থেকে কিসে চলে এলাম। আসলে একটা গল্প বলতে চাচ্ছিলাম।

শুরু করি।

*তখন আমি ক্লাস ফোর এ পড়ি। যে গল্প বলবো সে গল্পের গভীরতা জ্ঞান আমার তখনো ছিলো না এখনো নেই। এটা অবশ্য আমার প্রিয় মানুষেরাই বলতে পারবে। দুপুরে টিফিন বিরতিতে বন্ধুদের ভেতর প্রতিযোগিতা চলতো কে সবার আগে খেয়ে ক্লাসে আসতে পারে। তাই সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে আসতে চায়তাম। তো সেদিন আমার টিফিনে ছিলো ভাতের সাথে ডাল আর আলু ভর্তা। যেটা মনে হয় সবারই প্রিয়। আর এই খাবার এর সুবিধা সবচেয়ে বেশি। সেটা হলো অল্প সময়ে খাওয়া শেষ। খাওয়া শেষ হতেই কোনো রকম হাত ধুয়ে ছুটেছি। আজ সবার আগে আমি পৌছাবো ক্লাসে।
স্কুলে গিয়ে তাই দেখলাম, আমার ক্লাসের কেউ আসেনি। কিছুটা বিজয়ী ভাব এসে গেলো নিজের মধ্যে। তখন আমি জানি না আমার এমন রহস্যময় অভিজ্ঞতা হতে চলেছে আজ। কেই বা জানে ভবিষ্যতের খবর। জানলে আর কি ক্লাসে আসতে যেতাম। জানলেও তো তখন বুঝি না। তো আমার বাচলামি বাদ দিয়ে ঘটনায় আসি।
ক্লাসের সামনে আমার থেকে বড় ক্লাসের ভাই ও আপুরা কেন জানি আমাদের ক্লাসের সামনে দাড়িয়ে ছিলো। একটা জটলা মতোই। সবাই কান পেতে আছে দরজায়, অবাক বিষয় দরজা কেন জানি বন্ধ! এমন সময় একটা আপু আমাকে দেখে, কিছুটা চমকে গেল। সাথে সাথে অন্যদের সাথে মুখ চাওয়া চাওয়ি করার পর এগিয়ে এলো আমার কাছে। আসলে আমি খুব ভুল্লাক্কাড় মানুষ ও বটে তাই তখন কার ঐ আপু বা ভাইয়া কারো নাম বা চেহারা মনে নাই। শুধু এই ঘটনা টাই আছে আমার কাছে। আপু আমাকে বললো, আরে অমি তুমি এতো আগে এসেছ?
তার চেহারায় ভয় ছিলো। আমি উত্তর দিলাম,
‘তোমারা এখানে কি করছো?’
আরেক ভাই বললো, ‘আমরা একটা মজার খেলা খেলছি!’
‘আমিও খেলবো! আমাকে তোমাদের সাথে খেলতে নেবে?’
সবাই হাসতে লাগলো। হাসি চেপে ভাইয়া বললো,
‘তুমি তো খেলতে পারবে না’
আমি একটু মন খারাপ করলাম। তারপর ভাবলাম ধুর লাগবেনা এদের সাথে খেলার। আমি তাই বললাম,
‘আমি আমার ক্লাসে যাবো। তোমারা দরজা লাগিয়ে রেখেছো কেন? খুলে দাও।’
‘না এখন তো দরজা খোলা যাবে না।’ বললো ভাইয়া।
‘কেন? খোলা লাগবেই আমি সবার আগে আসছি, তাই সবার আগে আমিই ক্লাসে যাব।’ কিছুটা জেদ করেই বললাম।
এবার ভাইয়া আমাকে লোভ দেখানোর জন্য বললো,
‘তুমি যদি আমাদের কথা শোনো, আর কাউকে কিছু না বলো। তাহলে তোমাকে আমরা অনেক কিটক্যাট চকলেট খাওয়াবো’।
‘তাহলে আমাকে এক ট্রাক চকলেট দিতে হবে।’
‘ওকে দেব।’
তখন চকলেট আমার কাছে কোনো গুপ্তধনের থেকে কম ছিলো না। তাই সেই চকলেটের বিনিময়ে আমি সব করতে পারতাম। তাই তাদের কথায় চুপচাপ দাড়িয়ে থাকতে রাজি হয়ে গেলাম। কিছুক্ষন পর আপুটা দরজার কাছে গিয়ে বললো,
‘ভাইয়া তাড়াতাড়ি করেন? সময় নাই বেশি। ‘
ভেতর থেকে আমার অতি পরিচিত ভাইয়া ও আপু বেরিয়ে আসলো। তারপর তারা চলে গেলো তাদের ক্লাসে। জানিনা কি হলো, আমি চকলেট আর পেলাম না।

এবার আসি টুইস্টে, ক্লাসের ভেতরে যারা ছিল, ঐ আপু আর ভাইয়ার সালিশ বসলো স্কুলের সবার সামনে। ঐ আপু ছিলো প্রধান শিক্ষক এর মেয়ে। তাই ভাইয়াটার ওপর যেন গজব পতিত হইলো। আপুর অবস্থা আরো খারাপ। মানসিক চাপ সহ্য না করতে পেরে সে জ্ঞান হারালো। ভাইয়াকে বের করে দেওয়া হলো স্কুল থেকে। আপুও ক্লাস ফাইভ এর পিএসসি পরিক্ষার পর অন্যস্কুলে চলে গেলো। মজার ব্যপার আপু ও ভাইয়া দুজনেই ক্লাস ফাইবে পড়তো। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মানে আপুর বাবার সম্মান থাকলো না আর।
আসলে আমার আম্মুও সেই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা ছিলো। ঐ আপুর সাথে আমি অনেক গল্প করতাম। আপুও আমাকে খুব আদর করতো। তাই আপুটার জন্য খুব মন খারাপ হতো। কিছুদিন পর আমিও সেই স্কুল থেকে অন্য স্কুলে ট্রান্সফার হয়ে গেলাম।
সব ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু ঐ চকলেটের কথা মনে পড়ে গেল আজ। আমি কিন্তু আজও অপেক্ষায় আছি কবে আমার জন্য এক ট্রাক ভর্তি চকলেট আসবে। আমি আর আমার পিচ্চু সেই চকলেট খাবো।
আসলে আমি চকলেটের লোভে আমার আম্মুকেও কিছু বলিনি এই ঘটনা। কিন্তু হইতো অন্য কারো মাধ্যমে সবাই যেনে গেছে।
আমি সত্যিই বলি নি।

বাচ্চাদের চকলেটের লোভ দেখালে, অবশ্যই দিতেও হয়।

লেখকঃ আজফার মুস্তাফিজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here