প্যারালাল ইউনিভার্সের কথা বলার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করি-

আপনার সাথে কি কখনও এমন হয়েছে যে আপনার সামনে কোনও একটা ঘটনা ঘটার সময় আপনার মনে হয়েছে যে আপনি এটা আগে থেকেই জানতেন? অথবা কিছু ঘটার সময় মনে হয়েছে যে এই ঘটনাটা আপনার সাথে এর আগেও ঘটেছে?

যদি হয়ে থাকে তাহলে আপনি প্যারালাল ক্রস ওয়াকের স্বীকার।

আর যদি না হয়ে থাকে তাহলে আমার বলা কথাগুলি আপনার কাছে কিছুটা অবান্তর লাগতে পারে; কিন্তু এটা সত্যি। যদিও বা বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত এর কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পায় নি।

প্যারালাল ইউনিভার্স; শব্দ দুটিকে যদি আমরা আলাদা করি তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় সামন্তরাল বিশ্ব। অর্থাৎ আমাদের এই মহাবিশ্বের মতই একই রকম আরেকটা মহাবিশ্ব। যেখানে কি না সবকিছু একদম আমাদেরই মতোই। তার মানে সেখানে আরও একটা আমি-আপনি রয়েছি। কিন্তু হয়তো একটু অন্য অবস্থায়। হয়তবা এখানে আপনি লিপিকরণে আমার লেখা পড়ছেন আর অন্যদিকে সেখানে হয়তো আপনি আমার সাথে গন্ডগোল করে অনেক আগেই সম্পর্ক চুকিয়ে নিয়েছেন।

শুনতে কি অবাক লাগছে তাই না? এও কি কখনও সম্ভব যে আমাদের মতো ঠিক একই রকমের একটা পৃথিবী; যেখানে কি না আমার-আপনার অন্য এক প্রতিকৃতি বাস করে। যদি অবাক লাগে বা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে না হয় তাহলে একটু ব্যাখ্যায় যাওয়া যাক।

ধরে নিচ্ছি যে আপনি এই পৃথিবীতে আপনার নিজের বাসস্থান ছাড়া আর কোনও জায়গা চিনেন না। তাহলে আসুন প্রথমে একটু পরিচিত হয়ে নেই।

এই যে আমাদের এই পৃথিবী; একটি গ্রহ। এই যে সূর্য, যেটা কি না আমাদের সবসময় আলো দেয়, শক্তির যোগান দেয়; এটি একটি নক্ষত্র। রাতের আকাশ দেখলে আমরা দেখতে পাবো আমাদের পৃথিবীর মত আরও অনেক গ্রহ, সূর্যের মতোই আরও হাজার হাজার নক্ষত্র। যেগুলো আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে। এরকম অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র মিলে তৈরী হয় একটি গ্যালাক্সি।

এরকম আরও লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি গ্যালাক্সি নিয়ে তৈরী আমাদের এই ইউনিভার্স। শুধু এখানেই শেষ নয়। এরকম আরও হাজার হাজার ইউনিভার্স মিলে তৈরী হয় মাল্টিভার্স। এর বাহিরেও আরও কত কি রয়েছে তা আমাদের অজানা। তাহলে একবারের জন্যে কল্পনা করুন তো এই মহাবিশ্বের কোথায় আমি? কোথায় আপনি? আর কোথায় বাকি সবাই? একজনকেও খুঁজে বের করা সম্ভব নয়।

কোথায় থেকে কোথায় চলে গেলাম তাই না? আমাদের টপিক ছিলো প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে। যদিও বা আমি বার বার বলছি প্যারালাল ইউনিভার্স, মাল্টিভার্স। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, বিজ্ঞানে এর কোনও ব্যাখ্যা নেই। এখন পর্যন্ত আধুনিক বিজ্ঞান শুধুমাত্র একটি ইউনিভার্স বা মহাবিশ্বেই বিশ্বাসী। আর বাকিটুকু শুধুই ধারনা মাত্র।

অবশ্য এর অস্তিত্ব সম্পর্কে ইসলামে উল্লেখ রয়েছে। একদিন রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে প্রশ্ন করা হয় যে এই ভূমন্ডলের বাহিরে আর কেও বাস করে কি না। তিনি উত্তরে বলেন যে “হ্যাঁ, এই পৃথিবী ছাড়াও এর বাইরে অন্য আরেক পৃথিবী আছে সেখানেও আমাদের মতই মানুষ বাস করে, সেখানেও একজন রাসুল (সঃ) এবং তার সাহাবীগণ রয়েছেন।” তাই ধারণাতে বিশ্বাসী না হলেও যারা ইসলামে বিশ্বাসী তাদের জন্য অবশ্যই এটি একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ।

প্যারালাল ইউনিভার্স

যাইহোক, আমাদের মতো আরও শত কোটি ইউনিভার্সের মধ্যে একাধিক কিছু ইউনিভার্স একে অন্যের সাথে প্যারালাল বা সামন্তরাল। অর্থাৎ এদের কোনও একটার মাঝে একটা ঘটনা ঘটলে তা অন্যগুলোর ওপরেও রিফ্লেক্টেড হয়। মনযোগ দিন; একাধিক ইউনিভার্স মানে একাধিক পৃথিবী যার মানে একাধিক আমি-আপনি; কিন্তু ঘটনাগুলো হয়ত একটু আলাদা।

যেমন ধরুন এই ইউনিভার্সের আপনি ডান হাতে লিখে অভ্যস্ত আর ওই ইউনিভার্সের আপনি হয়ত বাম হাতে লিখে অভ্যস্ত। উদাহারণ দিতে গেলে বলা যায় যে ধরুন আজকে আপনি বিয়ে করলেন, তাহলে তো আপনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন তাই না?

তো এই খুশির ঘটনাটা হতে পারে যে অন্য ইউনিভার্সের থেকে রিফ্লেক্টেড হয়েছে অথবা এই ইউনিভার্স থেকে রিফ্লেক্ট করে অন্য ইউনিভার্সে হয়ত অন্য কোনও ভাবে প্রকাশ পাবে। যেমন ধরুন আপনি এই ইউনিভার্সে আজকে বিয়ে করলেন কিন্তু হয়ত অন্য ইউনিভার্সের আপনি অনেক আগেই বিয়ে করে ফেলেছেন আর আজকে আপনাদের বাচ্চা হলো।

এখানে দুটোই কিন্তু খুশির সংবাদ; কিন্তু প্যারালাল ইউনিভার্সে এটা একটু আলাদাভাবে রিফ্লেক্ট করলো। আবার ধরুন যে আজকে বাইক থেকে পড়ে আপনার হাত ভেঙে গেছে। দেখা যাবে যে অন্য ইউনিভার্সের আপনার হয়তবা সিঁড়ি থেকে পড়ে পায়ের বদলে হাত ভেঙে গেছে। ঠিক একই রকমভাবে এখানেও আপনার দুঃখের ঘটনাটি একটু আলাদাভাবে এক ইউনিভার্স থেকে অন্য ইউনিভার্সে রিফ্লেক্ট করেছে।

এতক্ষণ যা বললাম তা তো শুধুই অন্ধকারে ঘেরা রহস্য মাত্র। চলুন এখন প্রমাণস্বরূপ একটা বাস্তব ঘটনার কথা বলি।

প্যারালাল ইউনিভার্স

২০০৮ সালের ১৬ জুলাই লেরিনা গার্সিয়া গর্ডো নামের একজন স্প্যানিশ নারী একটি অনলাইন ফোরামে সাহায্যের জন্য পোস্ট করে বসেন। ৪১ বছর বয়সী এই নারী দাবী করেন যে, তিনি একটি প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে এসেছেন। এবং তার দৈনন্দিন জীবনের সাথে তার এই জীবনের কোনও মিল নেই। তিনি রাতে যেই বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন সকালে উঠে দেখেন যে তার বিছানার রং বদলে গেছে এমনকি তার ঘরের পরিবেশও আগের থেকে অনেক পাল্টে গেছে। তিনি বিষয়গুলো দেখে অনেক অবাক হন।

বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসে যাওয়া পর্যন্ত বাকি সব ঠিক ছিলো। কিন্তু অফিসে ঢুকে তিনি আরেকবার আতকে ওঠেন। অফিসে তার কেবিনের দরজার পাশে অন্য কারও নেমপ্লেট এবং তার পাশের কেবিনে তার নিজের নেমপ্লেট বসানো। তার অফিসের কর্মীদের মধ্যেও কাওকে তিনি চিনতে পারেন না।

তিনি এই ভেবে আশ্চর্য হন যে যেই কম্পানিতে তিনি ২০ বছর ধরে বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করছেন সেই কম্পানিতেই তাকে এত বড় একটা ডিমোশন দেয়া হলো তাও আবার তাকে না জানিয়েই। তার কোম্পানির ওয়েবসাইটে ঘাটাঘাটির পর তিনি দেখলেন যে তিনি ওই কম্পানিরই অন্য এক ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজারের অধীনে কাজ করছেন এমনকি তার জব হিস্টোরিতেও তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ ওই পদেই কাজ করে আসছেন।

তিনি এটিকে তার মানসিক সমস্যা মনে করে ডাক্তারের কাছে যান, কিন্তু ডাক্তার তাকে জানায় যে তিনি পুরোপুরি ঠিক আছেন। এই ঘটনার পর তিনি আর কাওকেই বিশ্বাস করতে পারেন না। তিনি ঘটনাটা জানানোর জন্য তার বন্ধু অগাস্টিনকে ফোন করেন কিন্তু ফোনটি ধরে অন্য কেও।

তিনি অগাস্টিনকে চাইলে সে বলে যে সেখানে অগাস্টিন নামে কেও থাকে না। এমনকি তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরেও তিনি সেখানকার ঘটনার কোনও কিছুই মিল খুঁজে পান না। তার কিছুদিন পর তিনি ইন্টারনেটে প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে জানতে পারেন। এবং নিশ্চিত হন যে তিনি প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে এসেছেন। তারপর তিনি একটি অনলাইন ফোরামে তার এই ঘটনা পাবলিশ করেন এবং সেই লেখা বিভিন্ন সংবাদ পত্রিকা এবং বড় বড় ওয়েবসাইটেও উঠে আসে।

শুধু যে এই ঘটনাকেই প্যারালাল ইউনিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্সের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় তা কিন্তু নয়। এরকম আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। কিন্তু সেগুলো হয়তো রহস্যের অন্ধকার ছাপিয়ে উঠে আসতে পারে নি। সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও একবার ক্রস ওয়াকের স্বীকার হয়েছিলাম। কিন্তু সে ঘটনা না হয় বাদই দিলাম।

তা না হয় বুঝলাম কিন্তু সবার প্রথমে যেটা বললাম যে ঘটনা চলার সময় আগে থেকে জেনে যাওয়া বা ঘটতে দেখে মনে হওয়া যে বিষয়টা আগেও কখনও ঘটেছে সে বিষয়ে তো কিছু বলা হলো না!!

ওয়েল, এই বিষয়টাও প্যারালাল ক্রস ওয়াকের মতোই একটা বিষয় যেটা আমাদের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। যদিও বা আমি রাশিফলে বিশ্বাসী না তবে যৌক্তিকভাবে দেখতে গেলে এর সাথে রাশিফলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে আমার মনে হয়। কেও কেও এটা আবার পুনঃজন্মের প্রভাব বলে মনে করে। আসলে এমন কিছুই না। তবে প্রকৃত ঘটনাটা কি তা এখনও কেও উৎঘাটন করতে পারে নি। আর বিজ্ঞানের কথা তো ছেড়েই দিলাম।

পরিশেষে বলতে চাই যে, প্যারালাল ইউনিভার্সে দিয়ে আমাদের কোনও কাজ নেই। আমরা যদি কখনও প্যারালাল ইউনিভার্সে কানেক্টেড হতেও পারি তাহলেও কোনও লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না। তবে আধুনিক বিজ্ঞান দিন দিন বিকশিত হোক এবং মহাবিশ্বকে আরও ভালোভাবে আবিষ্কার করুক তা আমাদের সবারই কাম্য। তবে জীবন পাল্টানোর জন্য ক্রস ওয়াকের মতো কোনও মিরাক্কেলের প্রয়োজন আমাদের নেই।

জীবনে বড় কিছু করতে হলে নীল আকাশটার দিকে মাথা তুলে তাকান, বুক ভোরে নিশ্বাস নিন আর নিজের লক্ষের পথে ছুটে চলুন। কি জানি, এই পৃথিবীতে আপনার উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা ওই প্যারালাল পৃথিবীর আপনাকেও তো রিফ্লেক্ট করতে পারে… 😉

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here