২৩জুন- এই দিনের এক ইতিহাস আছে, অনেক বছর আগের ইতিহাস, ২৬৩ বছর আগের ইতিহাস। কী হয়েছিল সেদিন? উপমহাদেশের পরাজয় হয়েছিল ইংরেজদের কাছে। বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা সেদিন ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন। আর সেই সাথেই বাংলা পরাধীন হয়ে যায়, ইংরেজদের হাতে চলে যায় ক্ষমতা।

নবাবকে শেষ স্বাধীন নবাব বলা হয়ে থাকে কারণ তার পরাজয়ের পরেও বাংলায় নবাব ছিল কিন্তু তা ছিল নামে মাত্র। তাদেরকে নবাব সাজিয়ে রেখে ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন ইংরেজরা। সবকিছু ছিল তাদের হাতে, তাই আক্ষরিক অর্থে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা। যার রাজত্ব শেষ হয়েছিল ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, পলাশীর প্রান্তরে, নিজের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতায়।

সেদিন নবাবের বিপক্ষে ছিলেন তার রাজসিংহাসনের লোকজন, তার প্রধান সেনাপতি এমনকি তার আপন খালাও। নবাব পরিবারের নাতি সিরাজ যে নানা আলিবর্দি খানের পরবর্তীতে বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার নবাব হবেন- এমনটা সিরাজের ছোটবেলা থেকেই অনুমেয় ছিল। আর তখন থেকেই প্রকাশে কিংবা আড়ালে তার বিরোধিতা করেছেন নবাব আলীবর্দি খানের বড় মেয়ে এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার বড় খালা ঘষেটি বেগম।

কেননা তার নিজের এই সিংহাসনের প্রতি প্রবল লোভ ছিল। কিন্তু নিজের ইচ্ছাকে আড়ালে রেখে তিনি তার আরেক বোনের ছেলে শওকত জংকে নবাব করার কথা বলেন। বোনের ছেলে হলেও শওকত জং ঘষেটি বেগমের নিজের ছেলে হিসেবে বড় হয়েছিল কারণ তিনি ছিলেন সন্তানহীন। নির্বোধ শওকত জং নবাব হওয়া মানে আসলে সেটা ঘষেটি বেগমের কাছেই দায়িত্ব চলে আসা, ধূর্ত ঘষেটি সেটা ভাল করেই জানতেন।

নবাব আলিবর্দি খানের সেনাপতি ছিলেন জাফর আলী খান, যিনি মীর জাফর নামে পরিচিত। তার নিজেরও লোভ ছিলো নবাবের মসনদের প্রতি। সিরাজউদ্দৌলাকে পরবর্তী নবাব ঘোষণার প্রস্তাবে তিনি কোনদিনও সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিন্তু মুর্শিদাবাদ দরবারের প্রভাবশালী একটা বড় অংশ কেন শামিল হয়েছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে? কোন কারণে তারা হাত মিলিয়েছিল ইংরেজদের সঙ্গে?

এই প্রশ্নের জবাবে ঐতিহাসিকেরা বলেছেন, বেপরোয়া ও দুঃসাহসী তরুণ সিরাজউদ্দৌলা নবাব হওয়ার পর তার অমাত্যগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ শঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেন এবং কিসের জন্য তাদের এই শঙ্কা? একটু খুলেই বলা যাক।

জগৎশেঠরা বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছিলেন একচেটিয়া ব্যবসার ফলে। তারা ছিলেন টাকশালের একচ্ছত্র অধিকারী, পুরোনো মুদ্রাকে নতুন মুদ্রায় পরিবর্তন করার একচেটিয়া ব্যবসায়ী, বাট্টা নিয়ে অন্য জায়গায় মুদ্রা বিনিময় করার কারবারি এবং রাজস্ব আদায় করার দাপুটে কর্তৃত্বের অধিকারী। সিরাজের পূর্ববর্তী বাংলার নবাবদের আমলেই সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তারা এমন বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক হয়েছিলেন।

একইভাবে উমিচাঁদের সোরা, শস্য ও আফিমের একচেটিয়া ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। বণিক খোঁজা ওয়াজিদের লবণ ও সোরার ব্যবসাও তখন আকাশচুম্বি। কিন্তু সিরাজ নবাব হওয়ার পর এতদিন তারা যেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করছিলেন, সেসব থেকে তারা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করতে লাগলেন। তাদের পাশাপাশি শঙ্কিত হয়ে উঠলেন মীরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লতিফের মতো অভিজাত সেনানায়ক ও ভূস্বামীগোষ্ঠি। উল্লিখিত ব্যবসায়ী শ্রেণির সঙ্গে যাদের গড়ে উঠেছিল প্রায় আত্মার আত্মীয়ের মতো সম্পর্ক।

তাদের এই আশঙ্কার মূলে ছিল সিরাজউদ্দৌলার সেই পদক্ষেপ, যার ফলে মীর বকশির পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল মীরজাফরকে, মানিকচাঁদকে দেওয়া হয়েছিল কারাদণ্ড, দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী হাকিম বেগকে করা হয়েছিল বিতাড়িত। বিশেষ করে হাকিম বেগকে অপসারণ করার ফলে এই ধারণা বদ্ধমূল হলো যে, নবাব আলিবর্দির একান্ত অনুগ্রহভাজন ও তার প্রিয়পাত্রদেরও পদচ্যুত বা ক্ষমতাচ্যুত করতে, তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না যুবক নবাব। এই আশঙ্কা চাপা থাকেনি। বস্তুত নবাব সিরাজের যত দুর্বলতাই থাকুক না কেন, তিনি এটা স্পষ্ট বুঝেছিলেন যে ইংরেজদের উদ্ধত আচরণ সংযত করা না গেলে ভবিষ্যতে তারা ভয়াবহ দানব হয়ে উঠবে। পরে নবাবের পরাজয়ের ভেতর দিয়ে দিনে দিনে সেটাই প্রমাণিত হতে শুরু করে।

ফলে এহেন ইংরেজবিরোধী সিরাজের বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন বাকিরা। জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মীর জাফররা যেমন তরুণ নবাবকে মসনদচ্যুত করার লক্ষ্যে ইংরেজদের সঙ্গে সখ্য স্থাপনে এবং প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আঁতাত করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন, তেমনি ইংরেজপক্ষও এই সুযোগ গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র পিছ-পা হলো না। বরং ষড়যন্ত্রের ঘোঁট পাকানো শেষে তারা অচিরেই সজ্জিত হলেন সামরিকভাবে এবং তার পরিণতিতেই পলাশীর যুদ্ধ।

আগেই সন্ধি হয়েছিল, যুদ্ধে সিরাজ পরাজিত হলে বাংলার নবাব হবেন মীর জাফর। পবিত্র কোরআন শরীফ ছুঁয়ে তিনি শপথ করেছিলেন, এই যুদ্ধে তার দলবল নিয়ে তিনি নিষ্ক্রিয় থাকবেন। হয়েও ছিল তা-ই। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নামে মাত্র যুদ্ধে, যাকে ‘হাতাহাতি’ পর্যায়ের যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন কেউ কেউ, তাতে পরাজিত হয় সিরাজের বিশাল বাহিনী এবং সেটা হয় কেবল মীরজাফর ও তার অধীন সেনাবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই। সেদিন তারা কেউই নবারের পক্ষে যুদ্ধ করেনি।

নবাবের সেনাবাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনা সংখ্যা ছিল অনেক কম। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা না হলে নবাবের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

মীর মর্দান ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। ফলে বাংলার স্বাধীনতা প্রায় দু’শ বছরের জন্য অস্তমিত হয়। নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার বা মতান্তরে এক লাখ সেনা আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীর জাফর, রায় দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যত কোন অংশগ্রহণই করেনি।

আর সেই পরাজয়ে বাংলার স্বাধীনতা শেষ হয়েছিল, উপমহাদেশ ইংরেজদের হাতে চলে গিয়েছিল, প্রায় ২০০ বছর (১৯০) বছর ইংরেজরা এই দেশকে শাসনের নামে শোষণ করে। উপমহাদেশের ভাণ্ডারকে খালি করে দেয়। তাই ২৩ জুন বাংলার ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here