১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে। যুদ্ধ শেষে সমস্ত শহীদদের শনাক্ত করা কিংবা সম্মানিত করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। চারটি বিশেষ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সম্মানিত করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্মান হচ্ছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’। যেখানে সম্মানিত হয়েছেন সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
যাদের ব্যাপারে আমাদের জানাশোনা খুবই কম, আবার তাদের ব্যাপারে জানলেও আমরা জানি না তাদের পরিবারের কথা। যাদের আত্মত্যাগের জন্যই বীরশ্রেষ্ঠরা দেশের জন্য লড়াই করার সাহস পেয়েছিল। সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন হলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান।
তার স্ত্রী মিলি রহমানের লেখা দুইটি বইয়ের মধ্যে জানা গিয়েছিল মতিউরের যুদ্ধ পরিকল্পনা, তার পরিবারের সহযোগিতা এবং নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের ওপর চলা শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচারের কথা।

মতিউরের যুদ্ধ পরিকল্পনাঃ

১৯৭১ সালে মতিউর রহমান ছিলেন পাকিস্তানের একজন বৈমানিক। তার কাজ ছিল ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেয়া। দেশে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, মতিউর তখন ছিলেন ছুটিতে নিজের গ্রামের বাড়িতে। যুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি দেখতে পান যে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দুটি সেভর জেট আকাশ থেকে গুলি ছুড়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে।
একজন বিমান চালক মতিউর তা সহ্য করতে পারেননি। তিনি মনে মনে চিন্তা করেন একটি বিমান জোগাড় করতে পারলে তিনি দেশের জন্য কিছু করতে পারবেন, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু বিমান পাওয়া তো মুখের কথা নয়, তাকে পাকিস্তান ফিরে যেতে হবে এবং সেখান থেকে কৌশলে বিমান ছিনতাই করতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি যুদ্ধ চলাকালীন সময় বউ-বাচ্চাদের নিয়ে পাকিস্তান চলে যান।

পাকিস্তানে মতিউর রহমানঃ

পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে মতিউর রহমান প্রথমে আশাহত হয়েছিলেন, কাজে যোগদান করে তিনি জানতে পারেন তাকে ফ্লাইট ইন্সট্রাকটরের কাজ বাদ দিয়ে ফ্লাইট সেফটি অফিসের কাজ দেয়া হয়েছে। আশাহত হলেও, ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে থাকেন কী করা যায়। তখন কোন বাঙালি পাইলটের অনুমতি ছিল না বিমান চালনার। এমনকি বিমানের কাছাকাছি যাওয়ারও অনুমতি ছিল না।
তবে ভাগ্যবশত মতিউর রহমানের কাজ করতেন বিমান উড্ডয়ন নিরাপত্তার দায়িত্বে, মানে কোন বিমান ওড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে রানওয়ে দিয়ে চলা শুরু করে দিলেও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তা থামিয়ে দিতে পাররেন মতিউর। যেহেতু তিনি আগে বিমান প্রশিক্ষক ছিলেন এবং তার অনেক ছাত্র ছিল তাই নতুন কাজে সঠিক সুযোগের আশায় ছিলেন তিনি।
একদিকে বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা অন্যদিকে নিজের স্ত্রীকেও মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখছিলেন তিনি। দুই মেয়ে মাহিন এবং তুহিনের মায়ায় পড়ে যাতে দুর্বল না হয়ে পড়েন সেই দিকেও খেয়াল রাখছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল যখন বিশেষ পরিচিত কোন ছাত্র বিমান নিয়ে উড়তে যাবে, তখনই তিনি তাকে রানওয়েতে থামিয়ে পাইলটসহ বিমানটি ছিনতাই করে ভারতের উদ্দেশে উড়িয়ে নিয়ে যাবেন এবং সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া পাকিস্তানি পাইলটের সঙ্গে নিজের পরিবারকে বদল করতে সরকারকে চাপ দিবে। তার মানে যেই পাকিস্তানি পাইলটকে জিম্মি করে মতিউর ভারতে চলে যাবেন, তাকে যখন পাকিস্তান সরকার ফেরত চাইবে তখন মতিউর পাকিস্তানে রেখে যাওয়া তার পরিবারকে ফেরত চাইবেন।

মতিউরের বিমান ছিনতাইঃ

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট শুক্রবার অবশেষে মতিউর রহমানের সামনে বিমান ছিনতাইয়ের সুযোগ আসে। সেদিন বিমান চালানোর কথা তার অনেক পরিচিত এবং প্রিয় ছাত্র মিনহাজের। পাইলট যখন বিমান চালানোর প্রস্ততি নেয়া শুরু করেন তখন মতিউর পাইলটকে ইশারা করে প্লেন থামানোর জন্য। মিনহাজ থামায় এবং মতিউর দ্রুত পায়ে প্লেনের দিকে এগিয়ে যান।
মিনহাজ যখন প্লেন থেকে মুখ বের করে জানতে চায় কী সমস্যা, তখন মতিউর ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল দিয়ে তার নাক মুখ চেপে ধরে, মিনহাজ জ্ঞান হারায় আর মতিউর লাফ দিয়ে প্লেনের পেছনের সিটে বসে উড়াল দেন। কিন্তু মিনহাজ জ্ঞান হারানোর আগেই মাইক্রোফোনে বলে ফেলেন, আমার বিমান হাইজ্যাক হয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে সেই T-33 বিমানকে ধরার জন্য F- 86 ও হেলিকাপ্টার ছুটতে শুরু করে, কিন্তু মতিউর অনেক নিচ দিয়ে বিমান চালাচ্ছিল তাই তার বিমানকে ধরা যায়নি। বিমানটি ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি চলে আসলে মিনহাজের জ্ঞান ফিরে আসে এবং সে বুঝতে পারে বিমান ভারতের দিকে চলে যাচ্ছে। তাই সে মতিউরকে বাধা দিতে চেষ্টা করে। তাদের দুজনের টানাটানিতে বিমানটি ক্রমেই নিচের দিকে পড়তে শুরু করে এবং একপর্যায়ে বিমানটি একটি বালিয়ারীতে যেয়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় এবং সেখানেই মৃত্যু হয় বাংলার বীর সন্তান মতিউর রহমানের।

পরবর্তী সময়ে মতিউরের পরিবারঃ

দুদিন পর, ২২ তারিখ সকালবেলা পাকিস্তানি অফিসাররা মতিউরের স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং তাদের সঙ্গে থাকা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে দূরে এক জায়গায় ছোট কালো ঘরে বন্ধী করে রাখে। ঘরে শুধু দুটো দড়ির খাট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মিলি রহমানের অনুরোধে তার বাড়ি থেকে কিছু জিনিস আর তোষক এনে দেয়া হয়।
সেখানে এক কষ্টের জীবন ছিল মিলি রহমান এবং তাদের বাচ্চাদের। প্রতিদিন বাচ্চাদের পাশের ঘরে আটকে রেখে মিলি রহমানের জিজ্ঞাসাবাদ চলতো। মতিউর রহমান কী করতেন? কী ভাবতেন? কাদের সঙ্গে মিশতেন?- মিলি রহমান খুব সাবধানে উত্তর দিতেন। প্রতিদিনই মিলি রহমান পাশের ঘর থেকে বাচ্চাদের কান্নার শব্দ পেতেন কিন্তু তাকে উঠতে দেয়া হতো না।
তাকে নানাভাবে মানসিক কষ্ট দেয়া হত, নানান ভুল খবরে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হতো, যাতে তিনি সব সত্য কথা বলে দেন। এমনকি তিনি সত্যি কথা না বললে মতিউর রহমানের পরিবারের সবাইকে মেলে ফেলার কথা বলা হতো। এছাড়াও মিলি রহমানের পরিবারের মৃত্যুর সংবাদও দেয়া হয়। এত মানসিক চাপেও নিজেকে শক্ত রেখেছিলেন মিলি রহমান।
তার বাচ্চাদের খাবারের জন্য দেয়া হতো মোটা আটার রুটি ও ভাজি। বাচ্চাদের প্রস্রাবের কিংবা গোসলের কাপড় সব ধুয়ে শুকানোর জায়গা দেয়া হয়নি। অনেক কষ্টে বাইরের গার্ডকে রাজি করিয়ে বাইরে কাপড় রোদে দেয়া হয়েছিল।
একে ছিল কালো ঘর, লাইট চলে গেলে অন্ধকার ঘরে ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করলেও সেই ঘরে কোন ম্যাচ কিংবা মোমবাতি দেয়া হতো না। বাচ্চাদের নিয়ে মিলি রহমান অন্ধকার ঘরে বসে থাকতেন। রোজ ডাল, রুটি ভাজি খেয়ে বাচ্চাদের কলেরার মত হয়ে যায়। সারাদিন বমি আর পায়খানা। ছোট ঘরে মেঝে ভর্তি বমি, কোনরকম কাপড় পেঁচিয়ে পরিষ্কার করা হতো, কোন ঝাড়ু ছিল না। ওষুধ চেয়ে চেয়ে চারদিন পরে একটা বোতলে লাল রঙের সিরাপ দেয়া হয়, উপায় না পেয়ে তাই খাওয়াতে হয়েছিল। ঠিক এতটাই কষ্টে ছিলেন মিলি রহমান তার বাচ্চাদের নিয়ে, মতিউর রহমানের মৃত্যুর পরে।
অবশেষে মাসখানেক পর মিলি রহমানের মুক্তি মেলে বন্দী দশা থেকে এবং অনেক অনুনয় বিনয় করে ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মিলি রহমান সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সঙ্গে তাদের পরিবারকেও যে কত ত্যাগ সহ্য করতে হয়েছে, মিলি রহমান ছিলেন তার উদাহরণ।
মতিউর রহমানকে পাকিস্তানিরা গাদ্দার (বিশ্বাসঘাতক) বলে আখ্যা দিয়েছিল। মতিউরের ছবির পাশে থু থু দিতো তারা, মতিউর রহমানের কবর অফিসারদের জন্য রাখা স্থানে দেয়া হয়নি, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের যেখানে কবর দেওয়া হয়, সেখানে তাকে কবর দেয়া হয়েছিল।
এভাবেই আমাদের বীরকে পাকিস্তানিরা চূড়ান্তভাবে অপমান করেছিল কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাকে দিয়েছে বীরের সম্মান, ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব। পরে তার মরদেহও ফিরিয়ে আনা হয়েছে দেশে এবং যথাযথ সম্মান দিয়ে সমাহিত করা হয়েছে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here