নিজের ২৫ বছরের এই জীবনে নিজেকে এত তুচ্ছ আর অসহায় মেহেদির কোন দিন মনে হয়নি, বার বার মনে হচ্ছে তার জন্ম টাই বৃথা।তার ২0 বছরের এত শিক্ষা কোন কাজেই আসলনা।মেহেদির বাবা নেই,ঘরে তার বয়স্ক মা, রোগে ভুগছে আজ অনেক দিন যাবত।

সংসারের অভাবকে সাথে নিয়ে জীবনে লড়াই করছে মেহেদি।এত দিন টিউশন করে নিজের সংসার আর পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে।পাশ করে চাকুরীর জন্য পরীক্ষা দিয়েই চলছে।কিন্তু চাকরি নাকি কপালে না থাকলে হয়না,চাকরির বাজারের নিয়ন্ত্রক নাকি মামা চাচারা।কিন্তু মেহেদির দুই কুলেই কেউ নেই।যুদ্ধের সময় সবই হারিয়েছে।

হুট করে মেহেদির বৃদ্ধা মা আজ সকালে বলে বাবা আমাকে একদিন শহীদ মিনার দেখাতে নিয়ে যাস। মরার আগে অন্তত একবার শহীদ মিনার দেখে যেতে চাই। আজ বাংলায় কথা বলছি যাঁদের জন্য, তাদের একবার সালাম জানাতে চাই।মেহেদি অবাক হয়!তার মায়ের ভাষাপ্রেম দেখে ! ভাবে জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের যুগে জন্মেও ভাষাকে হৃদয় থেকে গ্রহণ করতে পারিনি। সুযোগ পেলেই ভাষাকে বিকৃত করতে দ্বিধা করিনা।হয়ে যাই রেডিও জকির মত বাংলিশ ভাষার ধারক বাহক। মনে মনে মেহেদি অনেক বেশি লজ্জা পেল।অভাবের সংসারে যেখানে পেটে খাবার পরেনা,ঠিকমত বেঁচে থাকাই দায় সেই রকম এক সংসারে থেকেও মায়ের এমন চিন্তা!সত্যি বড় অদ্ভুত এই বাংলা ভাষার টান। চাইলেও এড়ানো যায় না।
মেহেদি ভাবে হাতে টাকা নেই। শহরে যেতে অনেক টাকার দরকার । আগে একটা রোজগারের ব্যবস্থা হোক তারপর না হয় মাকে শহীদ মিনার দেখাতে নেয়া যাবে।মেহেদি ঢাকা যায়,দিনের পর দিন কেটে যায় কিন্তু চাকরি নামক সোনার হরিণ এর দেখা সে পায়না,হাতে টাকা হয়না,অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়ে উঠেনা। জীবনের হতাশা আর মায়ের অসুখ দুই ই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে।অনেক কস্টে নিন্ম শ্রেণীর এক চাকুরী নিয়ে মেহেদি গ্রামে পৌঁছায় অনেক আশা নিয়ে।মাকে শহরে নিয়ে আসবে তার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা হবে আর সামনেই তো ২১ ফেব্রুয়ারি!! এই তো সুযোগ মাকে সাথে নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাবে সে।বাড়ী ফিরে মেহেদি দেখে মা বিছানায় সজ্জা নিয়েছে।মায়ের মুখে কোন কথা নেই।শুধু একবার চোখ খুলে অস্ফুট স্বরে বলে,বাবা আমার মনে হয় শহীদ মিনার আর দেখা হলোনা। মা আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেলো।২১ বছর পরে মেহেদি আজ প্রতিষ্ঠিত কিন্তু সেই দিন স্বামী হারা গরীব অসহায় মাকে সে কোন সুখ দিতে পারেনি।প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেরে শহীদ মিনারে বসে মায়ের কথা স্মরণ করে অঝোরে কাঁদে আর ভাবে সেই দিন মাকে শহীদ মিনার দেখানো হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here