বৈশাখ

পহেলা বৈশাখ শুধু মাত্র বাঙালীদের উৎসব, এই ভাবনা টা ভুল।দক্ষিণ আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে নববর্ষ পালন করা হয়। মজার ব্যাপার হল এদের প্রায় সবাই ভিন্ন ধরণের ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। কেউ সৌর, কেউ চান্দ্র, কেউ শিখ আবার  কেউ বুদ্ধিস্ট ক্যালেন্ডার অনুসরণ করেন। তবে প্রায় সবাই এপ্রিল ১৩ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে তাদের নতুন বছরের উৎসব উদযাপন করে। এদের কারো কারো উৎসবেও অনেক মিল দেখা যায়।

আসামের উৎসব বিহু

অহমিয়া বা আসামিজদের নতুন বছরের উৎসব বিহু উৎসব নামে বিখ্যাত। এটি অহমিয়াদের অন্যতম একটা প্রধান উৎসব। টানা সাতদিন ধরে এই উৎসব চলে। তবে এই উৎসব শুরু হয় চৈত্র মাসের শেষদিন থেকে। এইদিন আসামের নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক মেখলা পরে বিহু নৃত্য করে। যার নাচ সবচেয়ে ভালো হয় তাকে বিহু কুয়ারি উপাধি দেয়া হয়।  অহমিয়া সংস্কৃতি পুরোটাই কৃষি নির্ভর আর তাই বছরের এই সময়ে ফসল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে তারা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। একসময়  এই আনন্দ চলতো এক মাস অব্দি!

পাঞ্জাবি নতুন বছর

পাঞ্জাবের নতুন বছরের উৎসবকেও বৈশাখী উৎসব বলে ডাকা হয়। এইদিনটি এখন পাঞ্জাবের সীমা ছাড়িয়ে শিখ অধ্যুষিত সকল অঞ্চলের একটি উৎসব হয়ে উঠেছে। নানকশাহি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পাঞ্জাবের শিখেরা ১৪ এপ্রিল বছরের প্রথম দিন পালন করে। কৃষকেরা নতুন ফসল ঘরে তোলে আর এই আনন্দকে ধরে রাখতে এইদিন তারা নগরকীর্তন, ভাংড়া এবং গিদ্দা  নেচে শহরের রাস্তায় আনন্দধারা বইয়ে দেয়।  গুরুদুয়ারায় লঙ্গরে সবাইকে খাবার পরিবেশন করা হয় এইদিন।

নেপালি নববর্ষ

নেপালিরাও তাদের নতুন বছর আগমনের উৎসবকে নববর্ষ বলে। আরো মজার বিষয় হল তাদেরও বছরের প্রথম মাসের নাম বৈশাখ। যদিও তাদের ক্যালেন্ডার চান্দ্রমাসের হিসেবে গণনা করা হয়। এইদিন নেপালিরা রাস্তায় প্যারেড করে, প্রিবারের লোকজনেরা একত্র হয় আর ঘরে ঘরে নানান পদের নেপালি রান্নার আয়োজন থাকে। নেপালিদের কাছে এই উৎসবের ধর্মীয় গুরুত্বও আছে। আর তাই তারা এইদিন পূজা অর্চনাও করে। এছাড়া যুবকরা  তাদের আঞ্চলিক ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলায় অংশগ্রহন করে এইদিন। সব মিলিয়ে সারাদিন নেপালের রাস্তায় আনন্দময় কোলাহলে ভরে থাকে বৈশাখের প্রথম দিন।

শ্রীলংকান নতুন বছর

এপ্রিলের ১৩ আর ১৪ এই দুইদিন সিংহলের বৌদ্ধ আর তামিল হিন্দুরা সবাই নতুন বছরের  উৎসব করে। ১৩ তারিখ পুরনো বছরের শেষ দিন আর ১৪ তারিখ নতুন বছরের প্রথমদিন হিসেবে এই দুই জাতিগোষ্ঠিই নিজ নিজ ধর্ম আর ঐতিহ্য অনুযায়ী পালন করে থাকে। উৎসবের অংশ হিসেবে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে তারা নানান রকম হারবাল মিশিয়ে গোসল করে। নতুন বছরের প্রথম মুহূর্ত দিনের ঠিক কোন সময় থেকে শুরু হবে এটা ঠিক করে দেয় জ্যোতিষিরা। নির্দিষ্ট মুহূর্তে আতশবাজি  পুড়িয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।   তারপর চুলোয় আগুন দিয়ে দুধ জ্বাল করা  হয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। এইদিনের বিশেষ খাবার হল কিরিভাত তথা দুধভাত। কিরিভাতের সাথে থাকে নানান রকম ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। শ্রীলঙ্কা এইসময় অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সবুজ থাকে। তাজা সবজি আর ফলের সমারোহ এবং পাখির কুজনে নতুন বছর আসে সিংহলের পথেঘাটে।

বার্মিজ বর্ষবরণ

মিয়ানমারেরর বর্ষবরণও শুরু হয় ১৩ এপ্রিল এবং শেষ হয়ে ১৬ এপ্রিলে। থাইদের মত বার্মিজরাও পানি ছিটানোর উৎসব করে। বার্মিজদের নববর্ষ উৎসবকে তাই থিঙ্গিয়ান ওয়াটার ফেস্টিভালও বলে। পুরনো বছরের জীর্ণতাকে ধুয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করার জন্যে বার্মিজরাও পানি ছিটিয়ে দেয় সব জায়গায়। বার্মিজদের পানি উৎসব থাইদের চেয়েও বড় পরিসরে হয়। এখানে শহরের মোড়ে মোড়ে পানি ছিটানোর জন্যে মঞ্চ তৈরি করা হয় এবং শহরের প্রতিনিধিরা শহরে আসা লোকেদের গায়ে পানি ছিটিয়ে দেয়। তারা বিশ্বাস করে এতে ওই মানুষটির আগের বছরের সব পাপ ধুয়ে মুছে যায়। এইসময় মিয়ানমারের আবহাওয়া সবচেয়ে গরম থাকে, তাই রাস্তাঘাটে পানি ছিটিয়ে দেয়ার উৎসবটি  প্রশান্তি দেয়। প্রচন্ড গরমে খুব দ্রুতই  গায়ের কাপড় শুকিয়ে যায়। এছাড়া থিঙ্গিয়ান নৃত্য করে আর  মাছ কিনে নদী বা পুকুরে ছেড়ে দিয়ে নববর্ষ উদযাপন করে বার্মিজরা। এইসময় বার্মিজরা তাদের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘মোন্ট লোন ইয়ায়ে পাও” পরিবেশন করে। পরিবারের সবাই মিলে ঘরে এই মিষ্টি বানানোও উৎসবের অন্যতম অংশ।  এটি ৫০০ বছরের পুরনো উৎসব।

শ্যামদেশের সংক্রান

থাইদের নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসবের সময় যদি আপনি থাইল্যান্ডে থাকেন তাহলে মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন। যে কোন সময় আপনার গায়ে পানি ঢেলে দেয়া হতে পারে। থাই সংক্রান উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল পানি।  থাইল্যান্ডে বছর শুরুর উৎসবকে বলে সংক্রান। এটি সংস্কৃত শব্দ সংক্রান্তি থেকে এসেছে। এর অর্থ পরিবর্তন।  প্রতিবছর ১৩ এপ্রিল শ্যামদেশে মেতে ওঠে সংক্রান উৎসবে। উৎসব শেষ হয় ১৫ এপ্রিল বছর শুরুর প্রথম দিনে। এই তিনদিন  তারা ঘর পরিষ্কার করে, পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বিভিন্ন থাই ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করে। সব মিলিয়ে এই সময়টাতে রঙিন থাইল্যান্ড হয়ে ওঠে আরও রঙিন আর উৎসব মুখর।  এই তিনদিন থাইরা রাস্তাঘাটে পানির বালতি, জগ, ফায়ার গান, পিচকারি নিয়ে ঘুরে। একে অন্যের গায়ে পানি ছিটিয়ে দেয়। তাই এই উৎসবকে পানি ছিটানো উৎসবও বলে। পানি ছিটানোর পাশাপাশি তারা রাস্তায় নেচে গেয়ে বেড়ায়, ডিজে পার্টি এবং ঐতিহ্যবাহী নানান অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এ বছর থাই ক্যালেন্ডারে ২৫৬১ সাল। থাইরা গৌতম বুদ্ধের জন্মসাল থেকে বছর গুনে আসছে।

কম্বোডিয়ান নতুন বছর

কম্বোডিয়ার সবচেয়ে আনন্দময় উৎসব হল তাদের নতুন বছরের প্রথম দিনটি। তারাও এপ্রিলের ১৪ তারিখে নতুন বছরের আগমন উদযাপন করে।  এইসময় কৃষকরা নতুন ফসল ঘরে তোলে এবং ঐতিহ্যবাহী নাচ আর খেলায় তিনদিন তারা মেতে থাকে। একে অন্যকে রাঙিয়ে, পানিতে ভিজিয়ে তারা উৎসবে অংশ নেয়। কম্বোডিয়ানরা বুদ্ধিস্ট ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে এবং তাদের নতুন বছর উদযাপনের সাথে ধর্মীয় উদ্দীপনাও জড়িয়ে রয়েছে। তাই তাদের কাছে এই উৎসব শুধু ঐতিহ্যের নয় ধর্মেরও অংশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here