FB IMG 1597206234060

“ওরা যে-তরুণীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছে, তাকে জড়িয়ে ধরেছে দস্যুর মতো।
আমার তরুণীকে আমি জড়িয়ে ধরেছি শুধু স্বপ্নে।
ওরা যে নারীকে কামনা করেছে, তাকে ওরা বধ করেছে বাহুতে চেপে।
আমার নারীকে আমি পেয়েছি শুধু স্বপ্নে।
চুম্বনে ওরা ব্যবহার করেছে নেকড়ের মতো দাঁত।
আমি শুধু স্বপ্নে বাড়িয়েছি ওষ্ঠ।
আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে।
আমার চোখ যা দেখতে চেয়েছিলো, তা দেখতে পায় নি।
আমার পা যে-পথে চলতে চেয়েছিলো, সে-পথে চলতে পারেনি।
আমার ত্বক যার ছোঁয়া পেতে চেয়েছিলো, তার ছোঁয়া পায়নি।
আমি যে-পৃথিবীকে চেয়েছিলাম, তাকে আমি পাইনি।
তখনো আমার সময় আসেনি।
আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে।”

আজ কবি,ঔপন্যাসিক,ভাষাবিজ্ঞানী,সাহসী সমালোচক,কলাম্নিস্ট ডক্টর হুমায়ুন আজাদের প্রয়াণদিবস।মনেপ্রাণে তিনি ধারণ করতেন প্রথাবিরোধীতার অঙ্গার।তিনি বেঁচে ছিলেন অন্যদের সময়ে,প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে।সেই অন্ধকারের মধ্যে অনেক মানুষের অস্বস্তির কারণ,বিরাগভাজন হয়েও তিনি বলে গেছেন তার কথা—তার স্বর শুনলে মনে হয়,তিনি আবৃত্তি করছেন ‘রোম্যান্টিক’ রবীন্দ্রনাথের কোনো সুললিত কবিতা,কিন্তু বক্তব্যে তিনি বিস্ফোরক,নিদারুণ আগ্নেয়।নিজে যা বিশ্বাস করতেন,তা অকপটে চাঁচাছোলা ভাষায় বলতে তার দ্বিধা ছিলো না,তা কারো গাত্রদাহের কারণ হোক,বা না হোক।তার চোখে সকল ধরণের গোঁড়ামি,প্রথানুগত্যের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন স্পষ্টভাষায়,কখনো সোচ্চার হয়েছেন সাহিত্যের সতীত্বের প্রশ্নে।নির্ভয়ে সত্য কথা বলা মানুষের সংখ্যা যখন ভয়াবহ রকমের কম,সমাজের মাথা’রা যখন ব্যস্ত স্তাবকতায়,নির্লিপ্ততায়,অপরিণামদর্শীতায়—হুমায়ুন আজাদ তখন বলেন,‘বুদ্ধিজীবীরা আজ তিন গোত্রে বিভক্ত—ভণ্ড,ভণ্ডতর এবং ভণ্ডতম’—কিংবা ‘এ দেশের মানুষ সিংহের প্রশংসা করে,কিন্তু পছন্দ করে গাধাকেই’।সবকিছু যে নষ্টদের অধিকারে যাচ্ছে না—বুকে হাত দিয়ে সে কথা বলতে আমাদের আজও বাধে,কারণ আমরা তা দেখতে পাচ্ছি সচক্ষে,আজাদ বহুকাল আগে দেখেছিলেন তার জ্যোতির্ময় মনশ্চক্ষে।

হুমায়ুন আজাদ আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন অনেক।তিনি আমাকে শিখিয়েছেন সাহিত্য—দর্শনে—আদর্শে কাউকে ‘নবী’ মানতে নেই,সকলকে তিনি দেখতে চেয়েছেন দ্বান্দ্বিকতার ছাঁকন কাগজে।তিনি লিখেছেন,

‘ভক্ত কখনো আমি হ’তে পারিনি, যদিও আমি অনেকেরই অনুরাগী।’

হুমায়ুন আজাদকেও আমি পড়তে চেষ্টা করেছি তার শেখানো পন্থাতেই।আমার ‘হুমায়ুন আজাদ’ দেবতা নন,তিনি মধ্যবিত্ত ঘরের ‘বাবা’র মতো,দোষ—গুণে মেশানো মুক্তচিন্তার একজন অগ্রনায়ক।বাঙালি’কে তিনি ভালোবেসেছেন অন্য সবারচে’ বেশি,সমালোচনাও করেছেন অন্যদের চেয়ে অনেক জোরালো ভাষায়।তার গদ্যের প্রবাহ,মাত্রা,যতি যেমন অসাধারণ,তেমনি তীক্ষ্ণ তার ভাষা।ভেতরটা তছনছ করে দেয়ার যে বলিষ্ঠতা তিনি ধারণ করেন,যে প্রলয়ঙ্কর তীব্রতা তিনি সঞ্চার করেন তার লেখায়—তা থেকে আমি প্রেরণা পাই সমকালের দুস্থ জীবনের ব্যর্থতাকে সমূলে সংশোধন করার।তিনি শেখান সাহিত্য কেবল ভাষার ব্যায়াম নয়,পুরোদস্তুর শিল্পমাধ্যম—কেবল কাহিনী সাজানো যার উদ্দেশ্য নয়,যার শৈল্পিকতা নিহিত মননের গভীরতায়,বোধের উৎকর্ষতায়—আজাদ আমাকে শিক্ষা দেন
কারো বৌদ্ধিক দাসত্ব না করতে,সবার মতের-সবার চিন্তার বাইরে যে পথ—যে পথ পপুলিজমের নয়,নয় স্তাবকতারও—সেই পথে হাঁটতে,প্রতিনিয়ত নিজেকে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করে আপন চিন্তারাজ্য,নিজস্ব দর্শনাগার গড়ে তুলতে।এহেন হুমায়ুন আজাদ আমার পরম পূজ্যপাদ!

সবশেষে পরম মুগ্ধতার সেই অমিত শক্তিধর,তৃষ্ণার্ত লাইনগুলো—

“আমি জানি, ভালো ক’রেই জানি, কিছু অপেক্ষা ক’রে নেই আমার জন্যে;কোনো বিস্মৃতির বিষন্ন জলধারা, কোনো প্রেতলোক, কোনো পুনরুত্থান, কোনো বিচারক, কোনো স্বর্গ, কোনো নরক; আমি আছি, একদিন থাকবো না, মিশে যাবো, অপরিচিত হয়ে যাবো, জানবো না আমি ছিলাম। নিরর্থক সব পুণ্যশ্লোক, তাৎপর্যহীন সমস্ত প্রার্থনা, হাস্যকর উদ্ধত সমাধি; মৃত্যুর পর যে-কোনো জায়গায়ই আমি প’ড়ে থাকতে পারি,-জঙ্গলে, জলাভূমিতে, পথের পাশে, পাহাড়ের চুড়োয়, নদীতে, মরুভূমিতে, তুষারস্তূপে।কিছুই অপবিত্র নয়, যেমন কিছুই পবিত্র নয়;কিন্তু সব কিছুই সুন্দর, সবচেয়ে সুন্দর এই তাৎপর্যহীন জীবন।অমরতা চাইনা আমি, বেঁচে থাকতে চাইনা একশো বছর; আমি প্রস্তুত, তবে আজ নয়। চ’লে যাওয়ার পর কিছু চাইনা আমি; দেহ বা দ্রাক্ষা, ওষ্ঠ বা অমৃত, বা অমরতা; তবে এখনি যেতে চাইনা; তাৎপর্যহীন জীবনকে আমার ইন্দ্রিয়গুলো দিয়ে আমি আরো কিছুকাল তাৎপর্যপূর্ণ ক’রে যেতে চাই। আরো কিছুকাল আমি নক্ষত্র দেখতে চাই, নারী দেখতে চাই, শিশির ছুঁতে চাই, ঘাসের গন্ধ পেতে চাই, পানীয়র স্বাদ পেতে চাই, বর্ণমালা আর ধ্বনিপুঞ্জের সাথে জড়িয়ে থাকতে চাই,মগজে আলোড়ন বোধ করতে চাই।আরো কিছুদিন আমি হেসে যেতে চাই। একদিন নামবে অন্ধকার-মহাজগতের থেকে বিপুল, মহাকালের থেকে অনন্ত; কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমি আরো কিছু দূর যেতে চাই……।”

প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা জানাই,সেই বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়কে!

images 2

Anirban Maitra
Hey! This is Anirban,currently living in Kushtia,Bangladesh.'Anirban' means something inextinguishable,I'm quite hopeful to make it true.I'm A student,a never-stopped learner and a book-worm!I dream of a secular,altruistic and progressive Bangladesh!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here