তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর মেধা, দক্ষতা ও বিচক্ষণতার জন্য মাত্র ৯ মাসেই যুদ্ধে জয় পেয়েছি আমরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তিনিই দিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। এত কিছু করার পরও কখনো তিনি বলেননি যে আমি এটা করেছি। নিজে তো বলেননি, অন্যদেরও বলতে দেননি। তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন, যাঁকে খোদ জুলফিকার আলী ভুট্টোও ভয় পেতেন। তাজউদ্দীন সম্বন্ধে ভুট্টো একবার বলেছিলেন, ‘আমি তো শেখ মুজিবকে ভয় পাই না, আমি ভয় পাই তার পাশে বগলে ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই খাটো মানুষটিকে।’ প্রচণ্ড বুদ্ধিমত্তার কারণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে ত্রাস ছিলেন তাজউদ্দীন।
তাকে ভাবা যায়, যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। বাঙালী জাতির সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরকার ও যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অসামান্য দৃঢ়তা ও সাফল্যের সাথে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কোন উপলক্ষই তাঁকে লক্ষ্যবিচ্যুত করতে পারেনি, দল ও দলের বাইরে তাঁর সকল শত্রু বা শত্রুপক্ষের জন্য সেটি ছিল একটি মর্মযাতনার কারণ।
যুদ্ধের সেই দিন গুলাতে দিক হারা দেশের তিনি ছিলেন পথ দেখানো নাবিক। দেশের ভিতরে সেই অবস্থায় অস্থায়ী সরকার গঠনের জন্য তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন, ভারতে ছুটে গিয়েছিলেন সাহায্য পাবার আশায়, অনেকটা লড়াইয়ের পরে পেরেছিলেন দেশে অস্থায়ী সরকার গঠন করতে। ছিলেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী।
শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারকে নেতৃত্ব দিয়ে তাজউদ্দীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছেন। কার সাধ্য, তাঁকে বিস্মৃতির গর্ভে নিয়ে যায়? কার সাধ্য,তাঁকে ইতিহাসের পাতায় এক লাইনের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দেয়?
দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বেচে থাকলে, তিনিও বেচে থাকবেন। তার নাম লিখা থাকবে সব স্তরে।
আওয়ামী লীগে, শুধু আওয়ামী লীগেই নয়, বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্বে এখানেই ছিল তাজউদ্দীন আহমেদের ব্যতিক্রম। সে কারনেই তিনি দেশ–কালকে ছাপিয়ে তাঁর সময়কে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। সে সময়ের প্রধান নেতৃত্ব এটিকে মেনে নেওয়ার জন্য কখনই প্রস্তুত ছিল বলে মনে হয়নি। সে কারনেই তাজউদ্দীন হয়ে পড়েছিলেন একা, নি:সঙ্গ এবং ঝঞ্জাবিক্ষুদ্ধ সময়ের মাল্লা,বলা যায় । সেজন্য তিনি চলেও গেছেন তাঁর সময়ের আগেই। নিশ্চয়ই, তিনি ফিরে আসবেন ইতিহাসের হাত ধরে বারবার, পুনর্বার– তার কাছে যে গোটা বাঙালী জাতি রক্তঋণে আবদ্ধ।
“১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সময়ের পার্থক্য ছিল ৩০ মিনিট। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ভারতের মাটিতে থেকে কাজ করত, চলত ভারতের সময়ে। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ কোনো দিন তাঁর হাতঘড়ির সময় পরিবর্তন করেননি, সেটি চলত বাংলাদেশের সময়ে।মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানি দানবেরা এই দেশের মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। তখন আকাশে শকুন উড়ত, নদীর পানিতে ভেসে বেড়াত ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ, শুকনো মাটিতে দাউ দাউ করে জ্বলত আগুনের লেলিহান শিখা, বাতাস ভারী হয়ে থাকত স্বজনহারা মানুষের কান্নায়। শুধু বাংলাদেশের সময়টুকু তারা কেড়ে নিতে পারেনি। তাজউদ্দীন আহমদ পরম মমতায় সেই সময়টুকুকে তাঁর হাতঘড়িতে ধরে রেখেছিলেন।ঘাতকের বুলেট তাজউদ্দীন আহমদের হৎস্পন্দনকে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর হাতের ঘড়িতে ধরে রাখা বাংলাদেশের সময়টিকে কোনো দিন থামাতে পারবে না।যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন তাজউদ্দীন আহমদের ঘড়ি আমাদের হৃদয়ে টিকটিক করে চলতে থাকবে। চলতেই থাকবে।” – তাজউদ্দীন আহমদের হাতঘড়ি, মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
তাজউদ্দীন আহমেদ নিজের ভালোমন্দ চিন্তা করতেন না। তিনি চাইতেন দেশ ও দেশের মানুষ ভালো থাকুক। নীরবে দেশের জন্য পরিশ্রম করে যেতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে গিয়ে বলেছিলেন, ‘মুছে যাক আমার নাম, তবু থাকুক বাংলাদেশ।’ হয়তো তিনি ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরেছিলেন, তাই এমন কথা বলেছেন। বঙ্গতাজকে বাঙালির যেভাবে স্মরণ করার কথা আজ আমরা সেভাবে স্মরণ করতে পারি না। যে দেশ তৈরিতে অসামান্য অবদান তাঁর। যার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। তাঁকে কালেভদ্রে মনে করে এ জাতি। তবু খুব ছোট পরিসরে পালন করা হয় তাঁর জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী। যেখানে অনেক দেশদ্রোহীকে উচ্চ স্থানে আসীন করেছে এ জাতি।
এই ক্ষণজন্মা মানুষকে যদি বাংলাদেশ আরও কিছুদিন পেত, তাহলে এই দেশের চিত্র হয়তো ভিন্ন হতো। বাংলাদেশ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গতাজের নাম। বাংলাদেশ ও তাজউদ্দীন একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশ যেন এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তান তাঁর তাজ তাজউদ্দীন আহমেদকে।
প্রিয় নেতার জন্মদিনে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। আপনাকে নতুন প্রজন্ম সব সময় মনে রাখবে বাংলার তাজ হিসেবে। শুভ জন্মদিন হে নেতা…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here