1593170564565

সাল তখন ১৯১৬।গোটা ভারতবর্ষ তখনো বৃটিশরাজের অধীন।বাঙলায় একদিকে তখন চলছে সামন্তপ্রভুদের কর্তৃত্ববাদ,অপরদিকে চলছে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার।স্বদেশীর নামে পোড়ানো হচ্ছে বৃটিশ-কারখানায় তৈরি সমস্ত সস্তা জামাকাপড়,‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড়ে’র সাথে মাথায় উঠছে শভিনিজমের বিষ।রাজনৈতিক আবেগে থরথর করে কাঁপা গোটা বাঙলার আবেগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্মশ্রুগুম্ফমণ্ডিত এক বাঙালি সন্ত সেদিন রচনা করেছিলেন ‘ঘরে বাইরে’ নামের এক অসাধারণ রাজনৈতিক-মনস্তাত্বিক উপন্যাস।সেই উপন্যাসকে অপরিবর্তিত রেখে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্রসম্রাট সত্যজিৎ রায়।তার ঠিক ৩৫ বছর পর ‘ঘরে বাইরে’ ফিরলো আবার,সেলুলয়েডের ফিতেয় একালের মননশীল চলচিত্রনির্মাতা অপর্ণা সেন দেখালেন একবিংশের ঘরে বাইরে—‘ঘরে বাইরে আজ’।

এক কথায় বললে,’ঘরে বাইরে’র মতোই ‘ঘরে বাইরে আজ’ একটি রাজনৈতিক ছবি।,এবং মূল উপন্যাসে রবি ঠাকুর নর-নারীর চিরকালীন সম্পর্ককে যেভাবে দাঁড় করিয়েছিলেন ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে,সেই আদি নির্যাস ধরে রেখেই সময় এবং আনুষাঙ্গিক বিষয়াদিতে কিঞ্চিৎ রদবদল করেছেন অপর্ণা,তথাপি তা স্বাতন্ত্র্যবাহী।মূল উপন্যাসের মতো ‘ঘরে বাইরে আজ’ও আবর্তিত হয়েছে তিন প্রধান চরিত্রের বৃত্তে—সন্দীপ,নিখিলেশ এবং বিমলা।একুশ শতকের বিমলা দলিত সম্প্রদায়ের নারী,মা-বাবার মৃত্যুর পর দিল্লিতে সে নিখিলেশের আধুনিকমনা পরিবারে আশ্রয় পায়,সেখানেই তাকে বৃন্দা নামকরণ করে মুছে দেয়া হয় দলিত পরিচয়ের স্পর্শটুকু।লেখাপড়া শিখে সে উচ্চশিক্ষিত,অক্সফোর্ডের একটি ইংরেজি প্রকাশনার প্রুফরিডিং এর কাজ করে সে স্বাবলম্বী।এরপরেও মূল কাহিনীর বিমলার মতোই সে অন্তর্মুখী।আজকের নিখিলেশ একটি প্রভাবশালী পত্রিকার সম্পাদক,মূল উপন্যাসের মতোই লিবারেল এবং সেকুলার আদর্শে পরিচালিত তার জীবন।চর্চিত উদারনীতির বলেই একটি দলিত মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করতে সে দ্বিধাবোধ করে না।হুমকি-ধামকিরতোয়াক্কা না করে উদারনীতির প্রচারণাও চালিয়ে যায় সে, স্বপ্ন দেখে ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশের।চলচ্চিত্রের সন্দীপ প্রাক্তন চরমপন্থী মাওবাদী,বর্তমানে কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক নেতা।এর পাশাপাশি সে সুবক্তা এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।

1593325543420                 পরিচালক অপর্ণা সেন। 

নিখিলেশ এবং সন্দীপ ছোটোবেলার বন্ধু।দীর্ঘদিন অসম্পর্কের পর অধ্যাপনার কাজে দিল্লিতে নিখিলেশের বাড়িতে ওঠে সন্দীপ,সেখান থেকেই শুরু হয় এ চলচ্চিত্রের কাহিনী।সন্দীপের উপস্থিতি ঋণাত্মক অর্থে প্রভাবিত করতে থাকে নিখিলেশ আর বৃন্দার সম্পর্ককে,তৈরি হয় এক অদৃশ্য ত্রিকোণের।এছাড়া ঘরের বাইরে প্রবাহিত হতে থাকে দ্বন্দ্বের চোরাস্রোত,যার উৎস দুই নিকট বন্ধুর আদর্শের সংঘাত।তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে আদিবাসী এলাকায় হিন্দুমন্দিরের জন্য নির্ধারিত এলাকায় নিখিলেশের হাসপাতাল তৈরির চেষ্টায় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের বিরোধিতার মাধ্যমে।আবার দুই পরস্পরবিরোধী ব্যক্তিত্ব এবং আদর্শের মাঝে অদ্ভুত ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়ে চলতে থাকে বৃন্দার মনস্তত্ব।

 

এভাবে আকর্ষণ,কাম,প্রেমের মতো মৌলিক মানবিক গুণের সাথে মূর্ত হয় আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ মৌলিক প্রশ্ন—কোন পথে হাঁটবে ভারত?যুক্তি-প্রতিযুক্তি আর ঘটনার ঘনঘটায় কাহিনী এগিয়ে চলে চরম পরিণতির দিকে।আর পরিণতিতে অপর্ণা ছাড়িয়ে যান মূল ঔপন্যাসিক এবং তার পূর্বসূরীকে।রবি ঠাকুর আর সত্যজিত যেখানে থেমে যান,একপ্রকার শাস্তি দেন বিমলাকে,বৃন্দার প্রতিবাদ-প্রতিশোধ এবং শত্রু নিকেশে অপর্ণা সেখানে পরম যত্নে আঁকেন উত্তরণের চিত্র,যা না থাকলে হয়তো এ ছবি পুনঃনির্মাণের কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকত না।

 

1593325501041     অনির্বাণ এবং যীশু—কেউ কম জাননি কারো                                  থেকে।

পশ্চিমবঙ্গের নব্য-মূলধারায় সৃজিত,অতনু,কৌশিকদের পাশে অপর্ণা সেন তার চলচ্চিত্রে সমসাময়িক রাজনীতির ছাপ তুলে আনায় অসাধারণ সাহসী।বর্তমান ভারত যখন তার দীর্ঘকালের উদারনৈতিক অসাম্প্রদায়িক আদর্শ থেকে গেরুয়ারঙের দক্ষিণপন্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে—অন্যরা যখন চলেছেন গা বাঁচিয়ে,অপর্ণা তখন সমসময়কে সুন্দরভাবে বুনেছেন চিত্রনাট্যের পরতে পরতে।সারা ভারতে চলমান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিতর্ককে বড় পর্দায় নিয়ে আসতে চেয়েছেন পরিচালক।আকণ্ঠ শভিনিজমে পূর্ণ হিন্দুত্ববাদীদের ‘জয় শ্রী রাম’ ধোঁয়া যে সংখ্যাগুরুর স্পর্শকাতর অনুভূতি নিয়ে খেলা আর সংখ্যালঘু বিতাড়নের শক্তিশালী হাতিয়ার— কোনো রাখঢাক না করে অপর্ণা সে কথাই বলেছেন সোজাসাপ্টা ভঙ্গিতে।‘ঘরে বাইরে আজ’ এর মুখ্য বিষয় পরিচালকের এই স্পষ্টবাদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিফলন।অতি পরিচিত একটি ত্রিকোণ প্রেমের গল্পে তিনি যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থা, ডানপন্থী হিন্দু-জাতীয়তাবাদ ও দলিত সমাজের তিনটি অতি জটিল সমীকরণকে একীভূত করেছেন, তা দর্শকমনে বিস্ময়াতীত ভালোলাগার জন্ম দিতে বাধ্য।রাজনীতি সচেতনতার পাশেই এ চলচ্চিত্রের সবচে’ উজ্জ্বল যে দিক,তা হলো নিখিল-বৃন্দা-সন্দীপের ত্রিকোণ প্রেমকাহিনী।রাজনৈতিক বক্তব্যের সাথে এই অংশকে কিছুমাত্র অবহেলা না করে অনন্য মমত্ববোধ এবং সহানুভূতির সাথে চিত্রিত হয়েছে এ অংশটুকু।বৃন্দা আকৃষ্ট হয়েছে পরপুরুষের প্রতি,ধরা দিয়েছে সন্দীপের শরীরী আহবানেও—কিন্তু অপর্ণা এমনভাবে তার গল্পটা বলেছেন যে, কোনো কারণেই তাকে দুষতে ইচ্ছা তো করবেই না, বরং ভীষণ দুঃখ হবে তার জন্য।আপাত নিঃশব্দ নিখিলেশের কাছে বৃন্দার আত্মসমর্পণে বৃন্দার মানসিক উপলব্ধি এবং উত্তরণের যে যাত্রা কিংবা শেষদৃশ্যে বৃন্দার অগ্নিস্ফূলিঙ্গ করে তোলা কার্যতই অসামান্য।

1593325488408                    ‘ঘরে বাইরে আজ’ টিম

 

অভিনয়ে নিখিলেশের অনির্বাণ কিংবা সন্দীপের যীশু,কেউ কারো চেয়ে কম যাননি।অনির্বাণের চাহনি,যুক্তির গাঁথুনি,কথা বলার আগে তার খানিকটা ভেবে নেয়ার বিরতি দৃঢ়-আদর্শবাদী নিখিলেশকে চিনিয়েছে।আবার সন্দীপের পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার চ্যালেঞ্জে যীশু একশোয় একশো পাওয়ার মতোন।আর এ ছবির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার অবশ্যই বৃন্দা চরিত্রে অভিনয় করা তুহিনা দাস।সন্দীপের প্রতি আকর্ষণ,যৌনদৃশ্য আবার সাময়িক ভ্রান্তির অপরাধবোধ ঢাকতে মেজাজের রুক্ষতা,আবার এক পর্যায়ে চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে পরা এবং পরিশেষের চূড়ান্ত উত্তরণ—সব জায়গায়ই তাকে নিখুঁত মনে হয়েছে।পার্শ্বচরিত্রে অঞ্জন দত্ত,শ্রীনন্দা শঙ্কর, সোহাগ সেন,ঋতব্রত মুখার্জী—সকলের অভিনয়ই সুন্দর ছিলো।এছাড়া অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফি,ক্যামেরার কাজ,নেপথ্য সঙ্গীত দর্শককে সাহায্য করে কাহিনীর আরো গভীরে প্রবেশ করতে, চোখের সামনে হেঁটে-চলে বেড়ানো চরিত্রগুলোকে আরো বেশি অনুভব করতে।সবমিলিয়ে ‘ঘরে বাইরে আজ’ বাংলা চলচ্চিত্রে অসাধারণ কায়দায় রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপনে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক তৈরি করে দেয়ার মতো ছবি,মননশীল দর্শকের হৃদয়ের দোরে যা ধাক্কা দিয়ে বেড়ায় অনুক্ষণ।’ঘরে বাইরে আজ’ দেখার পর বৃন্দার উদ্দেশ্যে নিখিলের ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নটাই বাজতে থাকে মনের গহীনে,

”বাইরে যা ছিল সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল, কিন্তু মনের ভিতরে যা রয়ে গেল সেগুলোকে পোড়াবে কেমন করে?”

Anirban Maitra
Hey! This is Anirban,currently living in Kushtia,Bangladesh.'Anirban' means something inextinguishable,I'm quite hopeful to make it true.I'm A student,a never-stopped learner and a book-worm!I dream of a secular,altruistic and progressive Bangladesh!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here