আমাদের চারপাশ এখন একটা কুৎসিত খবরে আচ্ছন্ন- “ধর্ষণ”। প্রায় প্রতিদিন আমরা ধর্ষণের অনেক খবর পাই। এখানে-সেখানে ধর্ষিত হচ্ছে নানান বয়সের মেয়েরা। এ নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকমের মন্তব্য করে থাকি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত মনে হয় যখন কোন বাচ্চা শিশুকে ধর্ষণের কথা শুনে থাকি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ ধরনের অসুস্থ একটা খবর আমাদের প্রায় প্রতিদিন শুনতে হয়। দিন দিন শিশু ধর্ষণের সংখ্যা আমাদের দেশে বেড়েই চলছে।

শিশুদের প্রতি এই যৌন আকৃষ্টতাকে বলা হয়ে থাকে পেডোফিলিয়া। এটা এক ধরনের মানসিক রোগ, এ ধরনের রোগী খেয়ালপূর্বক যৌন আকৃষ্ট হয়ে থাকে। আর যারা এই রোগে আক্রান্ত বা যাদের এই ধরনের মানসিকতা কাজ করে তাদেরকে বলা হয়ে থাকে পেডোফিল বা পেডোফিলিয়াক।

পেডোফিল ব্যক্তি মানেই যে তার শিশুদের প্রতি তীব্র কোন যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকবে ব্যাপারটা তা নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই আকাঙ্ক্ষা অস্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা নয়। এটা যে এক ধরনের মৌন-যৌন আকাঙ্ক্ষাও হতে পারে এই ব্যাপারে ২০০৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের বাৎসরিক সম্মেলনে বলা হয়েছে। অধিকাংশ ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা অ্যাডভেঞ্চার নেয়ার জন্য এই শিশু যৌনাচারে জড়িয়ে পড়ে।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশিরভাগই পুরুষ হয়ে থাকে। বিশেষ করে তাদের বয়স থাকে ৪০ বা তার চেয়ে বেশি। ক্ষেত্র বিশেষে এই রোগ মহিলাদের মধ্যে থাকলেও, তা সংখ্যায় খুবই কম। অনেক সময় হয়ে থাকে তাদের কথা কেউ জানতেও পারে না। তাদের এই রোগ ধরতেও পারা যায় না বেশিরভাগ সময়। রোগীরা শিশুদের দেখলেই এক ধরনের তীব্র যৌন-উত্তেজনা বোধ করে আর তারা সুযোগ বুঝে যৌন ক্রিয়া করে শিশুদের ওপরে। এই ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকের মধ্যে অনেক অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। তারা যদি যৌন কাজ করতে নাও পারে তারা এমন সব কাজ করে থাকে, যেসব কাজকে বলা হয়ে থাকে চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ।

এই ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্থতা মানুষের মধ্যে কেন তৈরি হয়, তার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করে হয়ে থাকে, এ ধরনের রোগীরা তার ব্যক্তি জীবনে শিশু বয়সে সেক্সুয়াল এবিউজের শিকার। আর এই কারণে তারা এ ধরনের জঘন্য মন-মানসিকতার হয়ে থাকে।

পেডোফিলিয়াকে কোন ভাবেই সুস্থ যৌনাচার বলা যায় না। কারণ এখানে একপক্ষে থাকে প্রাপ্তবয়স্ক আর এক পক্ষে থাকে শিশু। আমাদের আশেপাশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যৌন সমাচারকে অনুচিত ধরা হয়, এটা নিষিদ্ধ। এ ধরনের ব্যক্তি হচ্ছে অসুস্থ। অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনসম্মতিকেও গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। এক্ষেত্রে এ ধরনের কাজে যদি শিশুর সম্মতি যদি পাওয়াও যায়, তবু সেটা বৈধতা পায় না, এটা স্বীকৃত অবৈধ কাজ।

অনেকে আবার পেডোফিল ও সমকামিতাকে একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু না! দুইটা কাজ এক নয়। সমকামিতা কোন মানসিক সমস্যা থেকে হয় না, এটা একটা স্বাভাবিক যৌন বাসনা। এখানে দুইজনই প্রাপ্তবয়স্ক থাকে আর তাদের মধ্যে সম্মতি থাকে, যা পেডোফিলকে সমর্থন করে না।

পেডোফিলিয়ার ক্ষেত্রে শিশুর সম্মতি বা লিঙ্গ কোনটাই মূখ্য হয় না। পেডোফিলিক ব্যক্তি নারী পুরুষ যে কেউ হতে পারে আবার ভিক্টিম শিশু ছেলে বা মেয়ে যে কেউ হতে পারে।

পেডোফিলের শিকার হয়ে থাকে সাধারণত অবুঝ শিশুরা। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভাবীরা, যাদের বাবা মা তাদের ঠিকমত খাবার কিনে দিতে পারে না। আর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুরা। অনেক সময় হাসপাতালে জ্ঞানহীন শিশুকেও হাসপাতালের কর্মচারী দ্বারা ধর্ষণের ইতিহাস রয়েছে। শতকরা ২০ ভাগ ক্ষেত্রে ছেলেরাও ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে। যদি ভিক্টিমের কনসেন্ট নিয়েও যৌনকর্ম করে, তবুও এটাকে দোষ হিসেবেই ধরা হয়।

পেডোফিল ব্যক্তি যেহেতু একজন মানসিক রোগী, তাই তার এমন হওয়ার পেছনে কিছু তো কারণ রয়েছে। শুধুমাত্র অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতাই এর জন্য দায়ী নয়; আরও কিছু কারণ থাকে। তারা প্রি- ম্যাচিউর ইজাকুলেশনে ভুগে। ফলে তারা পূর্ণবয়স্ক মহিলাদের সঙ্গে যৌন কাজে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের যৌনসঙ্গীর সঙ্গে বাজে অভিজ্ঞতা থাকে। তারা মানসিকভাবে দুর্বল আর হতাশাগ্রস্থ মানুষ। অনেক সময় ধরে একাকীত্ব ভোগ করার কারণে তারা নারীদের সঙ্গে মিশতে পারে না। অনেকে হয়ে থাকে মাদকাসক্ত, আবার অনেকের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজনের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কম। এডভেঞ্চার নেয়ার মত করে তারা ঝুঁকে পরে এই কাজে, আর ধীরে ধীরে তারা মাংসখেকো বাঘের মতো হয়ে ওঠে।

এ ধরনের ভিক্টিম শিশুদের মধ্যে অন্য রকম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় যা দেখে অনেক সময় বুঝা যায় তারা এই রোগীদের শিকার। যেমনঃ ঘুমের সমস্যা হবে, কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকবে না, বাচ্চাদের মধ্যে ভয়, আতংক বা উদাসীনতা কাজ করবে। বাচ্চার মেজাজ নষ্ট হয়ে যায়, হাসিখুশি বা চঞ্চলতা শেষ হয়ে যায়।

তবে একটা ব্যাপার হচ্ছে, পেডোফিলিয়া বিষয়টি কোন মতেই যেকোন শিশু যৌন নিপীড়কের এলিবাই হতে পারে না। কারণ পেডোফিলিয়ায় আক্রান্ত হলেই যে শিশু যৌন নিপীড়ক হবে এমন কোন কথা নেই। পেডোফিলিয়ায় আক্রান্ত শিশু যৌন নিপীড়কের সংখ্যাও সামান্য (০২-১০%)। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বেশিরভাগ যৌন নিপীড়কই পেডোফিলিয়া নয়; বরং বিকৃতিরুচির অধিকারী।

যেহেতু এই রোগ হচ্ছে শিশুদের প্রতি আকর্ষণ । নিজের চারপাশে তাকালে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। আশেপাশে অনেকেই রয়েছে যাদের দেখা যাবে তারা শিশুদের গোপনাঙ্গে হাত দিতে পছন্দ করে, এমনকি তারা নিজেরাও নিজেদের গোপনাঙ্গে হাত দিতে পছন্দ করে। এরাই পেডোফিল আর এদের মধ্যে বেশিরভাগই হয় নিজের লোকেরা।

আবার এ ধরনের রোগ বা এর অনুভূতি সম্পূর্ণ নিরাময় বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞদের মতে সম্ভব নয়; তবে সাইকোথেরাপি তাদের সেই অনুভূতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় আসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই আকাঙ্ক্ষা কমাতে মেডিসিন প্রয়োগ করার দরকার হয়ে থাকে।

ধরুন, যদি আপনার শিশু কারও দ্বারা সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজড হলো, তখন আপনার করণীয় কী হতে পারে?

১. আপনার শিশু যদি কারও নামে আপনার কাছে নালিশ করে, শিশুকে বিশ্বাস করুন। শিশুরা সাধারণত এই ব্যাপারে মিথ্যা বলে না। আপনি অবিশ্বাস করলে ভবিষ্যতে হয়তো আর কখনোই শিশুটি আপনার সঙ্গে শেয়ার করবে না।

২. আপনার শিশুকে এটা বুঝতে দেয়া যাবে না তার সঙ্গে খুব ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। আপনি আপনার শিশুর সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করুন, অস্থির হয়ে যাবেন না।

৩. নিয়মিত একজন ভালো শিশু মনোবিজ্ঞানীকে দিয়ে কাউন্সিলিং করান।

৪. শিশুটি যদি খুব গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয় তাহলে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও শিশু মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন। কখনোই শিশুটিকে বকাবকি করা যাবে না। বরং তাকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, যা হয়েছে তা কোনভাবেই তার অপরাধ নয়, অপরাধ ঐ ব্যক্তির। ব্যাপারটি যদি আদালত পর্যন্ত যায়, বিশেষ ব্যবস্থায় মনোবিজ্ঞানীর মাধ্যমে শিশুর জবানবন্দী নিতে হবে, কখনোই শিশুকে জনসমক্ষে ‘তার সাথে কী হয়েছে’ এর বর্ণনা দিতে বলা যাবে না। এসব শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে ভিকটিম শিশুটি যদি খুব অল্পবয়সী হয়- তাহলে হয়তো সে আপনাকে নির্যাতনকারীর কথা বলতে পারবে না। আপনাকে আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকে একাকী যার-তার কোলে দেবেন না। নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে সাবধান হোন, প্রয়োজন হলে ডাক্তার দেখান। তবে এগুলো অন্য কারণেও হতে পারে-

• শিশুর গোপনাঙ্গে কোনো ক্ষত বা অস্বাভাবিক ফোলা ভাব

• মুখে ক্ষত

• পেট খারাপ

• খাওয়ায় অরুচি

• বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে দেখে ভয় পাওয়া

• হঠাৎ চমকে ওঠা; ইত্যাদি।

অনেক সময় দেখা যায় মুরুব্বি মানুষেরা বাচ্চাদের আমার বউ বা আমার বর বলে সম্বোধন করছে। এটা করতে দেয়া যাবে না! তাদের নিষেধ করবেন। যদি কোনো আত্মীয় বাচ্চাকে অস্বাভাবিকভাবে আদর করতে দেখেন, তবে তার থেকে সাবধান হোন। আপনারাই পারেন সতর্ক থেকে নিজের শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here