১৯৯১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর । দেশের বৃহৎ সমুদ্র সৈকত সম্বলিত সমুদ্রস্নাত জেলা কক্সবাজার এর বৈদ্যেরঘোনা শহর এর হক নিবাস এ জন্ম হয় একটি শিশুর। সেই নিবাসের বাসিন্দা চাকরিজীবী নাজমুল হক এবং স্কুল শিক্ষিকা মালেকা জয়নাব এর কোল আলো করে আসে তাদের ২য় পুত্র সন্তান।। বাবা মা আদর করে নাম রাখে সৌরভ । ভাল নাম মুমিনুল হক ।মায়ের সে আদরের সৌরভ একদিন সত্যিই তার সৌরভ ছড়িয়েছে বাংলাদেশ ক্রিয়া অঙ্গনে , নিজের ব্যাটিং সৌরভ এ সুবাসিত করেছে ক্রিকেট দুনিয়া ।
আমাদের দেশের আর ৫ জন বাবা মায়ের মত সৌরভ এর মায়েরও স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে বড় কিছু হবে, ভাল করে লিখা পড়া করবে , তাই অতি স্বাভাবিক ভাবে শিক্ষিকা মালেকা জয়নাব তার ছেলের পড়া লেখা বাদ দিয়ে ক্রিকেট খেলাকে মেনে নেননি, করেছেন শাসন এমনকি পুড়িয়েছেন ছেলের খেলার ব্যাট ।কিন্তু তাই বলে থেমে যাইনি মায়ের আদরের শান্ত স্বভাবী ছেলেটির ক্রিকেট খেলা । নিজের মত করে মাকে লুকিয়ে চালিয়েছেন খেলা , তবে পাশে পেয়েছেন বড় ভাই শাওন এবং বাবা কে ।
মা যখন টের পেলেন, তখন জল গড়িয়েছে অনেক দূর। এর মধ্যে কক্সবাজারে আসা বিকেএসপির দলের সঙ্গে মুমিনুল এক মাস অনুশীলন করে বাহবা কুড়িয়েছেন। বিকেএসপির কোচ নাজিম তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যেতে ডেকে পাঠালেন মা-বাবাকে। এবার কী করবেন মুমিনুল? আবার এগিয়ে এলেন বাবা ও বড় ভাই। মাকে বোঝালেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গেলেন ঢাকা বিকেএসপিতে। কিন্তু প্রথমবার ফিরে আসতে হলো কম উচ্চতার জন্য। শুরুতেই পেলেন বাধা। তবে থেমে থাকেননি। ওইবার ঢাকা থেকে আসার পথে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকায় বাবা কিনে দিলেন সাইকেল। শুরু হলো উচ্চতা বাড়ানোর সংগ্রাম। পরের বছর আবার বিকেএসপিতে। এবার উতরে গেলেন। বিকেএসপিতে শুরু হলো ক্রিকেটজীবন। সময়টা ২০০৪ সাল।
বাংলাদেশের বৃহত্তম ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বিকেএসপি থেকে ক্রিকেট বিষয়ে অধ্যয়ন করেন সৌরভ ।খেলোয়ারী জীবনের শুরু থেকেই বয়সভিত্তিক ঘরোয়া ক্রিকেটে নির্ভরযোগ্য বামহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন । ২০০৮-০৯ মৌসুমে ঢাকা বিভাগীয় ক্রিকেট দলের হয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেট দলের বিপক্ষে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে মমিনুল হকের । ২০১০ সালে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম সদস্য ।
সময়টা ২০১২ সালের নভেম্বর মাস। জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় সৌরভ । এ’ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে যাওয়া মুমিনুল দেশে ফিরে দেখতে পায় তার মা ঢাকায় আইসিইউ তে ভরতি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় তার । মা ভক্ত মুমিনুল কান্নায় ভেঙ্গে পরে । তখন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড়দের নিলাম চলছে। বরিশাল বার্নার্সে ডাক পড়ল মুমিনুলের।
পাক্কা দুই মাস পর মায়ের অবস্থার কিছুটা উন্নতি। তবে তিনি হারিয়ে ফেললেন কথা বলার শক্তি। অবশ হয়ে গেল এক পাশ। বিছানায় পড়লেন। এরপর মুমিনুল ডাক পেলেন জাতীয় দলে। সেই খবর শুনে আশ্চর্য পরিবর্তন হতে থাকল মায়ের। দুই হাত তুলে বিছানা থেকেই দোয়া করলেন। মুমিনুল পেলেন একের পর এক সাফল্য। এদিকে মায়ের অবস্থারও উন্নতি। মুমিনুলের খেলা মাকে আবার জাগিয়ে তুলছে।
সেই থেকে মুমিনুল খেলেন তাঁর মায়ের জন্য। ব্যাট হাতে ছেলে নামেন মাঠে। আর কক্সবাজারের বৈদ্যেরঘোনার বাড়িতে অধীর অপেক্ষায় থাকেন মা।
সময়টা ২০১২ সালের ৩০ নভেম্বর , সৌরভ হয়ত জীবনের সব থেকে সুখের দিনের দেখা পায় , বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে ওয়েস্টইন্ডিজ এর বিপক্ষে ওডিআই অভিষেক হয় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার বাম হাতি ব্যাটসম্যান সৌরভ এর । যিনি পরবর্তীতে জাতীয় দলে মিমি নামে পরিচিত হয় । ওডিআই ক্যাপ নাম্বার ১০৪, সেই একই বছর, একই দলের বিপক্ষে ৩৪ নাম্বার ব্যাটসম্যান হিসাবে ১০ ডিসেম্বর টি – ২০ অভিষেক হয় । জাতীয় দলে তার প্রধান ভুমিকা ব্যাটসম্যান হলে ও পাশা পাশি সৌরভ একজন ধীর গতির বামহাতি অর্থোডক্স বোলার । নিজের ওয়ান ডে বা টি -২০ ক্যারিয়ারে বেশি সুযোগ না পাওয়া বা হয়ত ভাগ্য যেই কারনেই হোক নিজের প্রতিভা বিকাশিত করতে পারেনি সৌরভ , দেশের জার্সি তে শেষ ওডিআই খেলেন ২০১৮ সালে, আবুধাবিতে, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান । বলার মত পারফরমান্স ৩ টি ফিফটি (ভারত, পাকিস্তান, এর আফগানিস্তান এর বিপক্ষে )আর দেশের হয়ে শেষ টি – ২০ খেলেন ২০১৪ টি -২০ ওয়ার্ল্ড কাপ এ , বিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া ।
তবে নিজের জাত চিনান ২০১৩ তে ৮ মার্চ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেক এর পর থেকে, টেস্ট ক্রিকেট এ নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান কিছু দিনের মধ্যেই , অকল্পনীয় ব্যাটিং গড় , ক্লাসিক্যাল ব্যাটিং স্টাইল এর মাধ্যমে নিজেকে টেস্ট এর অপরিহার্য ব্যাটসম্যান তৈরি করেন । ৪ টি সেঞ্চুরির ( ১৮১, ১২৬*, ১০০*, ১৩১*) । টানা ১১ টি টেস্ট এ ফিফটি করে নাম লিখেন ভিভ রিচারচ , বিরেন্দ শেওয়াগ এবং গৌতম গাম্ভির এর পাশে, আর একটি ফিফটি করতে পারলে নাম লিখাতেন পারতেন এবিডি ভিলিয়ারস এর পাশে , ,কিন্ত সেই মাইকফলকের দিন ৩০ রান এ আউট হন মুমিনুল । তবে টেস্টেও এক সময় নিজের ছন্দ হারাতে থাকেন সৌরভ , কারন টা ওয়ান ডে দল থেকে বাদ পরা, অনুশীলনীর সঠিক সুযোগ না পাওয়া এবং তুলনা মুলক আমাদের কম টেস্ট খেলা , ধিরে ধিরে ভাটা পরে টেস্ট বিশেষজ্ঞ খেতাব পাওয়া সৌরভ এর পারফরমান্সে , এবং নিজেদের শত তম টেস্ট এ সবায় কে অবাক করে দিয়ে একাদশের বাইরে চলে যান মুমিনুল।
কিন্তু বেশি দিন তাকে দলের বাহিরে থাকতে হয়নি, টেস্টে তিনি ঠিকই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক। তার নেতৃতে বাংলাদেশ প্রথম বারের মত গোলাপি বলের টেস্ট খেলেন।

বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়কের আজ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন ক্যাপ্তান। জাতীর দলকে আপনার আরো অনেক কিছু দেয়ার আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here