“এক বার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল ভালো না ফলায় টুঙ্গিপাড়া এলাকায় দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিয়েছিলো। গাঁয়ের অধিকাংশ মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হয়। সেদিন এক ছেলে গোপালগঞ্জ শহর থেকে টুঙ্গিপাড়া এসে সব দেখলেন ঘুরে ঘুরে, তারপর তার পিতার অনুপস্থিতিতেই তাঁদের গোলার সঞ্চিত ধান অতি অভাবগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।’’ এ ঘটনা জেনে সেদিন ছেলেটির পিতা প্রাণখোলা আশীর্বাদ জানিয়েছিলেন।কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অভাবগ্রস্ত মানুষদের কস্ট সহ্য করতে না পেরেই তার ছেলে এমনটি করেছেন। সকালের সূর্যোদয় যেমন বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে তেমনি সেই ছেলের শৈশব কৈশোরের বিচিত্র ঘটনাবলীও বলে দিয়েছিল তার ভবিষ্যৎ জীবনের পরিচয়বার্তা। এতক্ষন ধরে বলে আসা সেই ছেলে আসলে পরবর্তী জীবনে হয়ে উঠে আশা হারিয়ে ফেলা জাতীর ভরসার প্রতীক, হয়ে উঠে পরাধীন জাতীর স্বাধীনতার কাণ্ডারি, স্বাধীনতার ঘোষক, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। যিনি ছিলেন আমরণ অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপোষহীন, অধিকার আদায়ে খড়গ হস্ত শেখ মুজিব, যেন বিদ্রোহী কবির বিদ্রোহী বীর।
“ আমি রুষে উঠি যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোযখ-
নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া।’’
শিশুকাল এবং প্রথম জীবনঃ
গোপালগঞ্জের টুঙি পাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তিনি জন্মগ্রহন করেন, বাবা শেখ লুতফর রহমান এবং মাতা সায়রা বেগমের ছয় সন্তানের একজন শেখ মুজিব। তার বাবা গোপালগঞ্জের সিভিল কোর্টের একজন অফিসার ছিলেন।১৯২৭ সালে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মধ্যে দিয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল এবং ২ বছর পর তাকে তৃতীয় শ্রেণীতে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি করানো হয়। ১৯৩১ সালে মাদারীপুর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শেখ মুজিব ৪র্থ শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিলেন।১৯৩৪ সালে চোখের অপারেশনের জন্য তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং চার বছর তার পড়ালেখা স্থগিত থাকে। ১৯৩৯ সালে তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলের ছাত্র ছিলেন তখন তার মধ্যে রাজনৈতিক গুণাবলী প্রকাশ পেয়েছিল। তখন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরারদী তাদের স্কুল পরিদর্শনে গেলে, শেখ মুজিবের নেতৃতে একদল শিক্ষার্থী তাদের কাছে স্কুলের ক্ষতিগ্রস্থ ছাদ মেরামতের জন্য আবেদন জানায়। ১৯৪০ সালে তিনি ‘ সমগ্র ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে’ যোগ দিয়েছিলেন এবং ১ বছরের জন্য কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর তিনি ১৯৪২ সালে কলকাতা ইসলামি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সরাসরি ছাত্র রাজনীতিতে যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি ‘ বেঙ্গল মুসলিম লীগের’ একজন সদস্য হয়েছিলেন এবং ১৯৪৬ সালে ‘ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নে’ সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৪৭ সালে তিনি হোসেন শহীদ সোহরারদীর নেতৃতে মুসলিম রাজনীতিতে যুক্ত হোন। পূর্ব পাকিস্তানে ‘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি যোগ দেন এবং ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন তখন শেখ মুজিব তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং অন্য সব রাজনৈতিক নেতা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করেন।১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মুজিব এবং অন্য সব নেতারা গ্রেফতার হয়েছিলেন বাংলার বিরুদ্ধে হওয়া ষড়যন্ত্রেড় প্রতিবাদে, কিন্তু প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার মুজিব সহ বাকিদের ১৫ মার্চ মুক্তি দিয়েছিলেন।
এভাবেই শিশু মুজিব ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতি জানান দিতে থাকে, এবং ১৯৪২-১৯৪৭ এর আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছর কাল তার রাজনৈতিক জীবনের সম্ভাবনাময় বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
ক্যারিয়ারঃ
ধীরে ধীরে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের প্রকাশ ঘটে, নানা আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে বার বার কারাবরণ করতে হয়, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় তাকে জেলখানায় বসে কাটাতে হয়েছিল।
১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত তিনি জেলে ছিলেন ফরিদপুরের কর্ডন সভার বিরুদ্ধে প্রতিবার করবার জন্য। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা তাদের দাবী আদায়ের আন্দোলনে নামলে শেখ মুজিব তাদের সমর্থন করলে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার উপর অন্যায়ভাবে জরিমানা আরোপ করা হয়। কিন্তু তিনি তাতে থেকে থাকেননি, সমর্থন চালিয়ে গিয়েছিলেন আর সেই কারনে এপ্রিল মাসে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মুসলিম আওয়ামী লীগ গঠিত হলে জেলে থাকা অবস্থাতেই শেখ মুজিব সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হোন। ১৯৪৯ সালের ২৭ জুলাই জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে না গিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে যোগদান করেন।
১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে খাবারের দাবীতে আন্দোলনের জন্য ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী তিনি কারাগারে থেকেই রাষ্ট্রভাষার দাবিতে অনশন শুরু করেছিলেন এবং ২৭ ফেব্রুয়ারী শারীরিক অসুস্থতার কারনে তাকে মুক্তি দেয়া হয়।
১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রধান জাতীয় নির্বাচনে সব বিরোধী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠিত করে, ১৯৫৪ সালে ১০ মার্চ সাধারন নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ আসন পেয়ে জয় লাভ করে,এবং শেখ মুজিব গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের ১৪ মে মুজিব যুক্তফ্রন্টের সব থেকে ছোট মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহন করেছিলেন।
১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর, আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন ধর্ম নিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহন করে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগ নামকরন করেন এবং শেখ মুজিব আবার দলের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হোন। ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর অধিবেশনে ৬ দফা গৃহীত হয়, এরপর তিনি ৬ দফার পক্ষে, দেশ ব্যাপী নানা প্রচারনা শুরু করেন এবং ঢাকা, সিলেট, এবং ময়মনসিংহ থেকে বার বার গ্রেফতার করা হয়, ৩ মাসে তিনি ৮ বার গ্রেফতার হয়েছিলেন।শেষ বার গ্রেফতার করে নির্জন কারাবাসে রাখা হয় তাকে।
১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারী পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামী করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ভাগ করার পরিকল্পনার দায়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। ১৯৬৯ সালে যখন মুজিবের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রতিবাদে পরিস্থিতি গন অভ্যুথানে রুপ নেয় তখন পাকিস্তান সরকার মুজিবকে প্যারোলে মুক্তির কথা বললে মুজিব তা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখান করেন। কিন্তু অবশেষে গন আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার মুজিবের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেন।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ডাকসু এবং পূর্ব বাংলার ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল সমাবেশে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন।১৯৭০ সালের ৭,৮ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় কিন্তু ওই বছর নভেম্বের মাসে ভয়াবহ ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব বাংলার ১০/১২ লক্ষ মানুষ প্রান হারায়। বঙ্গবন্ধু তার নির্বাচনী প্রচারনা বাদ দিয়ে ত্রানের কাজে ঝাপিয়ে পড়েন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু নিরুকুংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্তান সরকারের নানা টাল- বাহানায় তিনি ক্ষমতা লাভ করতে পারেননি। ধীরে ধীরে ১৯৭১ সাল চলে আসে এবং পাকিস্তানিরা পরিকল্পিত ভাবে নিশ্চিত যুদ্ধের দিকে আগাতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান তা অনেকটা আঁচ করতে পেরে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার ভাষণ দেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা হঠাৎ করে ঘুমন্ত বাঙ্গালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ,সেই সাথে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধুকে তার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়, যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান, ‘সম্ভবতঃ এটাই আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছি তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যাই তোমাদের হাতে আছে তার দ্বারাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে। যতক্ষণ না পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে, তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’] এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ট্রান্সমিটারে প্রেরিত হয়।
যুদ্ধের পুরোটা সময় পাকিস্তান কারাগারে তিনি বন্ধী ছিলেন, এই দিকে বাংলাদেশে যুদ্ধ চলাকালীন সময়, মুজিবের অনুপস্থিতেই তাকে রাষ্ট্রপতি করে অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাংলাদেশ চূড়ান্ত মুক্তি লাভ করলে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হোন। এবং ১০ জানুয়ারী মাহেন্দ্রক্ষনে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের আমন্ত্রণে তিনি ভারত যান। ২৪ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে যান। ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ১ মে তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। ৩০ জুলাই লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর পিত্তকোষে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর লন্ডন থেকে তিনি জেনেভা যান। ১০ অক্টোবর বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরী’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ (৭ মার্চ ১৯৭৩) ঘোষণা করেন। ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের কথা ঘোষণা করেন। ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষর করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড়সহ সমস্ত ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড কার্যকর-ভাবে নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, ১১০০০ প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ ৪০,০০০ প্রাথমিক স্কুল সরকারীকরণ, দুঃস্থ মহিলাদের কল্যাণের জন্য নারী পুনর্বাসন সংস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ, বিনামূল্যে/ স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বীমা ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও চালু করার মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, ঘোড়াশাল সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্স এর প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুকরণসহ অন্যান্য সমস্যার মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস চালানো হয়। অতি অল্প সময়ে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৯৩ আসন লাভ। ৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ, সিপিবি ও ন্যাপের সমন্বয়ে ঐক্য-ফ্রন্ট গঠিত। ৬ সেপ্টেম্বর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনের যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়া যান। ১৭ অক্টোবর তিনি জাপান সফর করেন। ১৯৭৪ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি দান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) এর শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গমন করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন। ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ।
কিন্তু এইসব বেশি দিনের জন্য ছিলনা, বাঙ্গালী আরো একবার অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি হয়েছিল। দেশের স্বাধীনতাকে কলঙ্কিত করেছিল। ১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী অফিসার বিশ্বাস ঘাতকের হাতে নিহত হন। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুক্তিযোদ্ধা লেঃ শেখ কামাল, পুত্র লেঃ শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নীপতি ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল আহমেদ এবং ১৪ বছরের কিশোর আবদুল নঈম খান রিন্টুসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে ঘাতকরা হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ হবার পর দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। গণতন্ত্রকে হত্যা করে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। শুরু হয় হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। কেড়ে নেয়া হন জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার। বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার জন্য হত্যাকারীদের বিচারের বিধান রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে জাতির জনকের আত্ম-স্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রেহাই দেবার জন্য এক সামরিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এইভাবেই বাংলার মাটি থেকে জাতীর জনককে মুছে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
ব্যক্তিগত জীবনঃ
১৯৩৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে বিবাহ করেন। তাদের ৩ পুত্র- শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেল। আর দুই কন্যা- শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা।
জাতীর পিতার দর্শনঃ
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের দর্শনে চারটি জিনিসের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিলঃ জাতীয়তা,গণতন্ত্র,ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র। জাতীকে তুলে ধরার জন্য এই চারটি বিষয়কে মুখ্য করে তিনি সংসদে বার বার বক্তৃতা রাখেন।

বঙ্গবন্ধু তার জীবনের লক্ষ্য হিসেবে দুইটি সহজ শব্দ উচ্চারন করতেন। এক, “ সোনার বাংলা গড়ে তোলা”। দুই- “ গরীব এবং অসহায় লোকদের মুখে হাসি ফোটানো”। তিনি কখনো জিডিপি বাড়ানো কিংবা অন্যান্য তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে ভাবতেন না। তিনি কিভাবে সাধারন মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায় কারণ তা অনেক মূল্যবান এবং তার লক্ষ্যই ছিল সেই অমুল্যবান জিনিস জয় করা।
বাংলার ইতিহাসে জঘন্যতম দিন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। যার অঙ্গুলী হিলনে কোটি মানুষ প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই মহামানবকে কতিপয় নরপিশাচ স্বপরিবারে হত্যা করে বাংলার মাটিকে কলঙ্কিত করে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার কতিপয় মানুষ নামের জানোয়ারেরা পিতৃহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজের মাধ্যমে তাঁর স্বপ্নকে বিলীন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। কারণ তার স্বপ্ন সারথীরা আজও জেগে আছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহানুভবতা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছেন-
“আমি হিমালয় দেখিনি, আমি দেখেছি শেখ মুজিবকে।”
উপসংহারের উপকূলে দাঁড়িয়ে তাই বলতে হয়-
“যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরি, যমুনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here