‘যত ব্যক্ত, তত ত্যক্ত; যত গুপ্ত, তত পোক্ত’- বাসার পাশেই রাম কৃষ্ণ মিশনের দেয়ালে দেখেছিলাম লেখাটি। বয়স তখন বড়জোর ৫, স্কুলের শিশু শ্রেণিতে পড়ি। সরকারি স্কুল হলেও অন্যান্য অনেক স্কুলের তুলনায় পড়ালেখার মান বেশ ভালো আদর্শ শিশু সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ফলে যেকোন কিছু পড়তে পারার সক্ষমতা ছয় মাসের মধ্যেই পেয়ে যাই। উল্লিখিত অংশটুকু পড়েছিলাম ঠিক, কিন্তু অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়নি নিজ থেকে। পরদিন বাবাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এর অর্থ কী? বাবা বুঝিয়ে বললেন, যত কম কথা বলবে, সবকিছু তত ভালো থাকবে। বেশি কথা বলতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের খারাপই হয়ে থাকে।



সেই যে সেদিন থেকে শুরু, কম কথা বলার অভ্যাস রয়ে গেছে এখনও। অনেক জায়গায় অনেক কিছু দেখি, অনেক কিছুই মনঃপুত হয় না। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একেকজনের একেকরকম মন্তব্য মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি করে। কিন্তু কখনও সে অর্থে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি না। এর ভুক্তভোগী কিন্তু বাবা নিজেও। কিছু বুঝে ওঠার আগে, ছোট্ট একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেয়ার মাধ্যমে বাবাই হয়েছিলেন আমার প্রথম এবং একমাত্র সুপারহিরো। কিন্তু সে কথা যে কখনও বলতেই পারিনি। ঐ যে পড়েছিলাম, গুপ্ত থাকলে পোক্ত থাকবে। বাবার প্রতি ভালোবাসা কখনও কমতে দিতে চাই না, তাই এটা ব্যক্তও করা হয় না।



এইতো সেদিন, প্রচণ্ড গরম পড়ল যে কয়েকদিন, বাবার পরনে দেখলাম একটা হাতাকাটা গেঞ্জি। দেখেই মনে হলো গরমে বেশ আরাম হবে এটা পরতে। বললাম, আমাকেও একটা এনে দিও এমন। পরদিন সকালে যখন অফিসে যান বাবা, আমাকে ঘুম থেকে ডেকে বললেন, এটা পরিস, আরেকটা এনে দিবোনে। করোনাভাইরাসের জন্য সতর্কতাস্বরুপ পিপিই পরে অফিস চলে গেলেন, সারাদিন এটা পরে গরম সহ্য করতে হয়। বাসায় এসে যে গেঞ্জিতে আরাম পান, সেটাও দিয়ে দিলেন আমাকে। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় হাতে দেখলাম নতুন আরেকটা, আমার জন্য। তখন আসলে কী বলতে হয়? ভালোবাসি বাবা? নাকি অন্য কিছু? যাই হোক, বলা হয়নি তখন। বাবাদের তো আর ধন্যবাদ দেয়া যায় না, ধন্যবাদ শব্দের তো সেই সামর্থ্য নেই বাবাদের অবদান যথাযথ মূল্যায়িত করবে। সেদিন বলা হয়নি ভালোবাসি বাবা। এমন কি শুধু এই একদিন?



তখন পড়ি সপ্তম শ্রেণিতে। মেধাবি বলতে যা বোঝায় তেমন না হলেও, মোটামুটি সেরা ৮-১০’র মধ্যেই থাকতাম সবসময়। বাবার আগ্রহে ফাইনাল পরীক্ষা শেষে বসলাম একটি বেসরকারি সংস্থার বৃত্তি পরীক্ষায়। সবাই যখন বার্ষিক পরীক্ষার ছুটি কাটায়, আমার তখন বৃত্তি পরীক্ষার জন্য পড়তে হয়- বাবার ওপর তাই ক্ষোভের শেষ নেই। পরীক্ষা দিলাম, ফলাফলের কথা ভাবিওনি, কবে ফলাফল ঘোষিত হবে সেটিও খোঁজ নেইনি। বাবা সচরাচর বাড়ি ফেরেন রাত ৮টায়, একদিন চলে এলেন বিকেল ৫টায়। আমি তখন বাসার পাশের মাঠে খেলায় ব্যস্ত। ডেকে বললেন, চল, কাজ আছে। আবারও মনের বিরুদ্ধে গেলাম বাবার সঙ্গে। পথে শুনলাম, আমি সেই পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছি কিন্তু ফলাফল ঘোষণার খোঁজ রাখিনি তাই জানতেও পারিনি। এখন ছুটতে হবে সেই সংস্থার অফিসে, যা বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যে ৬টায়। একদম শেষমুহূর্তে গিয়ে সেই অফিস থেকে নিলাম বৃত্তির সার্টিফিকেট, আমার কাছে যতটা না মূল্যবান ছিল, তার চেয়ে কয়েকগুণ যেন বাবার কাছে! ঠিক এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, বেসরকারি এক বৃত্তির খবরেও আত্মীয়স্বজনদের মিষ্টি খাইয়েছিলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি না পাওয়ার হতাশাটা হয়তো সপ্তম শ্রেণির এই সাফল্য(!) দিয়েই ভুলে গেছিলেন বাবা। সেদিন আমার কী বলা উচিৎ ছিল? আমার সাফল্যে সব ভূমিকা যে ছিল বাবারই, এর বিপরীতে আমি ঠিক কী বলতে পারতাম বাবাকে? তা জানতে পারিনি আজও, বলাও হয়নি কখনও।



একবার চেয়েছিলাম বলবো, সেভাবে অনেক প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি! ভালোবাসা প্রকাশের বদলে উল্টো বাবার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে ঋণী হয়েছি আরও। পেশাগত জীবনের প্রথম দিন। চাকরির সবকিছু চূড়ান্তই ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েই যোগদান করতে হতো কাজে। সব কাগজপত্র গোছানর সময় দেখি বাবা চলে এসেছেন বাড়িতে, তখন দুপুরও হয়নি। ঠিক করলাম বের হওয়ার সময় বাবা-মাকে ভালোবাসি বলে ফেলব আজ। নিজের মধ্যেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম, কীভাবে বলা যায়। কিন্তু বের হওয়ার সময় যেন আটকে গেল সবকিছু, ভুলে গেলাম সকল প্রস্তুতির কথা। সামনে গিয়ে শুধু দোয়াই চাইতে পারলাম, বের হয়ে গেলাম চোখের কোণে অশ্রু নিয়ে। মনের ভেতরের কথাটা আর বলা হয়নি।



বাবাকে যে শুধু ভালোবাসার কথা বলা হয়নি, এমনটা নয়। তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, প্রথমবারের মতো পেয়েছি আলাদা পড়ার টেবিল। সে রাতে পড়ার চাপ ছিল খুব কম। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে কম সময়েই পড়া শেষ, টেবিলের একপাশে রাখা বল দিয়ে খেলতে শুরু করলাম। বাবা ফিরলেন তখন বাসায়। হয়তো কিছু নিয়ে আপসেট ছিলেন, আমার হাতে বল দেখেই রেগে গেলেন মুহূর্তের মধ্যে। সেদিনই প্রথম এবং একমাত্রবার উঁচু গলায় রাগারাগি করেন আমার সঙ্গে। এসবে অনভ্যস্ত আমি খুব কষ্ট পেলাম। ঠিক করে ফেললাম, পড়ালেখা বাবদ যত খরচ করেছেন বাবা, সব টাকা ফিরিয়ে দেবো। হিসেব কষতে বসে গেলাম। দশ বছরের পড়াশোনা, তারও আগে থেকে ভরণপোষণ- সবমিলিয়ে প্রায় চার লাখ টাকার হিসেব করেছিলাম সে রাতে। অনেকদিন এই পাগলামি মাথায় ভর করেছিল, ফিরিয়ে দেব সব টাকা। কলেজে ওঠার পর মাথা থেকে নেমেছে এই ভূত। বুঝতে পেরেছি টাকার অঙ্কে কি আর মাপা যায় বাবার অবদান! সে রাতে এই পাগলামির কথাটাও কি বাবাকে বলতে পারব কখনও? নাহ! সম্ভব নয়।



বাবা তোমাকে বলা হয়নি… এমন কথার কি কোন শেষ আছে? সেই যে ছোটবেলার ক্রিকেট ব্যাট কিংবা ঘুমের মধ্যে বিছানার পাশে রেখে দেয়া ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট অথবা স্টেডিয়ামে নিয়ে প্রথমবার খেলা দেখানো, নিজের সঙ্গে নিয়ে ফুটবল খেলানো- গৎবাঁধা জীবনের বাইরে বিনোদন বলতে যে খেলাধুলাই বোঝায়, সে শিক্ষাও তো পেয়েছি বাবার কাছ থেকেই। এর মাঝেও রয়েছে একটা আফসোস! ছোটবেলায় আমি দেখেছি বাবার ফুটবল খেলা কিন্তু বাবা এখনও দেখেননি আমার কোন ক্রিকেট ম্যাচ। একদিন এসেছিলেন মাঠে, আমি তখন রানআপে। হয়তো তা দেখেই চলে গিয়েছিলেন মাঠ থেকে। কখনও বাধা দিয়েছেন এমন নয়, আবার কখনও নিজ থেকে দেখেননি আমার কোন খেলা। ইচ্ছা ছিল শীর্ষপর্যায়ে খেলে টিভির পর্দায় হলেও বাবাকে দেখাবো নিজের খেলা। তা পারিনি! তবে এখনও আছি খেলা নিয়েই। যখন যাই বাবার অফিসে, তিনি অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন সেই খেলা বিষয়ক পরিচয় দিয়েই। বুঝতে পারি, আমার খেলা নিয়ে হয়তো তার ভেতরেও ছিল অনেক আশা। সে আশা পূরণ করতে পারিনি বাবা, যেমনটা পারিনি আরও অনেক প্রত্যাশা পূরণ করতে। এসব নিশ্চয়ই আমার ব্যর্থতা।



কিন্তু কখনও যে বলা হয়নি ভালোবাসি বাবা, অনেক ভালোবাসি- এটাও কি একপ্রকার ব্যর্থতা? হয়তো হ্যাঁ কিংবা না। বরাবরের মতো এর দায়ভার কিন্তু আমি বাবাকেই দেই। ঐ যে ‘যত গুপ্ত, তত পোক্ত’- কথাটি তো শিখিয়েছেন আমার বাবাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here