আমার ছোটবেলার একটা চমৎকার সময় কেটেছে বাবার সাথে। বাবাকে আমি তখন সবসময় চোখে হারাতাম। ছোট একটা ঘরে আমার জন্ম, বাবা আমাকে সেই ছোট ঘর থেকে টেনে বৃহৎ পৃথিবীতে বের করে এনেছেন। এই জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আজকের এই দুনিয়াকে আমি যত সহজভাবে চিনতে পারি কিংবা বুঝতে পারি, তার সবকিছুর পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগর আমার বাবা।

হ্যাঁ, আমার বাবা। গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক। সবাই বলে থাকে যে, বাবা নাকি সন্তানকে হাতে ধরে হাঁটতে শিখায়। আমাকে হাতে ধরে হাঁটা কে শিখিয়েছিল, তা মনে পড়ে না। তবে মনে পড়ে বাবা আমাকে দায়িত্ব নিয়ে এই দুনিয়ার অনেক কঠিন রাস্তাকে সহজ করে চিনতে সাহায্য করেছেন। জীবন আমাকে যত দূরেই নিয়ে যাক না কেন, আমার ছোটবেলার সেই দিনগুলো সাথে করে নিয়েই বড় হই।

ছোটবেলা থেকে আমি একটু ভিন্নতা নিয়ে বড় হয়েছি। সাধারণ বাচ্চাদের মত করে বড় হলেও, মাথায় কিছু অন্যরকম চিন্তা থাকতো। দেশ, জাতি, রাজনীতি, খেলাধুলা নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতাম। এসব তো আর এমনিই নিজের মধ্যে আসেনি, পেছন থেকে কারিগর আমার বাবা। চার বছর বয়সে রাজনীতির ব্যাপারে এক সহজ সরল উক্তিতে বাবা অবাক হয়েছিলেন, বুঝতে পেরেছিলেন, তার মেয়ে হয়তো বাইরের দুনিয়া নিয়েই বেশি আগ্রহী হবে বড় হলে।

আমি যখন অনেক ছোট তখনো বাড়িতে বা আমার বাবার কাছে মোবাইল ফোন ছিল না, তাই কোথাও থেকে ফিরতে আব্বুর ফিরতে দেরি হলে আমার কান্না থামানো মুশকিল হয়ে যেত। আমি সত্যিই অস্থির হয়ে পড়তাম আমার বাবা কোথায় আছে, কেন দেরি হচ্ছে এই ভেবে। আমার সেই কান্না থামতো বাবা যখন বাড়ি ফিরে আমাকে মা বলে ডাক দিতেন তখন, আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরতাম।

আমি যেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতাম, আমার বাবা ছিলেন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাই বাবার সাথে সখ্যতা আরও বেশি ছিল।

এলাকার সবাই ছোট থেকেই আমাকে পণ্ডিত বলে মানতেন। আমাকে সেই পণ্ডিত করেছিলেন আমার বাবা। অনেক যত্ন আর আগ্রহ নিয়ে আমার বাবা আমাকে ইতিহাস জানাতেন, ইতিহাস মুখস্ত করাতেন। সেই ছোটবেলায় আমি দেশের রাজনীতির অনেক কিছু জানতাম। নতুন কিছু সামনে আসলেই বাবা আমাকে বুঝিয়ে দিতেন আসলে তা কি… পাশে শুয়ে বা বসে থেকে প্রতিনিয়ত তিনি আমার সাধারণ জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতেন। আহা! সেই মধুর সময়গুলো। অনেক ছোট থাকতেই কত কিছু জেনে গিয়েছিলাম আমি! আশেপাশের সবার প্রশংসা কুড়াতাম, আর দেখতাম আমাকে নিয়ে করা বাবার গর্ব।

এলাকায় আমার বাবা অনেক পরিচিত এক মানুষ ছিলেন, চলাফেরা করতেন অনেক রাজনীতিক বা গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে। কী কারণে জানিনা, সেই ছোট্ট আমাকে বাবা সাথে করে সব জায়গায় নিয়ে যেতেন। সবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। ঐসব ব্যক্তিদের সাথে আমার ছোটবেলায়ই তৈরি হয়েছিল সুসম্পর্ক। এলাকার জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা অফিসার এমনকি আমাদের এলাকার সংসদ সদস্যও আমার খোঁজ নিয়েছেন প্রতিনিয়ত। তখন আমার বয়স দশের বেশি নয়। এই ছোট বয়সে এত পরিচিতি, সবটাই ছিল আমার বাবার অবদানে।

ছোটবেলায় আমি নিজেকে একবার টিভিতে দেখতে পেয়েছিলাম, প্রথমবারের মত… অনেক খুশি আমি এবং আমার বাড়ির লোকজন। সবচেয়ে খুশি লেগেছিল এই দেখে যে, আমি ছিলাম আমার বাবার কোলে। স্কুলের এক অনুষ্ঠানে আমার বাবা আমাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দৃশটা কতই না সুন্দর ছিল!

বাবা ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন, ধীরে ধীরে জিনিসটা আমার মধ্যেও চলে আসে। একবার এক উপস্থিত বক্তৃতার প্রতিযোগিতায় আমার উপস্থাপন দেখে বাবা অবাকই হয়ে যান। তারপর থেকে আমার আবৃতি, একক অভিনয়সহ সমস্ত সৃজনশীল প্রতিযোগিতায় আমার সাথে থেকেছেন বাবা।

সবচেয়ে বেশি ভাল লাগতো বাবার সাথে কোথাও বের হলে। দায়িত্ব নিয়ে, যত্ন নিয়ে আমাকে সব কিছু চেনাতেন। চিনতে না চাইলেও চিনতে হতো, সবকিছু আমার মনে গেঁথে যেতো। ঢাকা শহরে রিকশা দিয়ে আমি আর আমার বাবা ঘুরতাম। আর বাবা এই শহরকে আমার কাছে পরিচিত করে তুলতেন।

কোথাও গেলে আমাদের জন্য, বিশেষ করে আমার জন্য বাবা এমন কিছু না কিছু প্রতিবার নিয়ে আসতেন যা সত্যিই অন্যরকম ছিল। আমার বন্ধুমহলে ঐসব আমিই প্রথম ব্যবহার করতাম। এ নিয়ে তখন আমার গর্বের শেষ ছিল না, মনে মনে বাবাকে ধন্যবাদ দিতাম। আমার সেরা বাবা।

চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতে হয় বিশ্বকাপ ফুটবল আর বিশ্বকাপ ক্রিকেট। সেখানেও আমার বাবা। আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিজের পাশে নিয়ে বসাতেন। রাত জেগে আমরা খেলা দেখতাম, বাবা বিরামহীনভাবে আমাকে এই খেলার দুনিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন, ধরে ধরে শিখিয়েছেন সব কিছু।

আহা! এই মানুষটা আমাকে নিজের অজান্তে কত কিছু শিখিয়ে দিয়েছেন। যার জন্য আজকের এই দুনিয়াতে আমি টিকে আছি লড়াইয়ে। ২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ, ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপগুলোও এভাবেই কেটেছে, বাবার পাশে বসে আমরা তিন বোন খেলা দেখেছি। প্রতিটা মুহূর্ত চিৎকার চেঁচামেচি করেছি। আমাদের জীবনটা কেটেছে অনেক সুন্দরভাবে।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালের রাত, রমজান মাস। ফাইনালে আমাদের পছন্দের দুই দল। মানে আমরা প্রতিপক্ষ। রাতে খেলা দেখার জন্য বাবা সেদিন আমাকে সাথে নিয়ে ঘুমিয়েছেন। খেলা শুরুর সময়টাতে সেই ছোটবেলার মতো আমাকে ঢেকে তুলেছেন।

এভাবে কতকিছু হয়েছে, আমি জীবনে এগিয়ে গিয়েছি আমার বাবার হাত ধরে। এখনও আমি বেশ সুখী অনুভব করি বাবার পাশে শুয়ে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে, বাবার হাতে ভাত খেয়ে। অনেক বেশি সৌভাগ্যবান মনে হয় যখন দিনশেষে বাবার সাথে এক টেবিলে বসে খাই কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে বাবার মুখ দেখি।

সময় তো অনেক কিছু বদলে দেয়, তেমনি বদলে দিয়েছে আমাদের ছোটবেলার সেই মিষ্টি সময়টাকে। এখন আর বাবাকে পাশে নিয়ে আমি সব কাজ করি না। বাবাও আমাকে সব জায়গায় সাথে করে নিয়ে যান না, আমিও আমার সবকিছুতে বাবাকে সাথে করে নিয়ে যাই না। আমার একটা বিশাল জগত হয়েছে ঠিক কিন্তু সেখানে বাবা আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন না। কিন্তু আমরা এখনও একসাথে খেলা দেখি, এখনও একসাথে উল্লাস করি। এখনও আমরা দেশ, রাজনীতি নিয়ে কথা বলি।

আমি এখনও আশায় আছি, বাবাকে সাথে নিয়ে দূরে ঘুরতে যাব আর বাবা ছোটবেলার মত আমাকে দুই ধারের রাস্তা চেনাবেন। আমি আমার বাবার সাথে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখবো, বাংলাদেশের জয়ে উল্লাসে ফেটে পড়বো। বাবা তুমি সুস্থ থাকো, অনেক ভালবাসি তোমায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here