সকাল ৯টা ২৮ মিনিট

শহরের বড় রাস্তাটা ফাঁকা। কিছু ল্যাম্পপোস্টে সোডিয়াম বাতি, কোনোটায় আবার সাদা এলইডি বাতি। একটু কায়দা করে দাঁড়ালে মনে হবে যেন ফ্লাডলাইট জ্বলছে মাথায় ওপরে। এমন জায়গায় ক্রিকেট খেলতে ইচ্ছে হবে খুব। কিন্তু আপনি ক্রিকেট খেলতে পারবেন না।

পুরো রাস্তাটাই খালি কিন্তু সাইসাই করে কিছুক্ষণ পরপর ছুটে যাচ্ছে বড় লরি, সঙ্গে কিছু সিএনজি অটোরিকশা। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন লরির ড্রাইভার যেনো ঘুমাচ্ছে। ঠিক যেমনটা আপনার মনে হচ্ছে রোড ডিভাইডারের মাঝে ঘুমাচ্ছে ৩টি কুকুর।

অথচ কেউই কিন্তু ঘুমাচ্ছে না। কে জানে হয়তো কিছু লরির ড্রাইভার ঠিকই ঘুমাচ্ছে! নয়তো কিছু লরি দেখামাত্রই কুকুরগুলো সমস্বরে চিল্লিয়ে উঠবে কেন? আচ্ছা ওরা বুঝবেই কী করে? ওদের কী এ বিশেষ ইন্দ্রিয় দেয়া আছে? আপনি খালি চোখে ধোঁকা খাচ্ছেন, ক্রিকেট খেলতে চাইছেন, লরির ড্রাইভারকে ঘুমোতে দেখছেন; কুকুর কিন্তু শুধু বেছে বেছে কিছু লরির জন্যই চিল্লিয়ে উঠছে!

কিছু সময় নিজের ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলে ভালোই লাগে। এই যেমন আপনি এখন ভাবছিলেন, হয়তো একাই জেগে আছেন এ ঘুমন্ত নগরীতে। কিন্তু মিটার পঞ্চাশেক দূরে আরো কয়েকজন মানুষ দেখে যেন সকল স্বত্বা জেগে উঠেছে আপনার।

কিন্তু কী তাজ্জব ব্যাপার! এই রাতের বেলা দলবদ্ধ এতোগুলো মানুষের সামনে আপনি মাত্র একজন হয়েও ভয় পাচ্ছেন না। বরং তাদের সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেট খেলার প্রস্তাব নিয়ে। অথচ আপনি ভালো করেই জানেন, ফাঁকা কিন্তু ব্যস্ত শহরে রাতের আঁধারে ক্রিকেট খেলতে চাইলেও পারা যায় না উদ্ভট সব কারণে।

এবার কুকুরগুলো যেন সায় দিল এ ভাবনায়। কোনো গাড়ি নেই, তবু চিল্লিয়ে উঠে। তবে চেচিয়ে ওঠা নয়, ধীরে ধীরে কাউকে ডাক দেয়ার মতো করে… কিন্তু কুকুরগুলোর স্বর এমন ভয়ার্ত শোনাচ্ছে কেন? ওরা কি আপনার ভাবনায় সহমত জানাচ্ছে? নাকি বোঝাতে চাচ্ছে অন্যকিছু?

আপনার বিশেষ ইন্দ্রিয় নেই, ফলে অন্যকিছু বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও- তা আপনার বোধগম্য হবে না। আপনি অন্যকিছু বোঝার চেষ্টাও করছেন না। শহুরে শান্ত পরিবেশ উপভোগ করছেন আপনি। মনে মনে ধন্যবাদ দিচ্ছেন অফিসের বসকে, নাইট শিফট অফিস দিয়েছে বলেই তো কাজের ফাঁকে আপনি এই সময়টা পেয়ে গেলেন ব্যস্ত শহরের লাজুক রূপ দেখার।

যতোটা ফাঁকা ভেবেছিলেন, ততোটা ফাঁকা নয় আসলে রাতের শহর। যে কারণে ক্রিকেট খেলতে পারছেন না আপনি। আনমনে এগিয়ে যাচ্ছেন দুই-এক পা করে। এবার কুকুরগুলো সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, আপনার সম্বিৎ ফিরেছে বটে, তবে ভয় পাননি। কেন যেনো কুকুরগুলোকে বন্ধু মনে হচ্ছে আপনার।

তবে ভাবছেন, কুকুরগুলো দূরে সরে গেল কেন? নাকি চলে যাচ্ছে এখান থেকে? তখনের আস্তে করে ডাকটা কি তাহলে অন্যকিছুর ইশারা ছিলো? এবার খানিক ভয় ডুকেছে মনে, তবে সাহস পেলেন কুকুরগুলো ৫০-৬০ মিটারের মধ্যেই অবস্থান নেয়ায়।

সামনে তাকালেন আপনি, ভৌতিক গল্পে পড়েছেন অশরীরিদের কোনো ছায়া হয় না। কিন্তু আপনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন সামনের মানুষগুলোর অতিকায় সব ছায়া। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে আপনার ছায়াও কম বড় হয়নি। ফলে আশ্বস্ত হলেন আপনি। তবু রয়ে গেল সংশয়। কুকুরগুলো এমন করে ডাকল কেন? দূরেই বা সরে গেল কেন?

আপনার বিশেষ ইন্দ্রিয় নেই, আপনি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে বাধ্য। নিজ চোখে দেখেছেন লোকগুলোর অতিকায় সব ছায়া। আচ্ছা, আপনার কী ভ্রম হওয়ার কোনো সম্ভাবনা রয়েছে? উড়িয়ে দেয়া যাবে না নিশ্চয়ই, টানা তিন রাত ধরে জাগছেন আপনি, দিনের ঘুমটাও হচ্ছে না ঠিকঠাক। চতুর্থ রাতে এসে ভ্রমের কথা মাথায় এলে, সেটা উড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা আপনার অন্তত নেই।

ক্রিকেট নিয়ে বিস্তর লেখালেখি বের হয়েছেন রাস্তায়, মাথায় তখন শুধুই ক্রিকেট। রাস্তায় নেমে হয়তো খেলতে পারবেন না, কিন্তু সামনের মানুষগুলোর সঙ্গে কিছু আলোচনা তো করতেই পারবেন। অনেকদিন হলো স্কুলের বেঞ্চে বসে কিংবা বাড়ি ফেরার বাসে বসে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে যৌক্তিক-অযৌক্তিক আলোচনা করেন না। আপনার স্মৃতিকাতর মন কি আর ভ্রমকে পাত্তা দেবে? হোক অন্যকিছু, আপনি এগোবেন সেসব মানুষের দিকেই।

দূরত্ব যতটা ভেবেছিলেন, ঠিক ততটা। কয়েক কদম হাঁটতেই যেন কাছাকাছি চলে এলেন। আরও একবার অবাক হলেন। ভেবেছিলেন আপনার হয়তো আগবাড়িয়ে বলতে হবে ক্রিকেট নিয়ে। কিন্তু না, তারা নিজেরাই তো আলাপ করছে চলতি বিশ্বকাপ নিয়ে। যদিও আপনি যা লিখে এলেন, তার সঙ্গে কোন মিল নেই তাদের কথার। আপনি জানছেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারালেও, নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তাদের আড্ডা-আলাপের পুরো কথোপকথনই হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় উদযাপন বিষয়ক।

এবার বেশ ভালোভাবে বিভ্রান্ত হলেন আপনি। খুব কাছে পৌঁছে গেলেও, তাদের সঙ্গে কথা বললেন না আপনি। অফিসে ফিরে যাবেন নাকি আরেকটু হেঁটে সামনে যাবেন ঠিক করতে পারছেন না। পেছন থেকে সিএনজির শব্দে ঘুরে তাকালেন, সেই কুকুরগুলো এখন আপনার অনেক কাছে, হয়তো ১০-১৫ মিটার হবে। ওদের সঙ্গী করেই এগুবেন নাকি সামনে? ভাবছেন, পোষ মানানোর জন্য বিস্কুট পাওয়া গেলে ভালো হতো। মনে পড়ল, নাশতা হিসেবে দেয়া বিস্কুট রয়ে গেছে অফিসের ডেস্কে।

আনার সুযোগ নেই, সবমিলিয়ে বারবার দোটানায় পড়ছেন আপনি। বাস্তব আর কল্পনার মাঝের সূক্ষ্ম রেখাটা বারবার মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলছে। কিছুতেই কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। একবার ভাবছেন, টানা জেগে থাকার কারণে হয়তো ভুল দেখছেন। আবার মনে হচ্ছে, সবকিছুই তো হচ্ছে যুক্তি মেনে, অস্বাভাবিক কিছুই পড়ছে না চোখে। ঠায় দাঁড়িয়ে আপনি, এখন মাথায় এসেছে মেডিটেশনের কথা। প্রকৃতিকে বোঝার জন্য প্রকৃতির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। গভীর নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য চোখ বন্ধ করলেন…

‘কিরে উঠস না কেন? তোর হোম অফিসের তো লেট হবে আজকেও’- মায়ের ডাকে চোখ মেলে মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখেন বাজে সকাল ৯টা ২৮ মিনিট, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মোবাইলের নোটপ্যাডে লিখলেন, ‘ঘরে বসে অফিস করার ৯৭তম দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here