বইঃ তোমাকে
লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশিতঃ ১৫ই জুন ১৯৯৫
প্রকাশকঃ অনন্যা

হুমায়ূন আহমেদের আর বাকি উপন্যাসের মতই সহজ-সাবলীল ভাষায় লেখা একটি উপন্যাস “তোমাকে”। উপন্যাসের নামের দিকে লক্ষ্য করে অনেকে এটাকে প্রেমের উপন্যাস মনে করতে পারেন। তবে উপন্যাসে প্রেমের ছোঁয়া, ভালবাসার ধাঁচ থাকলেও এটি ঠিক প্রেমের উপন্যাস নয়। বলা যেতে পারে একটা পারিবারিক কাহিনীকে লেখক এগিয়ে নিয়ে গেছেন, যেমনটি সাধারণত বাস্তব জীবনেও দেখা যায়।

গল্পটি শুরু হয়েছে দুই জমজ বোনকে নিয়ে, তাদের নাম রাখা হয় নিলু আর বিলু। তারপর তাদের আরও একটি বোন হয়েছে, যার নাম রাখা হয়েছে সেতারা। বাড়িতে তিন বোন হওয়ার কারণে তাদের মায়ের মধ্যে এক ধরনের বিরক্তি দেখা যায়।

সম্পূর্ণ গল্পটি উপস্থাপন করেছে বিলু। তিন বোন আর বাবা মা ছাড়াও গল্পটিতে দেখা যায় বাড়ির ভাড়াটিয়া নজমুল হুদাকে আর সেই সাথে বিলুর বাবার প্রেসের ম্যানেজার। ম্যানেজার কাকুকে এক অদ্ভুত কারণে নিলু পছন্দ করে না, যার রহস্য পরে উন্মোচিত হয়েছে।

মোটামুটি একটি সুখী পরিবার। দুই জমজ মেয়ে যাদের আলাদা করতে বাবা মা পর্যন্ত হিমশিম খায়, যাদের জন্মদিনকে ঘিরে তাদের বাবার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের উন্মাদনা। বাড়ির ছোট মেয়ে সেতারা নিয়ম করে গান শেখে।

কিন্তু মধ্যবিত্তের এই পরিবারে সুখ বেশি দিন স্থায়িত্ব পায়নি। নিলু আর বিলুর বয়স যখন বারো আর সেতারার সাত, তখন তাদের মা সেই ম্যানেজারের সঙ্গে পালিয়ে যায়। শুরু হয় গল্পের মূল কাহিনী। পরিবারে সকলের মধ্যে এটা অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আসলে বাস্তবে মা ছাড়া একটি পরিবারের অবস্থা কী হয়, ছেলেমেয়েদের বেড়ে উঠতে মায়ের ভূমিকা আসলে কতটা, একটি সংসারকে সুন্দর করতে মাকে যে বড্ড প্রয়োজন- লেখক সে জিনিসটাই এখানে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন।

ছোট একটি বইয়ের অল্প কিছু পাতায় লেখক অনেক কিছুর উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, বুঝাতে চেয়েছেন একটি সংসার কিভাবে অযত্নে, অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়। নিলু, বিলুর মা চলে যাওয়ার পর তাদেরকে অনেক আজেবাজে কথা শুনতে হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবে এটা দুইজন উঠতি বয়সের মেয়ের উপরে মানসিক চাপ দিয়েছে। আর ওদের এই কষ্ট আর মানসিক চাপ বোঝার মত করে কেউ ছিল না। ওদের বাবা থাকতেন নিজের মত, তার কাজ নিয়ে। এভাবে নিলু আর বিলুর মধ্যে সম্পর্ক আলগা হতে থাকে।

মায়ের শাসন, আদরের অভাবে নিলুর আচরণ কিংবা পড়াশোনার অনেক অধঃপতন হতে থাকে। একটা সময় পরে নিলু কারও কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করে না। বিলু ঠিকই ভাল রেজাল্ট করে শহরে পড়তে চলে যায় আর সেতারাও ভাল শিল্পী হয়ে উঠে।

সময়ের সাথে সাথে নিলুর জীবনে ও ভালবাসা আসে, বান্ধবীর ভাই অংকের শিক্ষক রাকিব ভাই। কিন্তু জমজ বোনদের নিয়ে বার বার সমস্যার পরেন রাকিব ভাই। শেষপর্যন্ত কি নিলু আর রাকিব ভাইয়ের ভালবাসায় কোন পরিমাম এসেছিল?

নিলু, বিলু আর সেতারার জীবন আর তাদের পরিবারে বদল এসেছিল। বহু দিনের অনিয়ম, অযত্ন আর অবহেলায় ওদের বাবা এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন, একদম শয্যাশায়ী। অবচেতন মনে বারবার তার মেয়েদের মা, তার আগের স্ত্রীকে খুঁজে বেড়ান।

অতীতকে ভুলে গিয়ে, সব কিছুকে পিছনে ফেলে ওদের মা কি আবার এই বাড়িতে ফিরে এসেছিল নাকি ওদের সঙ্গে মায়ের আর কোনদিন দেখাই হয়নি? ওদের বাবা সুস্থ হয়ে কি ওদের পরিবারের হাসি খুশি পরিবেশ আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন?

জানতে হলে পড়ে ফেলতে হবে, হুমায়ূন আহমেদের এই পারিবারিক উপন্যাসটি। সুন্দর, সাবলীল এই উপন্যাসের শেষ বেলায় এসে মনে হয়েছে, শেষের দিকে লেখক বড্ড তাড়াহুড়া করে ফেলেছিলেন, আর একটু গোছানো হওয়া দরকার ছিল।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here