অপেক্ষা

  • বই – অপেক্ষা
  • লেখক- হুমায়ূন আহমেদ
  • প্রকাশকাল- ১৯৯৭

লেখক হুমায়ুন আহমেদের ‘অপেক্ষা‘ যেন জীবনের চিরন্তন সত্যের অসাধারণ উপস্থাপন। আমাদের জীবনে সব থেকে বেশি আমরা যেই জিনিসের সঙ্গে পরিচিত তা হচ্ছে ‘অপেক্ষা’। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে অপেক্ষার কোন শেষ নেই কিংবা বলা যায় যে অপেক্ষাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। জীবনে অপেক্ষার কোন শেষ নেই, একএক জনের অপেক্ষা এক এক রকম। সত্যিকার অর্থে মানুষের মধ্যে যতদিন পর্যন্ত কোন কিছু নিয়ে অপেক্ষা থাকে ঠিক ততক্ষণই তার বেঁচে থাকাটা আনন্দের থাকে।

মানুষের জীবন কি চক্রের মত? চক্রের কোন শুরু নেই, শেষ নেই। মানবজীবন কি তাই? রহস্যময় চক্রের মধ্যে মানুষের জীবন ঘুরপাক খেতে থাকে। শুরু নেই, শেষ নেই, চক্র ঘুরছে। এই চক্রের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতেই মানুষ তার অপেক্ষা চালিয়ে যায়। নানা রকমের অপেক্ষা।

অপেক্ষা গল্পটি শুরু হয়েছিল এক সুখী, সুন্দর পরিবারের কাহিনী দিয়ে। স্বামী হাসানুজ্জামান, স্ত্রী সুরাইয়া আর ছেলে ইমনকে নিয়ে পরিবার। পরিবারে তখন আরও একজন নতুন মানুষের আগমনের সময় চলে আসে। স্ত্রী সুরাইয়া অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু সে খবর স্বামী জানেন না। স্বামী অফিস থেকে ফিরে আসলে তাকে সেই খবর দেয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে সুরাইয়া। সেই রাত, পরের দিন, তারও পরের দিন কিংবা গল্পের শেষদিন অব্দি। কারণ সুরাইয়ার সেই অপেক্ষা আর শেষ হয় না। তার স্বামী আর কোনদিন ফিরে আসেনি সংসারে। কিন্তু সুরাইয়া ঠিকই অপেক্ষা করে গেছেন তার স্বামীর জন্য।

এভাবে হুট করে পরিবারের উপার্জনক্ষম কোন ব্যক্তি হারিয়ে গেলে সেই পরিবারের অবস্থা ঠিক কতটা নাজেহাল হয়ে যায় সেই দৃশ্যই লেখক এই গল্পে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। স্বামীর এইভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি স্ত্রী সুরাইয়া। মানসিক অস্বাভাবিকতা চলে আসে তার আচরণে। একেই তিনি মেনে নিতে পারেনি তার স্বামী হারিয়ে গেছে কিংবা মারা গেছে, তার উপরে আবার স্বামীর অনুপস্থিতিতে আর্থিক সংকট। ছেলে ইমন এবং নতুন জন্ম নেয়া মেয়ে সুপ্রভাকে নিয়ে সুরাইয়া ওঠে তার ভাইয়ের বাসায়। সেখানে সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল এক বদ্ধ ঘরে। নিজের ছেলে মেয়েদের প্রতি ছিল উদাস, একপ্রকার অযত্ন আর অবহেলায় বড় হয়ে উঠে তার দুই ছেলে মেয়ে।

সুরাইয়ার অপেক্ষা বাড়তেই থাকে। জগতের সব ব্যাপারেই সুরাইয়ার বিতৃষ্ণা চলে আসে। ব্যক্তিগত হতাশার কারণে তার মেজাজটাও হয়ে যায় তিরিক্ষি। নিজের দুই সন্তান ইমন ও সুপ্রভার সঙ্গেও তার আচরণ দিনদিন অসহনীয় হয়ে যেতে থাকে। এই অপেক্ষার পরিণতিই যেন সুরাইয়ার সংসারে কাল হয়ে দাঁড়ায়।

এই গল্পে লেখক স্বামী হাসানুজ্জামানের জন্য স্ত্রী সুরাইয়ার অপেক্ষাকে অবলম্বন করে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। গল্পে ডালপালার বিস্তার করে কাহিনীকে আরও বাস্তবে রুপ দেন। গল্পকে শুধু বিষাদ কিংবা অপেক্ষায় আটকে রাখেননি। গল্পের নায়ক নায়িকা, ইমন আর মিতুর মধ্যে এক অনবদ্য প্রেম কাহিনী উপস্থাপন করেছেন। ফুফাতো ভাই ইমনকে মিতুর বেনামে চিঠি পাঠানো এবং সেই সাথে একটু ইঙ্গিত রাখা যাতে চিঠির আসল লেখিকাকে ইমন চিনতে পারে, আবার হঠাৎ করে সমবয়সী ইমনকে তুমি তুমি করে বলতে চাওয়াতে ইমনের প্রতি মিতুর ভালবাসারই বহিঃপ্রকাশ ছিল।
গল্পের অন্যতম মিষ্টি চরিত্র সুরাইয়ার মেয়ে সুপ্রভা। জন্মের আগে বাবাকে হারানো মেয়ের জীবনে অভাব ছিল মায়ের আদরেরও। মেয়েটা শুধুমাত্র পেয়েছিল বড় মামার আদর। এর মধ্য দিয়ে লেখক সুপ্রভার জীবনে কিছুটা হলেও বাবার ভালোবাসা দেখিয়েছেন। হাসিখুশি মেয়েটির জীবনে করুণ পরিণতি নেমে আসে পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করতে ব্যর্থ হবার কারণে। সেটা কিভাবে? জানতে হলে অপেক্ষা পড়ে শেষ করতে হবে।
গল্পের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র জামিলুর রহমান। ভগ্নিপতি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর বোন ও তার দুই সন্তানকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, সুপ্রভাকে বাবার আদর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আবার গল্পের শেষ দিকে মেয়ে মিতুকেও জীবন সঙ্গী নির্বাচনে কোন বাধা দেননি। কিন্তু চিরকাল ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে থেকে পরিবারের দিকে নজর না দিলে সেই পরিবারের সুখ যে নষ্ট হয়ে যায় তা জামিলুর রহমানের পরিবারের মধ্যে দিয়ে লেখক উপস্থাপন করেছেন।

এভাবেই এগিয়ে চলে উপন্যাস। সুরাইয়ার চিরকালের বিশ্বাস থাকে ইমনের বিয়ের রাতে ফিরে আসবে স্বামী হাসানুজ্জামান। অবশেষে উপন্যাসে এসে উপস্থিত হয়েছে ইমনের বিয়ের রাত। সুরাইয়া বসে থাকে। দরজায় বেল বাজার শব্দ পাওয়া যায়… তাহলে কি শেষ অব্দি ফিরে এসেছিলেন হাসানুজ্জামান?

সবমিলিয়ে বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদের সেরা উপন্যাসগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হলে অপেক্ষা নামটা অবশ্যই সেখানে থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন জরিপেও খেয়াল করা যায় যে অনেক পাঠকেরই সবচেয়ে প্রিয় বই অপেক্ষা। হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত যারা আছেন তাদের এই বইটা এতদিনে পড়ে ফেলার কথা, যদি কোনো কারণে পড়া না হয়ে থাকে তবে অবশ্যই পড়ে ফেলবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here