শেষ বিকেলের মেয়ে

  • বইঃ শেষ বিকেলের মেয়ে
  • লেখকঃ জহির রায়হান
  • প্রকাশনীঃ অনুপম প্রকাশনী

বইয়ের নাম শেষ বিকেলের মেয়ে, দেখে হয়তো অনেকে ভেবে নেবেন, যেমনটা আমিও ভেবে নিয়েছিলাম- বইটি হয়তো কোন নারী চরিত্রের প্রেম-কাহিনী বা এরকম কিছু। কিন্তু বাস্তবে এই বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকে কাসেদ যে কিনা পেশায় কেরানী। বাড়িতে বৃদ্ধ মা আর নাহার নামে দুঃসম্পর্কের এক বোন। নাহারের মা মারা যাওয়ার পর এ বাড়িতেই সে মানুষ হয়েছে। স্বল্পভাষী এই মেয়েটিই পুরো বাড়ি আগলে রাখে।

গল্পে ভালোবাসার প্রয়োগ কিংবা রোমান্টিকতার ছোঁয়া থাকলেও, নেই কোন প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। কাসেদ জাহানারা নামের এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েকে ভালবাসলেও মুখ ফুটে তাকে ভালবাসার কথা বলেনি কিংবা তাদের মধ্যে ছিল না কোন প্রেমের সম্পর্ক। জাহানারার জন্মদিনে কাসেদের পরিচয় হয় শিউলির সঙ্গে। শিউলি সম্পর্কের দিক দিয়ে জাহানারার কাজিন। খুবই আধুনিকমনা এই মেয়েটির সঙ্গে একসময় কাসেদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। আর এর কৃতিত্ব বা দায় যায় বলি না কেন তার সবটুকুই শিউলির। এছাড়াও গল্পে দেখা যায় কাসেদের খালাতো বোন সালমাকে, যে কাসেদকে মনে প্রাণে ভালবেসেও বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে তার সঙ্গে সংসার করতে পারেনি, মেনে নিতে হয়েছিল অন্য কারো সাথে সংসার।

বইটাতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় চরিত্র কাসেদ খুব দ্রুত ভাবনা থেকে বাস্তবের জগতে আবার বাস্তবে থেকে ভাবনার জগতে যাওয়া আসা করছে। এই যাওয়া আসাটা এত দ্রুত হয়েছে যে কাসেদ কখন বাস্তবের জগতে আছে আর কখন কল্পনার জগতে আছে বিষয়টা বুঝতে প্রায়ই হিমসিম খেতে হয়েছে।

কাসেদের মা ধার্মিক ধরনের আর কাসেদের দূর সম্পর্কের বোন নাহার ছিল সম্পূর্ণ চুপচাপ। কোন কিছু নিয়ে তার মধ্যে কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না। এমনকি তার বিয়ের ব্যাপারে মত দেবার ব্যাপারেও সে ছিল নিশ্চুপ। তাহলে কি নাহারের চুপ থাকার অন্য কোন মানে ছিল? শেষ অবধি কি লেখক সেই গুপ্ত ইচ্ছা প্রকাশ করতে পেরেছিল?

এদিকে শিউলির কথাবার্তা আর আচরণে মনে হতে থাকে সে কাসেদের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। আর এ সম্পর্কের জেরে আর ভুল বোঝাবুঝির কারণে জাহানারার সঙ্গে কাসেদের দূরত্বটা বেড়ে যায়। জাহানারা চলে যায় পর্দার আড়ালে। ভালোবাসার মানুষের কাছে নত হওয়ার চেয়ে অভিমানই জয়ী হয় তার কাছে। সবসময় যাকে ভালোবেসে এসেছে তার দুয়ার থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে কাসেদ শিউলি কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে!
কিন্তু শিউলি জানিয়ে সে তাকে বন্ধু হিসেবেই দেখে এসেছে, আর সব পুরুষ একইরকম- একথা বলে মৃদু অপমানও করে কাসেদকে।

ঘরে ফিরে কাসেদ দেখে তার মা গুরুতর অসুস্থ, মৃত্যু শয্যায়। নাহারের বিয়ে ঠিক করেও তার বিয়ে দেখে যেতে পারলেন না কাসেদের মা। তার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি এবং এই মুহূর্তটাই পুরো উপন্যাসের মধ্যে বেশি কষ্টদায়ক। কিছুদিন পর নাহারের বিয়ে দেওয়ার জন্য কাসেদের খালু এসে নাহারকে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। কাসেদের পৃথিবীটা আজ শূন্য, বড্ড শূন্য! আজ তার ঘরেও কেউ নেই, বাইরেও কেউ নেই।

শেষ বিকেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে নানা কথা ভাবতে ভাবতে আর মেঘের খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ দরজায় কড়াঘাত। কে? একটি মেয়ে এসেছে, শেষ বিকেলের মেয়ে ! যে এসেছে বাকি জীবনের জন্য কাসেদের নিকট নিজেকে সমর্পন করার জন্য!

কে এই মেয়েটি? জাহানারা?তবে কি সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে? শিউলি? সেও কি বন্ধুত্বের এক ফাঁকে কাসেদ কে ভালোবেসেছিল, সেদিন যা করেছে তা নিছকই মজা করার জন্য করেছে? নাকি সালমা? স্বামীর ঘর ছেড়ে সুখের আশায় আবারও এসে কাসেদের দুয়ারে দাড়িয়েছে? নাকি কাসেদের জন্য অন্য কোন গোপন প্রেম অপেক্ষা করছিল?

অনুরোধ থাকবে, জহির রায়হানের এই অসাধারণ উপন্যাসটি পড়ে নিজেই জেনে নিন, শেষ বিকেলের মেয়েটি কে ছিল!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here